দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভাইরাসের খোঁচা খোঁচা স্পাইক প্রোটিন আছে। তেড়ে এসে হুল ফুটিয়ে দিতে পারে। মানুষের কী আছে? শরীরে অ্যান্টিবডি কম। তার উপরে রোগের ডিপো। অস্ত্র বলতে ওই মাস্কেই ভরসা। আর মাঝে মাঝে স্যানিটাইজার ঢেলে হাত কচলানো। রাস্তায় যাও বা ভিড়ের মাঝে উঁকি দাও, আঁটোসাঁটো করে নাক-মুখ মাস্কে না ঢাকলেই বিপদ। কারণ এই ভাইরাসের আবার মানুষের নাক আর মুখই একটু বেশি পছন্দ। সটান পিছলে মুখ দিয়ে গলে যেতে পারে সোজা ফুসফুসে। তাই গরম লাগুক বা চুলকানি হোক, করোনা কালে মানুষ পুরোপুরি ‘মাস্ক-বাদী’ । আর এই মাস্ক নিয়েই যত সমস্যা।
দু’কানে ফিতেটা টাইট করে ঠোঁটদুটো পুরোপুরি ঢেকে নাকের উপর অবধি টেনে নিলেই কিছুটা শান্তি। সেই সঙ্গেই ঢাকা পড়বে গালের কিছুটা অংশ। কান আর চোখকে যদি ভাইরাস টার্গেট না করে তাহলে আর সমস্যা নেই, মুখের প্রায় অর্ধেকটাই মাস্কের আড়ালে চলে যাবে। কিন্তু চিরকাল যে নাক আর ঠোঁট খোলা হাওয়ায় মুক্ত পরিবেশে দিব্যি খোশমেজাজে শ্বাস নিত, তার কি আর এত রাখঢাক সহ্য হবে। বলা নেই, কওয়া নেই, এক ফালি কাপড়ের টুকরোয় টানটান করে নাক-মুখ পুরো সেঁটে ফেলা! তাই তারাও এখন বিদ্রোহ শুরু করেছে। বেশিক্ষণ মাস্কের অত্যাচার সহ্য করতে হলেই নাক, মুখ জুড়ে ছোট, বড় লালচে-গোলাপি ব্রণ, র্যাশ উঁকি দিচ্ছে। খসখসে ত্বক, চুলকানি, ঠোঁটের চারপাশে লাল লাল গুটির মতো দাগ—সে একেবারে যাচ্ছেতাই কাণ্ড। বয়ঃসন্ধিতেও ব্রণর সমস্যায় ভোগেননি যাঁরা, তাঁরাও মাস্ক-জনিত সমস্যায় জেরবার। ডারমাটোলজিস্টরা এই মাস্কঘটিত ব্রণদের নাম দিয়েছেন
‘মাস্কনে’ (Maskne) । অর্থাৎ মাস্কের কারণে যে ব্রণ বা অ্যাকনে
(Mask+Acne) ।

এখন দেখে নেওয়া যাক এই মাস্কনে ঠিক কেমন।
লালচে ত্বক খসখসে, তার উপর ব্রণরা আসর সাজিয়ে বসেছে
করোনা কালে স্টাইল স্টেটমেন্টের দফারফা হয়েছে। যতই মেক আপ ঘষো আর লিপজেলের জেল্লা ওড়াও, নাক-মুখ সেই ঢেকে রাখতে হবে মাস্কেই। তাই মাস্ককে পরিপাটি যত্ন না করলেই বিপদ। একটানা মাস্ক পরে থাকলে নাক, মুখে খোলা হাওয়া খেলা করতে পারে না। ঘাম, ময়লা জমে র্যাশ হতে শুরু করে। তার উপরে বার বার হাত দিয়ে মাস্কের কান ধরে কখনও নাকের উপরে তোলা, আবার কখনও থুতনির নীচে নামানো, এইসবেই যত সমস্যা। গোটা নাক-মুখ জুড়ে লালচে দাগ, ব্রণরা একেবারে আসর পেতে ফেলে।
ডার্মাটোলজিস্টরা বলছেন, অনেকে আবার মাস্ক সরিয়ে বার বার মুখে হাত দেন, যার ফলেও হাতের ময়লা ঠোঁটে, নাকে লেগে যায়। তার উপর আবার মাস্ক চাপিয়ে দিলে ঘাম জমে সেই জায়গার ত্বকের বারোটা বেজে যায়। এমনিতেই গরমের সময় ব্রণর সমস্যায় ভোগেন অনেকে। তার উপরে মাস্কে দীর্ঘক্ষণ মুখ ঢেকে রাখলে ত্বক আরও বেশি বিদ্রোহ ঘোষণা করে। চামড়া খসখসে, শুকনোও হয়ে যায় অনেকের। বেশি চুলকালে সেই জায়গায় ব্রণ ফেটে গিয়ে বিপত্তি দেখা যায়। তার উপরে ফের মাস্ক চাপানো মানে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেওয়ার মতো। কাজেই মাস্কযুক্ত ব্রণ থুরি মাস্কনে হল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় ত্বকের সমস্যা।
এগজিমা বা সোরিয়াসিস থাকলে বিপদ আরও
বার বার স্যানিটাইজার ঘষে ত্বক শুষ্ক হচ্ছে। হাতের ছাল উঠছে অনেকের। তার উপরে মাস্ক সাঁটিয়ে মুখ ভর্তি মাস্কনে। ডার্মাটোলজিস্টরা বলছেন, যাদের ত্বক খুব শুষ্ক, সেনসিটিভ তাদের সমস্যা আরও। বিশেষত যদি এগজিমা বা সোরিয়াসিসের মতো ক্রনিক ত্বকের রোগ থাকে বা অ্যালার্জিজনিত অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিস তাহলে ত্বকের যত্ন একটু বেশিই নিতে হবে। স্যানিটাইজার ব্যবহার করার পরে হাতে নিয়ম করে ময়শ্চারাইজার বা নারকেল তেল লাগাতে হবে। মুখে ভারী মেকআপ একদম নয়। তৈলাক্ত প্রসাধনী এই সময় ব্যবহার না করাই উচিত। বদলে ত্বক অনুযায়ী হাল্কা ময়শ্চারাইজার, রোদে বের হলে সানস্ক্রিন (অবশ্যই ত্বকের ধরন অনুযায়ী) ব্যবহার করতে হবে। ছোট ছোট ব্রণ ঠোঁট আর নাকের চারপাশে দেখা গেলে চন্দনের প্রলেপ দেওয়া যেতে পারে। তাতে জ্বালা বা চুলকানি অনেকটাই কমবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিমপাতাও খুব কাজে দেয় মাস্কনের সমস্যা রুখতে। নিমপাতা বাটা নাক বা মুখের চারপাশে লাগিয়ে রাখলে আরাম মেলে।
মাস্কের যত্ন নিন
করোনাভাইরাসের যুগে শুধু ত্বকের যত্ন নিলেই চলবে না। ত্বকের বর্ম মাস্কেরও যত্ন নিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগেই বলেছ থ্রি-লেয়ার মাস্ক ব্যবহার করলে ভাইরাস আর নাক-মুখের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে পারবে না। থ্রি-লেয়ার মাস্ক হোক, সার্জিকাল মাস্ক বা সুতির ফ্যাব্রিক মাস্ক, যেটাই ব্যবহার করুন না কেন, নিয়মিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা দরকার। মাস্কে যেন কোনওভাবেই সাবান বা ডিটারজেন্ট না লেগে থাকে সেটা দেখতে হবে। ধোয়ার পরে রোদে রেখে ভাল করে শুকিয়ে নিতে হবে। অনেক সময়েই বাইরের ধুলো-ময়লা জমে থাকে মাস্কে। নিয়মিত পরিষ্কার না করলে তার থেকে ত্বকের সংক্রমণ হতে পারে। তাছাড়া ব্যাকটেরিয়া, প্যাথোজেনও তো কিছু কম নেই বাতাসে। তারাও আটকে থাকে মাস্কের ভাঁজে। কাজেই পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর না রাখলে করোনা রুখতে গিয়ে শেষে ত্বকের রোগ এসে হানা দেবে। ‘মাস্ক-বাদী’ হয়েই যখন বাঁচতে হবে, তখন মাস্কের যত্ন নিন, মাস্কনেদের ভাগান।