
শেষ আপডেট: 14 February 2020 11:09
রত্না ভট্টাচার্য্য শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য
এখন মোগলমারি আর ততটা অপরিচিত নাম নয়, উপরন্তু গ্রামটি বর্তমানে পত্র-পত্রিকার দৌলতে প্রচারের আলোয় আলোকিত। গ্রামটিতে প্রবেশ করতে গেলে সামনেই পড়ে ইটের গাঁথনিযুক্ত মাটির ঢিবি বা স্তূপ। এটি আসলে বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসস্তূপ। প্রায় দেড় হাজার বছর আগে তাম্রলিপ্ত বন্দরকে কেন্দ্র করে বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রভাব বাড়ছিল বিশাল এলাকা জুড়ে। মোগলমারিতে তৈরি হয়েছিল এক বিরাট বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠান। হঠাৎই অন্য একটি সংস্কৃতির আঁচ এসে পড়াতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা বৌদ্ধবিহার আক্রমণের আশঙ্কায় বিহারের মধ্যে একটি ঘরের মেঝে খুঁড়ে তার মধ্যে বৌদ্ধ দেবদেবীর ধাতুর তৈরি প্রায় ৫০টি মূর্তি রেখে গর্ত বুজিয়ে দিয়েছিলেন।
এই স্তূপের খননকার্য শুরু হয় ২০০৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মাধ্যমে। মাঝে কিছু দিন বন্ধ ছিল। ২০১৩ থেকে এই কাজের সামগ্রিক দায়িত্ব বর্তায় রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের অধীন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাঁধে। এখনও পর্যন্ত এই বৌদ্ধবিহার থেকে পাওয়া গিয়েছে পোড়ামাটির কিছু সিলমোহর, মাটির তৈরি আতরদান, নকশা করা ইট, মাটির তৈরি বিভিন্ন ধরনের বাটি, নলযুক্ত পাত্রের ভগ্নাবশেষ ইত্যাদি। এগুলি রাখা আছে খননকার্যের পাশেই এক মিউজিয়ামে। সেটি তালাবন্ধই থাকে। চাবি থাকে গ্রামবাসীদের কাছে। ২০১৬ সালের ২৪ জানুয়ারি রাজ্য পুরাতত্ত্ব দপ্তর উদ্ধার করেছে সেই ৫০টি মূর্তি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ৪৩ সেন্টিমিটার লম্বা অবলোকিতেশ্বেরর একটি মূর্তি। অন্যগুলি ৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা। তার কোনওটা হারীতী, কোনওটি তারা, কোনওটি সরস্বতী বলে পুরাতত্ত্ববিদরা অনুমান করছেন। তাঁদের বক্তব্য, এই মূর্তিগুলি সামনে রেখে বিহারে ধ্যান করা হত। আশার কথা যে, মূর্তিগুলির উপর সবুজ আস্তরণ পড়ে গেলেও খুব যত্নের সঙ্গে পুরাতত্ত্ববিদরা মাটি কেটে আস্তে আস্তে বার করছেন বলেই মূর্তিগুলি অটুট আছে। এই সব মূর্তি প্রমাণ করে যে, দক্ষিণ-পূর্ব ভারতে ওই সময়ে বৌদ্ধ সংস্কৃতির একটি জোয়ার এসেছিল এবং দাঁতনের মোগলমারির এই প্রতিষ্ঠানটি তারই অঙ্গ।
মোগলমারির কাছাকাছি স্থানে একটি ইটের স্তূপ আজও পড়ে আছে, যেটি শশীসেনার পাঠশালা বা সখীসেনার ঢিবি নামে পরিচিত। জনশ্রুতি, এই স্থানে রাজা বিক্রমকেশরীর বিদূষী কন্যা শশীসেনার সঙ্গে রাজার কোটালের ছেলে অহিমানিকের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তারা একই গুরুর কাছে পাঠাভ্যাস করতেন। উভয়ে উভয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাদের এই প্রণয়কথা বিবৃত আছে কবি ফকিররামের ‘সখী সোনা’ কাব্যে।
এই গ্রামে চন্দনেশ্বর নামে একটি শিবমন্দির রয়েছে। মন্দিরটি প্রায় শতাধিক বৎসরের প্রাচীন। ছাদ গম্বুজাকৃতি। চার কোণে চারটি চূড়া যুক্ত হয়ে এটিকে এক অন্যরকম রূপ দিয়েছে।
স্থির হয়েছে মোগলমারিতে গড়ে উঠবে পূর্ণাঙ্গ সংগ্রহশালা। এটি হবে দ্বিতল। নীচের তলায় থাকবে অতিথিশালা। ওপরের তলায় থাকবে স্মারকসম্ভার। মাটির নীচে থেকে যে প্রাচীন বৌদ্ধবিহারের হদিশ মিলেছে, তার সামগ্রিক পরিচয় রাখা হবে এই প্রস্তাবিত সংগ্রহশালায়। সঙ্গে থাকবে উদ্ধার হওয়া সামগ্রী। সংগ্রহশালাটি তৈরি হয়ে গেলে আশা করা যায় পর্যটকদের তালিকায় এটি জায়গা করে নেবে অনায়াসেই।
মোগলমারি থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে দাঁতন আর খড়গপুর জংশন থেকে দাঁতন ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। চৈতন্যদেবের পদধূলিধন্য দাঁতন বৈষ্ণবদের নিকট এক পরম তীর্থস্থান। এই স্থানের নামকরণ নিয়ে বহু মত প্রচলিত আছে। সর্বজনগ্রাহ্য অথচ সরল সাদাসিধে মতটি হল, শ্রীচৈতন্যদেব নীলাচলে যাবার সময় এখানে দাঁতন বা দন্তকাষ্ঠ ব্যবহার করে দাঁতকাঠিটি এখানে ফেলে যান। তখন থেকে এই স্থানের নাম হয় দাঁতন। এই আখ্যানটির প্রমাণস্বরূপ স্থানীয় একটি জগন্নাথদেবের প্রাচীন মন্দিরে প্রস্তরীভূত দন্তকাষ্ঠ রাখা আছে। পাণ্ডারা এটিকে চৈতন্যদেবের নিক্ষিপ্ত দাঁতনকাঠি বলে উল্লেখ করে থাকেন।
‘দাঠাবংশ’ নামক বৌদ্ধগ্রন্থ থেকে যে মতটি উঠে আসে, তা হল-– বুদ্ধশিষ্য ক্ষেমের কাছ থেকে বুদ্ধদন্ত উপহার লাভ করে (দন্তটি ক্ষেম সংগ্রহ করেন বুদ্ধের চিতা থেকে) কলিঙ্গরাজ ব্রহ্মদত্ত এক দন্তমন্দির নির্মাণ করেন এবং স্থানটির নাম দেন দন্তপুর। সেই দন্তপুরই কি এই দাঁতন? মনে প্রশ্ন আসা খুব স্বাভাবিক। দাঁতনের কাছে মোগলমারির বৌদ্ধবিহারটি আবিষ্কৃত হবার পরে এটা মনে হওয়া খুব স্বাভাবিক যে, এই দাঁতনই অতীতের প্রাচীন দন্তপুর। ক্রমে ব্রাহ্মণ্যধর্ম প্রভাব বিস্তার করলে এখানকার দন্তমন্দির থেকে বুদ্ধদন্ত নিয়ে ওড়িশার রাজকন্যা হেমলতা ও জামাতা সুদন্ত বণিকের ছদ্মবেশে তাম্রলিপ্ত বন্দর থেকে জাহাজে করে সিংহল অর্থাৎ বর্তমান শ্রীলঙ্কায় পৌঁছন, সেখানকার রাজার নিরাপদ আশ্রয়ে। তৎকালীন সিংহলরাজ মেঘবাহন পরমশ্রদ্ধায় ধর্মমন্দিরে দন্তটির প্রতিষ্ঠা করেন। এখনও শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডিতে বুদ্ধদন্ত নিত্য পূজিত হচ্ছে।
অতীতের সাক্ষী হয়ে মন্দিরবাজার এলাকায় রয়েছে শ্যামলেশ্বর শিবের মন্দির। উঁচু ভিত্তিবেদির ওপর মন্দিরটি আনুমানিক পনেরো থেকে আঠেরো শতকের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। মন্দিরের স্থাপত্যটি বেশ আকর্ষণীয় প্যাগোডার মত। অনেকটা এলাকা জুড়ে। মন্দিরের কাছের পথ দিয়ে নদের নিমাই শ্রীচৈতন্য নীলাচলে গিয়েছিলেন। মন্দিরটির আদলে প্রাচীনত্বের ছাপ। প্রবেশপথের সামনে কষ্টিপাথরে নির্মিত বৃষভ মূর্তিটি খুবই সুন্দর ভাস্কর্য। গাজন উপলক্ষ্যে প্রচুর ভক্তের সমাবেশ ঘটে।
দাঁতনের ৩ কিলোমিটার দূরে শরশঙ্ক নামে একটি সুবৃহৎ জলাশয় রয়েছে। সম্ভবত জেলার এটি বৃহত্তম দিঘি। শুধু জেলা বললে ভুল হবে, রাজ্যে এ রকম বিরাট দিঘি বিরল। এটির আয়তন ১৫০ একর, পাড় বাদে। এটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। শোনা যায়, রাজা শশাঙ্কের আমলে দিঘিটি খনন করা হয়েছিল। শশাঙ্কের নাম থেকে শরশঙ্কা নামটি এসেছে। বর্তমানে দিঘির পাড় সংলগ্ন অংশে সমবায় সমিতির মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক প্রথায় মাছচাষ করার ব্যবস্থা হয়েছে। দাঁতন থানার পাশে বিদ্যাধর নামে পরিচিত ১,৬০০ ফুট দীর্ঘ অপর একটি দিঘি আছে। বিদ্যাধর নামক জনৈক রাজমন্ত্রীর দ্বারা এটি খনন করা হয়েছিল বলে খ্যাত। জনশ্রুতি, মাটির নীচে দিয়ে শরশঙ্ক ও বিদ্যাধর দিঘিকে যুক্ত করে ৪ হাত উঁচু ও ৩ হাত প্রশস্ত একটি পাথরে নির্মিত সুড়ঙ্গ আছে।
পৌষ সংক্রান্তিতে এখানে একটি বড় মেলা হয়। দাঁতনের জাঁতির সুনাম খুব। এখনও উন্নত জাঁতি প্রস্তুত হয়ে চলেছে কিছু ঘরে।
খড়গপুরে রাত্রিবাস করে জায়গাগুলি ঘুরে নেওয়া সুবিধার হবে। রাত্রিবাসের ঠিকানা- আনারকলি লজ, গোলবাজার, খড়গপুর, দূরভাষ- ০৩২২২ ২৫৫০১০, চলভাষ- ৯৫৬৪১৩৮৮০৭। টুরিস্ট লজ, বাসস্ট্যান্ডের কাছে, খড়গপুর, দূরভাষ- ০৩২২২ ২৫৫০৪৭।
কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।