
শেষ আপডেট: 28 February 2020 02:30
রত্না ভট্টাচার্য্য শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য
বাঁকুড়ার লোকসংস্কৃতি জুড়ে আছে পোড়ামাটির হাতি, ঘোড়া, মনসার চালি ও ঘট। বাঁকুড়া জেলার পথে, ঘাটে, বেদিবাঁধানো গাছতলায় এই পোড়ামাটির হাতি-ঘোড়াগুলিকে ধর্মঠাকুর হিসাবে পূজা করা হয়ে থাকে। আর বাঁকুড়ার মত জঙ্গলাকীর্ণ সর্পবহুল অঞ্চলে যে মনসা পূজার ব্যাপক প্রচলন থাকবে, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। স্থানীয় এই চাহিদাটুকুকে সম্বল করে পাঁচমুড়ার শিল্পীরা যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, আজ তা শীর্ষে পৌঁছে শিল্পজগতের শিরোপা ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
প্রয়োজনমত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে কোনও অখ্যাত গ্রামীণ শিল্প যে কতখানি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে, পাঁচমুড়ার মৃৎশিল্প তার অন্যতম নিদর্শন। এটা শিল্পীদের গর্বের বিষয় যে, অল ইন্ডিয়া হ্যান্ডিক্র্যাফ্টস বোর্ড এই শিল্পটির উন্নতির বিষয়ে বিশেষ যত্ন নিয়েছে এবং তাদের সমিতির প্রতীক হিসাবে নির্বাচন করেছে মাটির ঘোড়াকে। হ্যান্ডিক্র্যাফ্টস বোর্ডের বিজ্ঞাপনগুলিতে এই প্রতীকচিহ্নের ব্যবহার অহরহই দেখতে পাওয়া যায়। বাঁকুড়ার লোকশিল্পের এই নিদর্শন একদা ভারতীয় ডাকটিকিটে ব্যবহৃত হয়েছে। এও কম গর্বের কথা নয়।
এবার একটু গ্রামের ভেতরে উঁকি দেওয়া যাক। তালডাংরা থেকে আট কিলোমিটার দূরে একটি ছোট গঞ্জ। ডানদিকে তালডাংরা পঞ্চায়েত ভবন। তার পাশে বেশ কিছু ঘর আর রাস্তার উলটোদিকে একটি পুরো গ্রাম জুড়ে মাটি নিয়ে এক বিশাল কর্মকাণ্ড চলছে। প্রায় শতাধিক কুমোরের বাস। প্রতিটি বাড়িতেই তৈরি হচ্ছে পোড়ামাটির বিবিধ শিল্পকলা। ঘোড়া, হাতি, অন্যান্য জীবজন্তুর মূর্তি, মনসার প্রদীপ, মা ও ছেলে, দশ মাথার রাবণ, গণেশ, পোড়ামাটির নানা টালি।
মাটির সঙ্গে পাটের আঁশ, গোবর মিশিয়ে ভিজিয়ে রেখে তৈরি হয় কাঁচামাল। তার পর তা দিয়ে একবিঘত থেকে শুরু করে প্রায় একমানুষ পর্যন্ত বড় ঘোড়া, হাতি তৈরি হয়। ছোটগুলি তৈরি হয় ছাঁচে। বড়গুলি তৈরি হয় ধাপে ধাপে।
প্রথমে হাঁড়ি, কলসি তৈরির চাকে নলের মত গলা, চারটি পা এবং ধড় তৈরি হয় প্রয়োজনমত ব্যাস বাড়িয়ে-কমিয়ে। তার পর চার পা আর ধড় জুড়ে ফেলা হয় নরম মাটি দিয়ে। লেজের কাছে একটি ছিদ্র রাখা হয়। গলার কাছে লাগানো হয় অপেক্ষাকৃত সরু একটি নলের মত অংশ। এর পরের অংশ হল, মাথা তৈরি করে গলার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া। কানের কাছেও রাখা হয় দু’টি ছিদ্র। প্রাণীগুলির চোখ বা সামান্য অলংকরণ ছোট ছোট বাঁশের খণ্ড দিয়ে ভিজে মাটির ওপরে অঙ্কিত করা হয়। এর পরে মূর্তিগুলিকে দু’-একদিন রোদ্দুরে শুকিয়ে নেওয়া হয়। মাটি একটু শক্ত হলে রঙের একটা প্রলেপ মাখানো হয়। এ কাজটা সাধারণত পরিবারের মেয়েরাই করে থাকেন। এর পর আগুনের ভাঁটিতে একটির পর একটি মূর্তি সাজিয়ে নিচে থেকে শুকনো খড়, পাতা জ্বালানো হয়। প্রথমদফা পোড়ানোর পর সব জিনিসেরই সাধারণ পোড়ামাটির মত মেটে রং হয়। যেগুলিকে কালো রং করা প্রয়োজন সেগুলিকে ভাঁটিতে দেওয়া হয় আরও একবার। এইভাবেই তৈরি হয়ে যায় হাতি, ঘোড়ারা।
পাঁচমুড়ার নবতম অবদান পোড়ামাটির শাঁখ। ফুঁ দিলে সমুদ্রজাত শঙ্খের অবিকল ধ্বনি বেজে ওঠে। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হল, কাঁচামাটি দিয়ে তৈরি করার পর পুড়িয়েও এর প্রয়োজনীয় অবস্থানটুকু এমনভাবে রাখা হয়, যার ফলে ধ্বনিসৃষ্টিতে কোনও ব্যাঘাত হয় না, একেবারে বেজে ওঠে নিখুঁত শঙ্খধ্বনি। এ-রকম শাঁখ পাঁচমুড়ার একটিমাত্র পরিবারই নির্মাণ করে থাকে। রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপক বর্তমানে প্রয়াত রাসবিহারী কুম্ভকারের পরিবারই বর্তমানে এমন কাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে।
আশ্চর্যের বিষয়, হাতের কাছে এ-রকম একটি মৃৎশিল্পের পীঠস্থান প্রচারের আলোয় এলেও তেমনভাবে জনপ্রিয়তা পায়নি। অতএব, একদিন ছোট্ট ছুটি নিয়ে একছুটে পাঁচমুড়া চলে যাওয়াই যায়। তাতে লাভ অনেক। যেমন, যাওয়ার পথটি একেবারে গ্রামছাড়া ওই রাঙামাটির পথ। দ্বিতীয়, ঘর সাজানোর অঢেল উপকরণ। তৃতীয়, পুতুল তৈরির কৌশল স্বচক্ষে পরখ করা। চতুর্থত, আলাপ করা যেতে পারে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত একাধিক শিল্পীর সঙ্গে, যাঁদের অনেকে বিদেশও ঘুরে এসেছেন। ভরা বর্ষায় মাটির কাজ বন্ধ থাকে এবং গ্রামের কাঁচারাস্তায় যাওয়ারও প্রভূত অসুবিধে। অতএব ভরা বর্ষা বাদ দিয়ে সারাবছরই পাঁচমুড়ার দরজা খোলা পর্যটকদের জন্য।
দেউলভিড়্যা
দেউলভিড়্যা নামে বাঁকুড়া জেলায় একাধিক গ্রাম আছে। গ্রামের নাম দেউলভিড়্যা-– এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, গ্রামগুলি খ্যাত দেউলের জন্য। পুরাকীর্তির দিক থেকেও দেউলভিড়্যা বেশি খ্যাত, কারণ এখানে রয়েছে কালো ল্যাটেরাইট পাথরের রেখ দেউল। পুবমুখী দেউলটিকে জেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরাকীর্তি হিসাবে ধরা হয়। এখানকার প্রধান বিগ্রহটি ছিল পার্শ্বনাথের, যেটি স্থানান্তরিত হয়ে বর্তমানে রয়েছে কলকাতায় ভারতীয় সংগ্রহশালায়, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে। যেহেতু অতীতে এটিও একটি প্রাচীন জৈনকেন্দ্র ছিল, তাই এখান থেকে পাওয়া বহু জৈন মূর্তি রাখালদাস মহাশয় সংগ্রহ করেছিলেন। যাঁদের পুরাকীর্তিতে উৎসাহ আছে, তাঁদের অবশ্যই এই দেউলটি প্রত্যক্ষ করা উচিত।
পাঁচমুড়া থেকে ৭ কিলোমিটার আর পিয়ারডোবা স্টেশন থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে সাব্রাকোণ গ্রাম অবস্থিত। আদ্যন্ত এই গ্রামটিতে এখনও শহুরে ছোঁয়া লাগেনি। নির্মল এই গ্রামের আকর্ষণীয় বিষয় হল, গ্রামের প্রায় শেষপ্রান্তে অবস্থিত রামকৃষ্ণ জিউয়ের মন্দির। মন্দিরটির পশ্চিমদিক দিয়ে ছোট নদী পুরন্দর বয়ে যাচ্ছে। অতীতে এই নদীর দু’টি শাখা মন্দিরটিকে দ্বীপের ন্যায় বেষ্টন করে ছিল। পরবর্তীকালে একটি শাখা মজে যায়। এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ এককথায় চমৎকার। এ-রকম সুন্দর মনোরম পরিবেশে অবস্থিত দেবালয় বাঁকুড়া জেলায় বেশি নেই।
দক্ষিণমুখী মন্দিরটি কিছুটা খর্বাকৃতি, মাকড়া পাথরে তৈরি। সাদা রঙের দেবালয়টি আটচালার। সুউচ্চ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা, তুলসীমঞ্চ, নাটমণ্ডপ (হালে নির্মিত) ভোগরন্ধন গৃহ নিয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মন্দির। মন্দিরশীর্ষে আমলক, কলস, বিষ্ণুধ্বজ এবং শতদলপদ্ম স্থাপিত রয়েছে। খিলানশীর্ষে কিছু ফুলকারির কাজ ছাড়া অন্যও অলংকরণ নেই। দক্ষিণমুখী মূলদ্বারের ওপর প্রতিষ্ঠালিপি রয়েছে। বিগ্রহ পূর্বমুখী। মন্দির প্রাঙ্গণে রয়েছে অশোক, কামিনী, শিউলিগাছেরা। মন্দির প্রাঙ্গণের বাইরে রয়েছে অষ্টকোণযুক্ত রাসমঞ্চ, তবে এটি মন্দিরের সমসাময়িক নয় এবং স্থাপত্যেও কোনও বৈশিষ্ট্য নেই।
কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।