দ্য ওয়াল ব্যুরো: আতঙ্কের আর এক নাম রক্তশূন্যতা। ডাক্তারি পরিভাষায় যাকে বলে অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা। রক্তে লোহিত রক্তকণিকা বা হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে গেলে তাকেই বলেই রক্তাল্পতা। ডাক্তাররা বলেন, রক্তাল্পতা কোনও রোগ নয়। বরং রোগের লক্ষণ। নানা অসুখের কারণ এই রক্তাল্পতা। মূলত মহিলা ও শিশুরাই এই রোগের শিকার, তবে পুরুষরাও ভোগেন রক্তাল্পতায়। শুধু অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলি নয়, অ্যানিমিয়া বিশ্বব্যাপী এক বড় সমস্যা। পরিসংখ্যাণ বলে, বিশ্বজুড়ে ১৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৬০ কোটির বেশি মহিলা রক্তাল্পতায় ভোগেন। আমাদের দেশে অন্তত ৫০ শতাংশের বেশি।
রক্তাল্পতা আসলে কী?
রক্তে লোহিত কণিকার (Red Blood Cells)পরিমাণ যদি কমতে থাকে তাহলে তাকে অ্যানিমিয়া বা রক্তল্পতা বলে। রক্তাল্পতা মানে রক্তের পরিমাণ কমে যাওয়া নয়, বরং লোহিত রক্তকণিকার মধ্যে যে প্রোটিন থাকে যাকে আমরা বলি হিমোগ্লোবিন, সেই প্রোটিনের পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রার থেকে কমে যাওয়া। এই হিমোগ্লোবিন প্রোটিনের মধ্যে থাকে আয়রন এবং ট্রান্সপোর্ট অক্সিজেন। হিমোগ্লোবিন কমে গেলে শরীরে আয়রনের অভাব হয়, যার কারণে নানা রোগ বাসা বাঁধে। অ্যানিমিয়াকে তাই ‘আয়রন ডেফিসিয়েন্সি’ বলে। সাধারণত পুরুষ ও নারীর শরীরে এই হিমোগ্লোবিনের একটা স্বাভাবিক মাত্রা আছে, পুরুষদের ক্ষেত্রে ১৩.৮ থেকে ১৭.২ গ্রাম/ ডেসিলিটার, আর মহিলাদের ১২.১ থেকে ১৫.১ গ্রাম/ ডেসিলিটার। হিমোগ্লোবিনের মাত্রা যদি এই পরিমাণের থেকে কমে যায় তাহলেই রক্তল্পতা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। যদি দেখা যায় কারও শরীরে প্রতি ১০০ মিলিলিটার রক্তে ১১ গ্রাম বা তার কম পরিমাণে হিমোগ্লোবিন আছে, তাহলে তাকে অ্যানিমিক বলা যাবে।
রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে যাচ্ছে কেন, তারও অনেক কারণ আছে। এখন দেখে নেওয়া যাক, রক্তাল্পতা কেন হয়।
কেন কমছে হিমোগ্লোবিন? রক্তাল্পতার কারণ অনেক
ডাক্তাররা বলেন রক্তাল্পতা হয় মূলত তিনটি কারণে। প্রথমত, শরীর থেকে অনেক রক্ত বেরিয়ে গেলে, দ্বিতীয়ত লোহিত রক্তকণিকার পরিমাণ কমে যাওয়া এবং তৃতীয়ত, যদি লোহিত কণিকা নষ্ট হতে শুরু করে। লোহিত কণিকার পরিমাণ কমে যেতে পারে অপুষ্টি ও আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের অভাবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যে মহিলাদের ঋতুস্রাবের পরিমাণ অতিরিক্ত হয় তাদের ক্ষেত্রে অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা খুব বেশি। দীর্ঘমেয়াদি কোনও অসুখ বা ক্রনিক রোগে ভুগলেও রক্তাল্পতা হতে পারে। আবার দুর্ঘটনা জনিত কারণে রক্তক্ষরণ, রক্ত বমি হলে লোহিত কণিকার পরিমাণ কমে যায়। ক্যানসারে ভুগছেন এমন রোগী, রেনাল ফেলিওর বা কিডনির রোগ রয়েছে এমন রোগীর অ্যানিমিয়া হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
থ্যালাসেমিয়া, থাইরয়েডের সমস্যা, ক্যানসার, এডস, লিভারের সমস্যা, ম্যালেরিয়া, ভাইরাল হেপাটাইটিস, রক্তাল্পতার অন্যতম কারণ।
পাকস্থলী বা কোলনে আলসার বা টিউমার হলে শরীরের ভিতর ক্রমাগত রক্তপাত হতে থাকে, যা চট করে টের পাওয়া যায় না। এই কারণেও রক্তাল্পতা হয়।
বি-১২ ও ফোলিক অ্যাসিডের অভাবেও অ্যানিমিয়া হয়। আমিষ খাবারে বি-১২ থাকে। তাই নিরামিষাশীদের মধ্যে বি-১২ জনিত অ্যানিমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
জন্মগত কারণ আছে। থ্যালাসেমিয়ার কারণে রক্তের মধ্যে তাড়াতাড়ি হিমোগ্লোবিন ভেঙে যায়। একে বলে হিমোলাইটিস অ্যানিমিয়া।
অপরিষ্কার শৌচাগার ব্যবহার করলে কৃমি বা হুকওয়ার্মের সমস্যা হতে পারে। কৃমি পাকস্থলী থেকে রক্ত শুষে নেয়। ফলে কৃমি রক্তাল্পতার অন্যতম কারণ।
অল্পেই ক্লান্ত, শ্বাসের সমস্যা হলে হেলাফেলা নয়
বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, অ্যানিমিয়ার ফলে রোগী যে কোন কাজেই অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করেন। দীর্ঘদিনের ক্লান্তি মানসিক অবসাদের কারণও হতে পারে। তা ছাড়া অ্যানিমিয়া থেকে শরীরে হরমোনজনিত নানা সমস্যা দেখা দেয়। যার থেকে চুল পড়ে যায়, সবসময় মাথা ঘোরে, ঝিমুনি লাগে। চামড়ার রঙ ফ্যাকাসে হতে পারে। অনেকের আবার শ্বাসের সমস্যা দেখা দেয়, বুকে ব্যথা হয়, হাত-পায়ের পেশিতে খিঁচুনি হতেও দেখা যায়। এইসব উপসর্গ দেখা দিলে রক্ত পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া জরুরি। হিমোগ্লোবিন টেস্টে বেশি সময় লাগে না। ডাক্তাররা বলেন, যাঁদের ঘন ঘন হিমোগ্লোবিন কমতে থাকে, তাঁদের প্রতিমাসে বা তিন মাস অন্তর পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া জরুরি।
মেদ ঝরাতে গিয়ে ভুল ডায়েট রক্তাল্পতার কারণ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন দ্রুত ওজন কমানোর জন্য জিমে নানা রকম ভারী এক্সারসাইজ করেন মহিলা ও পুরুষরা। অনেক ক্ষেত্রেই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ না মেনেই এই সব ব্যায়াম শুরু করেন। যার কারণে অস্থিসন্ধিতে ফ্লুইডের পরিমাণ কমতে থাকে, যা রক্তাল্পতার অন্যতম কারণ। তা ছাড়া, নেট ঘেঁটে লিকুইড সাপ্লিমেন্ট নিয়ে ওজন কমানোর চেষ্টা করেন অনেকেই। তাতে চটজলদি মেদ কমলেও, উপযুক্ত প্রোটিন, ভিটামিনের অভাব দেখা দেয় শরীরে। ক্যালোরির কথা ভেবে আজকাল অনেকেই রেড মিট খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন, বিশেষত মহিলারা। চিকিৎসকদের মতে, সপ্তাহে একদিন অন্তত দুই থেকে চার আউন্স পরিমাণ যদি রেড মিট খাওয়া যায়, তাহলে শরীরে আয়নের ব্যালান্স ঠিকঠাক থাকে। পাশাপাশি, দুধ, ডিম, পালং শাক, বেদানা, খেজুর, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খেলে আয়রনের ঘাটতি অনেকটাই মেটে।
গর্ভাবস্থায় ভয়ঙ্কর সমস্যা রক্তাল্পতা
গর্ভবতী মহিলারা রক্তাল্পতায় বেশি ভোগেন। গর্ভস্থ ভ্রূণের বিকাশের জন্য বেশি মাত্রায় আয়রন প্রয়োজন। তাই এই সময় শরীরে আয়রনের স্বাভাবিক মাত্রা কমে গেলে ভ্রূণের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। সময়ের আগেই প্রসব, গর্ভপাত বা গর্ভের মধ্যে ভ্রূণের মৃত্যু অবধি ঘটতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, গর্ভবতী মহিলাদের নিয়মিত হিমোগ্লোবিন পরিমাপ করা দরকার। প্রয়োজন পরিমাণমতো পুষ্টিকর ও আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের দরকার। তেমন প্রয়োজন হলে আয়রন সাপ্লিমেন্ট দেওয়ারও ব্যবস্থা করেন ডাক্তাররা। হিমোগ্লোবিন-এর মাত্রা ৭-এর নীচে নেমে গেলে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হয়। এই সময় বেশি পরিমাণে মাছ, মাংস, ডিম, মাংসের মেটে ডয়েট চার্টে রাখলে ভাল হয়। নিরামিষাশী হলে সবুজ শাক-সব্জি বেশি করে খেতে হবে। থোড়, মোচা, শস্যদানা, বাদাম, খেজুর, অঙ্কুরিত ছোলায় প্রচুর আয়রন থাকে। ফলের মধ্যে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল ডায়েটে রাখলে ভাল।
অপুষ্টি, কুসংস্কারে রক্তল্পতা বাড়ছে, দেশের মা-বোনেরা বেশি ভুগছেন
আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল অনেক মা এবং তাঁদের পরিবার পরিজনেরা রক্তাল্পতার ভয়াবহতা সম্পর্কে উদাসীন। প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে অশিক্ষা, ভ্রান্ত ধারণা, কুসংস্কারও রয়েছে এর পিছনে। আগে গর্ভাবস্থায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে রাজি হতেন না মহিলারা, আয়রন ট্যাবলেট খাওয়াতেও অনীহা ছিল। তাই প্রসবকালীন সময় অনেক মায়েরই মৃত্যু হত। এখন সে সমস্যা কিছুটা কাটিয়ে ওঠা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আয়রনের পাশাপাশি জিঙ্কের ঘাটতিও দেখা যাচ্ছে শরীরে যাকে বলা হয় Micronutrient Malnutrition। সমীক্ষা বলছে ভারতেই ৮০ শতাংশ গর্ভবতী মহিলা, ৫২ শতাংশ মহিলা (যাঁরা গর্ভবতী নন), ৭৪ শতাংশ শিশু (বয়স ৬-৩৫ মাস) রক্তাল্পতায় ভোগে। বয়স পাঁচ বছরের নীচে এমন ৫২ শতাংশেরও বেশি বাচ্চা ভোগে জিঙ্কের ঘাটতিতে।
সমীক্ষা বলছে, ২০০৫-০৬ সালে দেশের ৫ বছরের কমবয়সী শিশুর ৭০ শতাংশ ছিল অপুষ্টিজনিত রোগের শিকার। ২০১৫-১৬ সালে দেশের ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই হার ৩৮-৭৮ শতাংশের মধ্যে। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষাও বলছে, দেশে পাঁচ বছরের নীচে থাকা প্রায় ৫৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে সাত কোটি শিশু রক্তাল্পতায় ভোগে। বয়সের তুলনায় ওজন কম সাড়ে চার কোটি শিশুর। যার মূল কারণ অপুষ্টি। হিমোগ্লোবিনের অভাবে এই শিশুরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে সহজে। রোগের শিকার হয়। অপুষ্টির কারণে এদের মস্তিষ্কেরও পূর্ণ বিকাশ ঘটে না।