পেটরোগা শব্দটা প্রায়ই আমরা অনেককে বলি। পেটের নানা সমস্যায় সে মানুষগুলো সারা বছরই জেরবার থাকেন। পেট ব্যথা থেকে পেট খারাপ সবসময়েই তাঁদের সঙ্গী। পেটের সমস্যাগুলোর একটা, “কোলাইটিস”। সেটা কী, কেন হয়, কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা নিয়েই কনসালটেন্ট গ্যাসট্রোএনটেরোলজিস্ট ডঃ সুজয় মৈত্র-র সঙ্গে কথা বলল ‘দ্য ওয়াল’। জানুন কী বললেন ডাক্তারবাবু--
দ্য ওয়াল: কোলাইটিস কী? কেন হয়?
ডঃ মৈত্র: কোলন মানে আমাদের বৃহদন্ত্র। কোলনের ভিতরের প্রদাহই কোলাইটিস। যে কোনও কিছুর পিছনেই আইটিস জুড়ে দিলে তা প্রদাহের কথাই বলে। অর্থাৎ বৃহদন্ত্রের ভিতরে যখন ঘা তৈরি হয়, বৃহদন্ত্র ফুলে যায়, লাল হয়ে যায়, তখন তাকে বলে কোলাইটিস। আমাদের খাবার হজমের পর এই কোলনের মধ্যে দিয়েই পায়ুপথে আসে। এই রাস্তাটাই যদি ইনফেকটেড হয়ে থাকে তাতে সমস্যা তো হবেই।
এক্সাক্টলি কেন হয় সেটা এখনও বলা যায় না। তবে মূলত দুভাগের কোলাইটিস হয়। এক হতে পারে ইনফেকশনের জন্য। ইনফেকটিভ কোলাইটিস বলে একে। আগে কলেরা হত, সেটার জন্যও হত কোলাইটিস। এখন সালমোনেলার জন্য অনেক সময়ে এই কোলাইটিস হয়। এই সালমোনেলা ব্যাকটিরিয়ার জন্য টাইফয়েড হয়। আবার ভাইরাল ইনফেকশনের জন্যও হয় এই কোলাইটিস। তবে আমরা গ্যাসট্রোএনটেরোলজিস্টরা ইনফ্লেমেটরি বাওয়েল ডিসিজ়ের পেশেন্ট আজাকাল অনেক বেশি পাই। এটা কিন্তু কোনও ইনফেকশন নয়। এটা একটা সমস্যা যেখানে মানুষের শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা কোথাও ফেল করে, আর তা থেকেই বৃহদন্ত্রের ভিতরে জ্বালাভাব বা প্রদাহ তৈরি হয়। এর আবার দুটো ভাগ। ১. আলসারেটিভ কোলাইটিস। যেখানে, ছোট ছোট আলসার পুরো কোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটা রেক্টাম থেকে শুরু করে পুরো কোলনে ছড়িয়ে থাকে বা কোথাও কোথাও ছড়িয়ে থাকে। এক্ষেত্রে আলসারগুলো বা ঘা গুলো একে অন্যের সঙ্গে আটকে থাকে। ২. ক্রোনস ডিসিজ়। এক্ষেত্রে কোলন ছাড়াও, ক্ষুদ্রান্ত্রের বিভিন্ন জায়গায় এই আলসার ছড়িয়ে থাকে। ঘা বা ক্ষত অনেক গভীর হয়, বড় হয়, একটার সাথে আরেকটা ছাড়া ছাড়া ভাবে থাকে।
খাওয়ার অনিয়মের জন্যই শুধু হয় আলসার, তা বলা যায় না। তবে হ্যাঁ , অবশ্যই এটাও একটা কারণ। কিন্তু এই যে বললাম, শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা হঠাৎ করে কমে গেলে, বৃহদন্ত্রের মধ্যে যে পরিমাণ ইনফেকশন তৈরি হয়, তা থেকেই হয় এই সমস্যা।
দ্য ওয়াল: বয়সের কোনও সীমা থাকে? না, যে কোনও কারও ক্ষেত্রেই এই রোগ হতে পারে? লিঙ্গভেদে কোনও আলাদা বিষয় থাকে কি ?
ডঃ মৈত্র: না, বয়সের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। যে কোনও অবস্থাতেই এই দু’রকম কোলাইটিসই হতে পারে। তবে একেবারে নিউ বর্নদের ক্ষেত্রে হয় না কোলাইটিস। ২,৩ বছর থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত যে কোনও মানুষেরই হতে পারে এই সমস্যা। আর লিঙ্গভেদেও যে খুব একটা আলাদা কিছু হয় তা কিন্তু নয়। কোলন তো মহিলা, পুরুষ সকলেরই এক।
দ্য ওয়াল: কী কী উপসর্গ থাকে? কখন মানুষের সাবধান হওয়া উচিত?
ডঃ মৈত্র: পেট ব্যথা, বারেবারে পটি হওয়া, মলের সঙ্গে রক্ত পড়া, কখনও কখনও রক্ত পড়ল না, কিন্তু খুব দ্রুত ওজন কমলে বুঝতে হবে কোলাইটিস। এটা মূলত ক্রোনস ডিসিজ়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়। বারবার পাতলা পটি হয়, কিন্তু রক্ত পড়ে না। অথচ ওজন কমতে থাকে। এগুলোই উপসর্গ এই রোগের।
মানুষ আগে থেকে সাবধান হওয়ার সুযোগ পান না। কারণ এই রোগ অতর্কিতে হামলা করে।
দ্য ওয়াল: আলসার আর কোলাইটিসের সম্পর্ক এবং কোলাইটিস থেকে ক্যানসার হতে পারে কি?
শুনুন কী বললেন ডাক্তারবাবু...
https://www.youtube.com/watch?v=aQ01Bcqdkf8&feature=youtu.be
দ্য ওয়াল: অপারেশন ছাড়া কি কোনও গতি থাকে না?
ডঃ মৈত্র: বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপারেশন লাগে না। কোলাইটিস ইনফেকশন থেকে হলে কিছুদিন অ্যান্টিবায়োটিক খেলে ঠিক হয়ে যায়। আর আলসারেটিভ কোলাইটিস হলে, তার তীব্রতার উপরে নির্ভর করে কী ওযুধে চিকিৎসা শুরু করব। খুব তীব্র সমস্যা হলে রোগীকে স্টেরয়েড দেওয়া হয় সাময়িকভাবে ওই প্রদাহকে বাগে আনার জন্য। খুব কম মাত্রায় এই স্টেরয়েড দেওয়া হয়। আর ক্রমে ক্রমে কমানো হয় স্টেরয়েডের মাত্রা। ২-৩ মাস ধরে এই ওষুধ সঙ্গে একটা দুটো ওষুধে অনেকেরই কাজ হয়ে যায়। আর যাঁদের রিল্যাপ্স করে তাঁদের ক্ষেত্রে আবার চালু করতে হয় স্টেরয়েড।
তবে কারও ক্ষেত্রে এই ওষুধগুলো কাজ না করলে, তখন সমস্যা হয়। কোনো ওষুধই কাজ না করলে আলসারেটিভ কোলাইটিসে শেষ অস্ত্র হিসেবে অপারেশনকে বেছে নিতে হয়। পুরো কোলন বা বৃহদন্ত্রই কেটে বাদ দেওয়া হয় এক্ষেত্রে। ক্রোনস কোলাইটিস মানে যেটা ক্ষুদ্রান্ত্রে ছড়িয়ে পড়ে, সেটায় অপারেশন করা খুবই কঠিণ হয়। করতে হলে পুরো ইন্টেসটাইনকেই বাদ দিতে হয়। হজম শক্তিই আর থাকবে না, তবে এ পর্যন্ত খুব কম রোগীকেই যেতে হয়।
দ্য ওয়াল: কোলনস্কপি, সিগময়েডস্কপি কী, কেন করতে হয়?
ডঃ মৈত্র: যান্ত্রিক এই পদ্ধতি ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই এই রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে। প্রথমে কোলনস্কপিই করা হয়। এই রিপোর্টে পুরো কোলন ক্ষতিগ্রস্ত ধরা পড়লে, বারবার কোলনস্কপিই করতে হয়। আর কোলনের বাঁ দিকটা ক্ষতিগ্রস্ত কি না সেটা দেখতে করা হয় সিগময়েডস্কপি।
দ্য ওয়াল: খাওয়ার ক্ষেত্রে কী কী রেস্ট্রিকশন আনতে হবে? সেটা কি সারাজীবন মেনে চলতে হবে?
ডঃ মৈত্র: সরাসরি কোনও সম্পর্ক নেই খাবারের সঙ্গে , তবে যে খাবারগুলো কোলনকে ইরিটেট করতে পারে সেগুলো আমরা বন্ধ করতে বলি। হাই ফাইবারের যে কোনও খাবার যেমন শশা, বাঁধাকপি, যে কোনও শাক, দুধের কোনও খাবার, কফি, কাঁচা পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি। আমি টকদই খেতে বলি তাতে থাকা প্রোবায়োটিকের জন্য।
দ্য ওয়াল: প্রেশার বা সুগারের রোগী হলে এই কোলাইটিসে কতটা প্রভাব পড়ে?
ডঃ মৈত্র: প্রেশারের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক না থাকলেও, সুগারের ক্ষেত্রে আছে। সুগারের পেশেন্ট হলে ওষুধ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বিধি নিষেধ মেনে চলতে হয়।
দ্য ওয়াল: কোলাইটিস কখনও পুরোটা সেরে যেতে পারে?
ডঃ মৈত্র: ইনফেকটিভ কোলাইটিস সেরে যেতে পারে, তবে ইনফ্লেমেটারি বাওয়েল ডিসিজ় হলে সারা জীবন থেকে যায়। তাই খাওয়া দাওয়া খুব সামলে করতে হয়। মাঝে ওষুধ বন্ধ করলে যদি ঠিক থাকে রোগী তাহলে ভালো, নইলে আবার শুরু করতে হয় চিকিৎসা।
দ্য ওয়াল: ইনফ্লেমেটারি বাওয়েল ডিসিজ় আর ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোমের মধ্যে তফাৎ কী?
ডঃ মৈত্র: দুটোই কোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত, তবে আলাদা বিষয়। ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোমের ক্ষেত্রে ভিতরে কোনও আলসার বা ঘা থাকে না। তাই কোলনস্কপি একদম পরিষ্কার রিপোর্ট দেয়। আর ইনফ্লেমেটারি বাওয়েল ডিসিজ় হলে তাতে কোলনের ভিতরে ঘা থাকে।
দ্য ওয়াল: ধূমপান, মদ্যপান এই রোগে কতটা প্রভাব ফেলে?
ডঃ মৈত্র: মদ্যপান যে কোনও সময়েই কাউকে বলা যায় না, যে হ্যাঁ খাও। তবে এর সঙ্গে কোলাইটিসের কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু ধূমপানের সঙ্গে আছে তো বটেই। তবে মজার বিষয় হল, সাধারণত আলসারেটিভ কোলাইটিসের ক্ষেত্রে ধূমপান কিন্তু রোগ সারাতে কাজে আসে, আবার ক্রোনস কোলাইটিস হলে সেটায় মারাত্মক ক্ষতি হয় এই ধূমপানে। তবে আলসারেটিভ কোলাইটিসের রোগীরা তার জন্য আবার ধোঁয়াকে আপন করে নিলে সমস্যা। কারণ আমরা সকলেই জানি, ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে কতটা ক্ষতিকর।
তাহলে অতর্কিতে হামলা করা এই রোগকে সামলে নিন নিজের মতো করে। আর সুস্থ থাকুন।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়।