করোনা কালে হার্টের রোগের ঝুঁকি অনেকটাই বেড়েছে। একদিকে ভাইরাসের সংক্রমণ, অন্যদিকে আতঙ্ক, চিন্তা, মানসিক চাপ, অবসাদ ও উদ্বেগে হার্টের রোগ বাধিয়ে ফেলছেন অনেকেই। অতিরিক্ত উৎকণ্ঠা থেকে দুর্বল হয়ে পড়ছে আপনার হৃদযন্ত্র। এমন জটিল সময়ে হার্ট ভাল রাখবেন কীভাবে? হৃদরোগীরা কী কী সাবধানতা মেনে চলবেন? হার্টের রোগীদের যদি করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে তাহলে কী করা উচিত? কখন সতর্ক হওয়া প্রয়োজন? বিস্তারিত আলোচনায় সিনিয়র ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট অ্যান্ড ডিভাইস স্পেশ্যালিস্ট ডক্টর দিলীপ কুমার।
দ্য ওয়াল: করোনা সংকটে উদ্বেগে ভুগছেন অনেকেই। না থাকলেও বাধিয়ে ফেলছেন হার্টের অসুখ। তাঁদের জন্য কী বলবেন?
ডক্টর: গত তিন-চার মাস ধরে আমরা দেখেছি করোনা সংক্রমণ নেই এমন সুস্থ মানুষদের চিন্তাভাবনাতে নানা পরিবর্তন এসেছে। সংক্রমণের ভয়ে মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে তাঁদের মধ্যে। উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় ভুগছেন অনেকেই। স্বাস্থ্য সঙ্কটের এই জটিল সময় এটা একেবারেই ভাল লক্ষণ নয়। আমি বলব, কোনও কারণে ট্রমার মধ্যে থাকলে বা অবসাদে ভুগলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। শরীরের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখাও এই সময় সবচেয়ে বেশি জরুরি।
আসলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের এই পর্যায়ে শারীরিক জটিলতা যতটা না তৈরি হচ্ছে, মানসিক অস্থিরতা তার থেকে অনেক বেশি। ভয় আর আতঙ্ক থেকে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে যা বড় আকার নিচ্ছে। এই মানসিক সমস্যা একজন বা দু’জনের নয়। উদ্বেগে ভুগছে সমাজের একটা বড় অংশই। সেখানে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মীরা যেমন রয়েছেন, তেমনি সরকারি অধিকর্তারাও রয়েছেন। তাই সমস্যাটা সকলেরই। এর থেকে সমাধানের পথ খুঁজতে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে হবে। আমি বলব, মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন, বন্ধু-আত্মীয়-কাছের মানুষদের সঙ্গে আলোচনা করুন। সকলে মিলেই এই লড়াইটা লড়তে হবে।
দ্য ওয়াল: দীর্ঘ লকডাউনে বহু হৃদরোগীর নিয়মিত চেকআপে বাধা পড়েছে। তাঁরা কী করবেন?
ডক্টর: এটা খুবই জরুরি প্রশ্ন। অনেকেই জিজ্ঞাসা করেন, করোনার সময় হার্টের রোগীদের কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়। আচমকা হার্ট অ্যাটাক হলে কি করোনা পরীক্ষা করানোর দরকার রয়েছে? আমি খুব স্পষ্টভাবেই বলতে চাই, হার্ট অ্যাটাক বা হার্ট ব্লক হলে সঙ্গে সঙ্গেই তার চিকিৎসা শুরু করা উচিত, রোগী করোনা পজিটিভ না নেগেটিভ সে পরীক্ষা পরে হবে। করোনা টেস্ট করাতে যতটা সময় লাগে, ততক্ষণ অবধি অপেক্ষা করলে বিপদ হতে পারে। সুরক্ষার সব নিয়ম মেনে, পিপিই পরেই হার্ট অ্যাটাক বা হার্ট ব্লকের রোগীকে আইসিইউতে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা শুরু করানো জরুরি।
ভাল খবর হল, গত তিন মাসে এমন তিন জন হার্ট ব্লকের রোগীর চিকিৎসা হয়েছে যাঁদের প্রত্যেকেরই বয়স ছিল ৯০ বছর বা তার উপরে। তিনজন রোগীরই পেসমেকার বসেছে এবং তাঁরা সম্পূর্ণ সুস্থ শরীরে বাড়ি ফিরে গেছেন। কার্ডিয়াক এমার্জেন্সিতে আমরা দেরি করি না। অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি বা বাইপাস সার্জারি হয়েছে এমন রোগীদের আগে গুরুত্ব দেওয়া হয়। হার্টের রোগ নেই (নন-কার্ডিয়াক) যেমন হার্নিয়া বা হাইড্রোসিলের অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে আমরা কোভিড টেস্ট করিয়ে নিতে বলি। কারণ সেক্ষেত্রে রোগীদের শারীরিক অবস্থা বুঝে তাঁদের অন্যান্য টেস্ট করিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
দ্য ওয়াল: হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে কোভিডের আশঙ্কা বেশি বলে জানা গেছে। কীভাবে অতিরিক্ত যত্ন নেবেন তাঁরা?
ডক্টর: হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশনের রোগীদের বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ করোনাভাইরাস শরীরে ঢুকে হৃদপেশীতে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। যার কারণে হৃদপেশীতে প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন শুরু হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, হার্টের রোগী কোভিড সংক্রমণের কারণে হাইপোক্সিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। হাইপোক্সিয়া হল এমন রোগ যেখানে দেহকোষে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়। যদি অক্সিজেন সাপ্লাই একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় তখন তাকে অ্যানোক্সিয়া বলে। কোভিড সংক্রমণের কারণে হাইপোক্সিয়ার ঝুঁকি বেশি। আর এই রোগ হলে হার্ট অ্যাটাকের শঙ্কাও বেড়ে যায়। তাই আমরা বলি, কার্ডিয়াক রোগীদের আইসোলেশনে বেশি থাকা দরকার। রোগীর বয়স যদি ৬৫ বছর বা তার উপরে হয় এবং আনুসঙ্গিক হাইপারটেনশন বা অন্যান্য রোগ থাকে তাহলে সতর্কতা বেশি জরুরি। হোম-আইসোলেশনে থাকলেও সবসময় মাস্ক পরে থাকা উচিত, পুষ্টিকর খাবার জরুরি। পরিচ্ছন্নতার দিকে খেয়াল রাখা দরকার।
দ্য ওয়াল: মধ্যবয়স্ক বহু মানুষের ছোটখাটো হার্টের সমস্যা থাকে, তাই নিয়েই এখন বাধ্য হয়ে গণপরিবহণ ব্যবহার করতে হচ্ছে তাঁদের। কী করবেন তাঁরা?
ডক্টর: হার্টের অবস্থা যদি স্থিতিশীল হয় তাহলেই গণ পরিবহনে যাওয়া উচিত। আর সে ক্ষেত্রেও কিছু নিয়ম মানা জরুরি। যেমন, ভিড় কম এমন ট্রান্সপোর্টই ব্যবহার করা ভাল। সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং মেনে চলা সবচেয়ে আগে দরকার, মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক। আরও একটা কথা বলি, যদি অফিস বা কর্মস্থান কাছাকাছি হয় তাহলে সাইকেল বা স্কুটি ব্যবহার করা ভাল। মুখে মাস্ক পরে সাইকেল চালিয়ে চলে যান, লোকজনের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি হবে না। সংক্রমণের ঝুঁকিও কমবে।
দ্য ওয়াল: লকডাউনের সময়ে রাতবিরেতে আচমকা বুকে ব্যথা, কীভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব এমার্জেন্সি পরিস্থিতি?
ডক্টর: এটা অনেক বড় সমস্যা। বিশেষত লকডাউনের এই সময়। রাতবিরেতে আচমকা বুকে ব্যথা হলে বা শারীরিক অস্বস্তি হলে যাতায়াতের সমস্যা রয়েছে। চট করে অ্যাম্বুল্যান্স পাওয়াও কঠিন। তাই বাড়িতে হার্টের রোগী থাকলে, সবসময় ডাক্তারদের ফোন নম্বর সঙ্গে রাখা জরুরি। এখন টেলি-মেডিসিন চালু হয়েছে অনেক জায়গায়। জরুরি পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই কাছাকাছি কোনও হাসপাতালে যোগাযোগ করে রাখা ভাল। রাতে অ্যাম্বুল্যান্সের দরকার হলে যাতে সেই সুবিধা মেলে তার ব্যবস্থা করে রাখা উচিত।
দেখুন, কী বলছেন দিলীপ কুমার।
https://www.facebook.com/242319389675391/videos/318222352700054/?__so__=channel_tab&__rv__=all_videos_card
দ্য ওয়াল: দর্শক-শ্রোতাদের উদ্দেশে আপনি কোনও বিশেষ বার্তা দিতে চান?
ডক্টর: আমি এটাই বলতে চাই করোনা সঙ্কটের এই পরিস্থিতিতে ডাক্তারদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলুন। বিশেষত কার্ডিয়াক রোগীদের আরও বেশি করে ডাক্তারদের পরামর্শে থাকা জরুরি। ফোন করুন, টেলি-মেডিসিনের সুবিধা নিন। হাসপাতাল, নার্সিংহোমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন অ্যাম্বুল্যান্স সার্ভিসের সঙ্গে কথা বলে রাখুন। আমার মনে হয়, তাহলেই অনেকটা সুরক্ষিত থাকা সম্ভব।
চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করার উপায়:
ডক্টর দিলীপ কুমার
সিনিয়র ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট অ্যান্ড ডিভাইস স্পেশ্যালিস্ট
মেডিকা সুপারস্পেশ্যালিটি হসপিটাল
টেলিফোন: 9748487563
ইমেল: dilip.kumar@medicasynergie.in