
শেষ আপডেট: 4 April 2019 18:30
১৯৪৩-এ এখানেই নেতাজি প্রথমবারের মতো তেরঙ্গা উড়িয়ে ছিলেন৷ ১৯৪৭-এ স্বাধীনতা৷ তারপর ২০১৮৷ এই প্রতিবেদক যখন সেখানে ছিল সেই সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এসে পৌঁছন সবিশেষ অনুষ্ঠানে৷ ১৯৪৩ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, অক্ষশক্তি মূলত জাপানের সহায়তায় প্রথম তেরঙা পতাকা উড়িয়ে ছিলেন এই দ্বীপভূমিতেই৷ তারই ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে (২০১৮) ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আগমন৷ কিন্তু এখনও এই দ্বীপভূমি যেন ভারতের বাইরেরই একটা অঙ্গ যাকে ভারত শাসন করছে৷
এই দ্বীপভূমির সবচেয়ে 'সম্মানীয়' মাছের নাম সুরমাছ৷ এখানকার লোকজনের বক্তব্য ''আপনাদের ইলিশের মতোই এর স্বাদ৷'' আর আছে অ–কুলীন জোনা মাছ৷ আঞ্চলিক মাছ৷ কিন্তু তার স্বাদ-টাদ নিয়ে কোনও কথা না বলাই ভালো৷ এর দামই কেজি প্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা৷ পোর্টব্লেয়ার হোক বা হ্যাভলক দ্বীপ, ১০ টাকার প্যাকেটের ম্যাগি সেদ্ধ করে মশলা দিয়ে পরিবেশিত হলে অবধারিত দাম ৪০ টাকা৷ নাগা, রাম, রাজু-র মতো ড্রাইভাররা বলছিলেন, ''শসা, আনারস, পেঁপে বাদে আমাদের এখানে কিছু নেই৷ ভালো করে ধান চাষও হয় না৷ সব আসে ম্যাড্রাস (এঁরা চেন্নাই বলেন না) বা ক্যালকাটা থেকে। আমাদের এখানে রুই-কাতলাও পাবেন না৷'' চারদিকে গভীর সমুদ্র। জলের অসামান্য বর্ণ বৈচিত্র্য আর অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য পর্যটকের ভিড় লেগেই থাকে। কিন্তু একই সঙ্গে মূল ভূখণ্ড থেকে যাতায়াত যথেষ্ট ব্যয়সাধ্য বলে এখানে তাঁরাই আসতে পারেন যাদের বেড়াতে গিয়ে হিসেব করার তেমন কোনও প্রয়োজন নেই। এই সত্যটি বিলক্ষণ জানে গাড়ির ড্রাইভার থেকে নামী অনামী হোটেল মালিক মায় পথের ধারের ধাবাওয়ালারা। সে কারণেই আমাদের গাড়ির সারথি দাম নিয়ে আমার বিরক্তি লক্ষ্য করে নিতান্তই নির্লিপ্ত ভঙ্গীতে জানায়, ''এখানে পয়সাওয়ালা কাস্টমাররাই আসে৷'' অর্থাৎ যুক্তিটা এই, পর্যটকদের পয়সা যখন আছে তখন তাদের কাছ থেকে অন্যায্য দাম নেওয়ার হকও আছে দ্বীপের ছোট থেকে বড় সব মাপের ব্যবসায়ীদের।
অন্যান্য 'ট্যুরিস্ট স্পট' থেকে আন্দামান আর একটি বিষয়ে স্বতন্ত্র। এখানে যাঁরা বেড়াতে আসেন তাঁদের মধ্যে ৯৫ শতাংশ মানুষ আসেন ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে। ফলে দু'বেলা খাবার বা ঘোরার অর্থ যেহেতু তারা আগেই গচ্ছিত করে দেন, এখানকার অস্বাভাবিক দামের ব্যাপারটি তাঁরা তেমন ভাবে বুঝে উঠতে পারেন না। আসলে এখানে এটাই দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, এখানে বেড়াতে এসে ৪০ টাকা দিয়ে একটা তন্দুরি রুটি খেতে হবে৷ পথের ধারে ধাবায় টমেটো আলু কড়াইশুটি ফুলকপির তরকারির দাম ১৭০ টাকা৷ কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল অ–পর্যটকদের জন্য জিনিসপত্রের দাম আবার অন্যরকম। অর্থাৎ একই জিনিসের দু'রকম মূল্যের বাজার রয়েছে আন্দামানে।
হ্যাঁ, আন্দামানের শহুরে চরিত্ৰে এটাই বাস্তব৷ একই সঙ্গে দুই চরিত্রের সহাবস্থান এই দ্বীপভূমিতে। অসম্ভব সৌন্দর্য যেমন এই দ্বীপভূমির এ পাশে ও পাশে ছড়িয়ে আছে, ঠিক তেমনই আকাশছোঁয়া দামও ছড়িয়ে আছে৷ জারোয়াদের বনাঞ্চল পেরিয়েই সরকারি চেকপোস্ট৷ মাথার ওপর ত্রিপল দেওয়া দোকানে ধোসা মিলবে ৬০ টাকায়৷ বার বার এই টাকার কথা ওঠার কারণ একটাই৷ সাধারণ মানুষের বেড়াতে আসার জন্য নয় আন্দামান৷ কেন্দ্রে এতবার এত রকমের সরকার এসেছে কিন্তু তারা কেউই মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে এই দ্বীপের সাধারণ মানুষ, প্রতিদিনকার মানুষজনের কথা ভাবেনি৷ অতএব যা হয়, ভাত থেকে শুরু করে কারণবারি--- সবেতেই অদৃশ্য আগুনের উত্তাপ। দামের উত্তাপ।
মাত্র তিন রাত্রি বাস করে একটা বিষয় স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি, এখানকার মানুষজন রাস্তায় নেমে 'দিতে হবে দিতে হবে' টাইপের নয়৷ বলা যেতে পারে বহুলাংশেই শান্তিপ্রিয় মানুষজন। মূল ভারত ভূখণ্ড নিয়ে আদৌ চিন্তিত নয়৷ অনেকটা বঙ্কিমের ভাষায়, 'মরুক রামা লাঙ্গল চষে, আমার ফাউলকারি সুসিদ্ধ হইলেই হইল৷' যে কোনও ধরনের অপরাধের পরিমাণ পরিসংখ্যান অনুযায়ী কম৷ হাতে গোনার চেয়েও কম৷ অতএব মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন শান্ত নিরিবিলি এই জনপদের বাজারে আগুন লাগলেও আজও যেন সেই উত্তাপ মনে জ্বালা ধরায় না৷ কেননা যত দামই হোক না কেন এখানকার মানুষ জানে এই বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডে পর্যটক আসবেই সৌন্দর্যের টানে এবং ফিরে যাবে অপূর্ব সবুজ বনরাজি আর বর্ণময় সমুদ্রের স্মৃতি নিয়ে।