
শেষ আপডেট: 4 January 2021 18:30
এবার আসা যাক হার্টের রোগীদের কথায়। হার্টের রোগী যাঁরা করোনা সংক্রমণ সারিয়ে উঠেছেন তাঁদের কীভাবে সাবধান থাকতে হবে, কী কী নিয়ম মানতে হবে সেটাই সহজ করে বলছি। হয়ত সকলেই শুনেছেন, তিন-চার মাসেও হার্টের রোগীদের নিয়ে চিন্তা ছিল খুব বেশি। অনেকক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছিল, করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ার পরে রোগীদের কার্ডিয়াক ফাইব্রোসিস হচ্ছে, ফুসফুসে ফাইব্রোসিস হচ্ছে। মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বেঁধে জটিল রোগ ধরছে। করোনা সংক্রমণ হলে এই ধরনের রোগের সম্ভাবনা আছে বলে সতর্ক করাও হচ্ছিল। তবে ভাল কথা হল, এই ভয়টা এখন কেটেছে। গত চার মাসে এমন জটিল রোগ কোনও করোনা রোগীর শরীরেই সেভাবে দেখা যায়নি। তাই আমি বলব, হার্ট বা কোমবির্ডিটির রোগী যাঁরা সংক্রমণ সারিয়ে সুস্থ হয়েছেন, তাঁরা আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে বাঁচুন। তবে হ্যাঁ, কিছু নিয়ম মানতেই হবে। মাস্ক, সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং জরুরি। যে ধরনের নিয়মগুলো বলে দেওয়া হয়েছে সেগুলো মেনে চলতেই হবে। সঠিক ডায়েট মানতে হবে। শরীরকে বিশ্রাম দেওয়াটাও জরুরি।
দ্য ওয়াল: কতদিন চলতে হবে এভাবে?
ডক্টর: আগেই বলেছি, করোনা সংক্রমণে হার্ট বা ফুসফুসের ফাইব্রোসিস জনিত রোগ এখন ধরা পড়ছে না। তাই অযথা ভয়, উৎকণ্ঠার দরকার নেই। সংক্রমণের ভয়ে মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে অনেকের মধ্যেই যেটা ভাল কথা নয়। আমি বলব, সুস্থভাবে, স্বাভাবিক জীবন কাটান। আগে যেমনটা ছিলেন, ঠিক তেমনভাবেই। শরীরের দিকে খেয়াল রেখে চলাটা জরুরি। সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং মেনে, মাস্ক পরে বাইরে বের হতে হবে। রুটিন চেকআপ করানো, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে শরীরচর্চা এগুলো করলে আর কোনও ভয়ই থাকবে না।
দ্য ওয়াল: ইকমো পদ্ধতিতে অনেক কোভিড-রোগী সারভাইভ করেছেন বলে শোনা গেছে। ইকমো কী?
ডক্টর: কোভিড পর্যায়তে অনেক রোগীকেই ইকমো দিয়ে বাঁচানো হয়েছে। এই ইকমো পদ্ধতি নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করেন, যেমন ইকমো কী? নন-কোভিড পর্যায়ে ইকমোর গুরুত্ব কতটা, ইত্যাদি। ইকমো মানে হল এক্সট্রাকর্পোরিয়াল মেমব্রেন অক্সিজিনেশন। সহজ করে বলতে হলে, ইকমো হল এমন একটা মেশিন যা কৃত্রিম ফুসফুসের মতো কাজ করে। এই ফুসফুস শরীরের বাইরে থেকে রোগীকে বিশুদ্ধ অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সরবরাহ করে। সেটা কীভাবে? যখন ফুসফুস দুর্বল হয়ে পড়ে, শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে কষ্ট হয় তখন এই ইকমো পদ্ধতির প্রয়োগ করা হয়। রোগীর শরীরে থেকে রক্ত চ্যানেলের মাধ্যমে এই ইকমো মেশিনে ঢোকে। সেখানে রক্তকে বিশুদ্ধ করে অক্সিজেন সমৃদ্ধ করা হয় এবং কার্বন-ডাই অক্সাইড ছেঁকে বের করে দেওয়া হয়। এবার এই অক্সিজেন যুক্ত রক্ত আবার চ্যানেলের মাধ্যমে শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এর সুবিধা হচ্ছে, রোগীর হার্ট ও ফুসফুসের ওপরে বাড়তি চাপ পড়ে না।
হার্ট ফাংশন দুর্বল রয়েছে যে রোগীর বা হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন করতে হবে এমন রোগীকে অস্ত্রোপচারের আগে ইকমো পদ্ধতিতে রাখা হয়। হার্ট যখন পাম্প করে রক্ত সঞ্চালন করতে পারে না, তখন ইকমো মেশিন সেই কাজটা করে দেয়। রক্তের দূষিত কার্বন-ডাই অক্সাইড বের করে অক্সিজেন যুক্ত করে আবার শরীরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তই একে হার্ট অ্যান্ড লাং মেশিনও বলা হয়।
দ্য ওয়াল: কোভিড ছাড়াও ইকমোর গুরুত্ব কতটা?
ডক্টর: কোভিড সংক্রমণের ক্ষেত্রে শুধু নয়, ফুসফুসের যে কোনও জটিল রোগেও ইকমো পদ্ধতির প্রয়োগ করা হয়। হার্ট ফেলিওরের রোগী বা যাঁদের অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি হয়েছে বা বাইপাস সার্জারি, তাঁদের ক্ষেত্রে ইকমো পদ্ধতিতে ব্লাড পাম্প করা অনেক সুবিধাজনক। ইস্কিমিক হার্ট ডিজিজ আছে যাঁদের, হার্টের পাম্পিং করার ক্ষমতা কমে গেছে তাঁদের ক্ষেত্রেও ইকমো পদ্ধতির প্রয়োগে ভাল ফল পাওয়া যায়। ইকমো মেশিনের প্রয়োগে শরীরের কোষে সঠিকমাত্রায় অক্সিজেন পৌঁছয়। হৃদপিণ্ড বা ফুসফুস প্রতিস্থাপন করা হবে যে রোগীদের, তাঁদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অনেক নিরাপদ ও কার্যকরী। অনেক রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় এই পদ্ধতিতে। আগামী দিনেও হবে বলে আমি মনে করি।
দ্য ওয়াল: কোভিডের সময়ে হার্ট ভাল রাখার জন্য আমাদের কী করণীয়?
ডক্টর: কোভিড পরবর্তী পর্যায়ে হার্ট ভাল রাখতে হলে লাইফস্টাইলে নজর দিতে হবে অতি অবশ্যই। লকডাউনের এই এতগুলো মাস ঘরেই থেকেই। ওয়ার্ক ফ্রম হোম করেছেন অনেকে। বাড়িতে বসে খাওয়াদাওয়া প্রচুর হয়েছে, শরীরচর্চা তুলনায় কম হয়েছে। যার ফলে স্থূলত্ব বা ওবেসিটির শিকার হয়েছেন অনেকে। এই ওবেসিটি হল হার্টের রোগের অন্যতম বড় রিস্ক ফ্যাক্টর। তাই আমি বলব, পুষ্টিকর খাবারে বেশি গুরুত্ব দিন। শরীরচর্চা খুবই জরুরি। দিনে কম করেও ১৫-৪০ মিনিট এক্সারসাইজের প্রয়োজন। আমি আরও একটা কথা বলি, কম করে খান। মানে আপনার যতটা খিদে তার অর্ধেকটা রেখেই খাবার খান। তুলনায় কাজ বেশি করুন। তাহলেই শরীর সক্রিয় থাকবে। আর শরীর সক্রিয় থাকা মানেই হার্ট তরতাজা থাকবে। কোভিড পরবর্তী পর্যায়ে শরীর সুস্থ রাখা এবং হার্টকে চনমনে রাখাই বেশি জরুরি।