অনেক সময় সচেতনতার অভাবে অনেক রোগ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই লক্ষণ দেখে রোগের উপস্থিতি জানা গেলে তবেই চিকিৎসা করে দ্রুত সারিয়ে ফেলা যায়।
কিডনি আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। কিডনি বিকল হলে মৃত্যুও হতে পারে। তাই কিডনি নিয়ে একটু সচেতনতা দরকার। মানবদেহে কোমরের দু'পাশে দুটি কিডনি থাকে। নানা কারণে আমাদের কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিকলও হতে পারে। ১৪ই মার্চই গেল বিশ্ব কিডনি দিবস। কিডনি নিয়েই কথা বললাম নেফ্রোলজিস্ট ডঃ অভিজিৎ তরফদারের সঙ্গে।
দ্য ওয়াল: কিডনির রোগের লক্ষণগুলো কী কী?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: কিডনির রোগ অনেক রকম হতে পারে। খারাপ হতে পারে কিডনি, যাকে আমরা বলি silent killer। কারণ এর কোনও রোগ লক্ষণ থাকে না। কিডনি কাজ করে না, তবে অল্প যে কটা লক্ষণ আছে, সেগুলো—খিদে কমে যাওয়া, দুর্বলতা, অবসাদ, রক্তাল্পতা, চোখ মুখ ফোলা দেখানো ইত্যাদি। তবে যাঁদের ব্যথা হয় কোথাও তাঁদের চিকিৎসা করাটা সহজ হয়।
কারও যদি অনিয়ন্ত্রিত ব্লাড প্রেশার, অনিয়ন্ত্রিত ব্লাড সুগার থাকে, বা কেউ মুঠো মুঠো ব্যথার ওষুধ খান, তাহলে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হবেই।
কারও ইউরিন ইনফেকশন হতে পারে বারবার, তার আলাদা ব্যথা যণ্ত্রণা থাকে। বাচ্চাদের চোখ মুখ ফুলে যেতে পারে নেফ্রাইটিস জাতীয় অসুখ হলে।
দ্য ওয়াল: কিডনির পরীক্ষা কাদের করানো দরকার?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: কিডনি খারাপ হওয়ার বিষয় থাকলে--বংশগত ভাবে কিডনির কোনও সমস্যা থাকলে, পলিসিস্টিক কিডনি ডিসিজ় থাকলে, কেউ দীর্ঘদিন মুঠোমুঠো ব্যথার ওষুধ খেলে তাঁর অবশ্যই কিডনির পরীক্ষা করা উচিত।
এছাড়া কিডনির সমস্যায় বাচ্চা বা বয়স্ক যেই হোক, সবসময়ে খুব সামান্য কিছু রক্তপরীক্ষা এবং ইউরিন টেস্ট করলেই বোঝা যাবে সমস্যাটা আসলে কোথায়। ইউরিনে প্রোটিন আছে কি না, ইউরিনে রক্ত যাচ্ছে কি না এই পরীক্ষাগুলো আগে করতে হবে। তারপর অ্যাডভান্স স্টেজে ক্রিয়েটিনিন আছে কি না ইউরিনে সেই পরীক্ষা করতে হয়। ইউরিন রুটিন টেস্ট সব হাসপাতালেই করা যায়। সেটা সহজেই করে ফেলতে পারেন যে কেউ।
দ্য ওয়াল: কী ভাবে হয় পরীক্ষাগুলো?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: সরকারি হাসপাতলে বিনা খরচে হয়। আর ইউরিন আর ই (ইউরিন রুটিন এগজামিনেশন) করতে ১০ থেকে ১৫ টাকা লাগে। বেসরকারি হলে হয় তো খরচ একটু বেশি হয়।
দ্য ওয়াল: কাদের এই সমস্যা হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: কারও অনিয়ন্ত্রিত ব্লাড প্রেশার, অনিয়ন্ত্রিত ব্লাড সুগার থাকে যদি, বা কেউ মুঠো মুঠো ব্যথার ওষুধ খান যদি, তাহলে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হবেই। নেফ্রাইটিস জাতীয় অসুখ থাকলে, পলিসিস্টিক কিডনি ডিসিজ় থাকলে কারও তাঁদের এই সমস্যার সম্ভাবনা বেশি হওয়ার কথা। এছাড়াও ৪০ বছর পেরোলে যে ভাবে হার্ট, চোখের যত্ন নিতে হয় বেশি সচেতনতার সঙ্গে, সে ভাবেই কিডনির বিষয়েও সকলকে নজর দিতে হবে।
দ্য ওয়াল: কিডনির বায়োপসি করার দরকার হয় কখন?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: নেফ্রাইটিস জাতীয় অসুখ অর্থাৎ কিডনির প্রদাহ হলে বায়োপসি করতে হয়। কিডনির সংক্রমণ হলে এই প্রদাহ হয়। কিডনির বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কাজ করতে শুরু করে। এক্ষেত্রে অনেক সময়ে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ বা ইমিউনো সাপ্রেসিভ দিতেও হয় রোগীকে। রেনাল ফেইলিওর হলেও কিডনির বায়োপসি হয়। আবার কিছু সিস্টেমিক ডিসিজ় যেমন এসএলই বা সিস্টেমিক লিউপাস, ভ্যাসকুলাইটিস, বিভিন্ন অঙ্গকে একসাথে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তখন অবশ্যই কিডনির বায়োপসি করতে হয়।
দ্য ওয়াল: এতে লাভ হয় কতটা?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: ইন্ডিকেটেড বায়োপসি হলে শতকরা ৫০ ভাগ ক্ষেত্রেই সফল হয়। জটিলতা তো থাকেই, কিডনির পাশেই হেমাটোমা তৈরি হতে পারে আবার ইউরিনে রক্ত আসতে পারে। সবদিক দেখেই এই বায়োপসি হয়। ৫০০ জনের মধ্যে একজনের হয়তো কাজ করল না ঠিক করে, কিন্তু ২৫০ জনের ক্ষেত্রে এল সাফল্য। কাজেই এটাকে সাফল্যই বলা যায়।
দ্য ওয়াল: কী ভাবে এই বায়োপসি করা হয়?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন দিয়ে দেখে নিয়ে করা হয় এই বায়োপসি। টিউমার বায়োপসি হয় না এটা। রেডিওলজিস্টরা করে প্যাথলোজিস্টের কাছে পাঠিয়ে দেন। সেখানে বায়োপসির সময়ে নেফ্রলোজিস্ট নাও থাকতে পারেন। তবে কিডনির টিউমার হলে বা যেটা ক্যানসারের দিকে যাচ্ছে তার বায়োপসি অন্যভাবে হয়। সমস্ত সাবধানতা নিয়েই রেনাল বায়োপসি করা হয়। তারপর হয় চিকিৎসা।
দ্য ওয়াল: কিডনির রোগকে ক’ভাগে ভাগ করা যায়?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: কিডনির গঠনের জন্য রক্তবাহী শিরা , ধমনী, গ্লোমেরুলাস, টিউবিউলস, ইন্টারস্টেশিয়াম, পেলভিস অফ ইউরেটরে অর্থাৎ কিডনির দরজার কাছে সমস্যা হতে পারে। এছাড়া বাইরের যে কারণ মানে সেটা সংক্রমণ হতে পারে, স্টোন থেকে হতে পারে, জন্মগত অসুখ হতে পারে, অন্যান্য অঙ্গের জন্য সমস্যা হতে পারে। তাই সেভাবে ভাগ বলা যায় না। এইসব কারণেই অনেক রকম সমস্যা হতে পারে কিডনিতে। স্ট্রাকচার বা গঠন অনুযায়ী হতে পারে, সাবস্ট্যান্স বা কারণ অনুযায়ী হতে পারে।
দ্য ওয়াল: নেফ্রোলজি এবং ইউরোলজির মধ্যে পার্থক্য কী?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: যে গুলো ওষুধে সারে, তা নেফ্রোলজি। যা অপারেশন করতে হয় তা ইউরোলজির আওতায় পড়ে। নেফ্রাইটিস, ডায়াবেটিস থেকে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে, ডায়ালিসিস, রেনাল ফেলিওর হলে নেফ্রলোজিস্ট দেখবেন। আর যদি কিডনির টিউমার, স্টোন, প্রস্টেটের অসুখ হয় তাহলে ইউরোলজিস্ট দেখবেন।
দ্য ওয়াল: কিডনির সব রোগই কি খুব ভয়ঙ্কর হয়?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: ঠিক সময়ে ধরা পড়লে কোনও কিছুই ভয়ঙ্কর নয়। ধরা পড়তে দেরি হয় তো তাই সমস্যা বাড়ে। নিয়মিত চেক আপ করা জরুরি তাই।
দ্য ওয়াল: কিডনি ফেইলিওর মানে কী দুটো কিডনিই সমস্যায়, না একটা?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: মোটামুটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুটো একসাথেই খারাপ হয়।
দ্য ওয়াল: ওষুধ কতদিন খেয়ে যেতে হয়?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: নির্ভর করছে কী জাতীয় অসুখ তার উপরে। ইনফেকশন হলে, তা সেরে গেলে ওষুধ বন্ধ করে দিতে হবে। কিডনি সংস্থাপন করলে সারাজীবন ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। বাচ্চাদের নেফ্রাইটিস হলে তার একরকম চিকিৎসা হয়। স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ তিন মাস বা ছ মাস চলতে পারে।
দ্য ওয়াল: ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা ঠিক থাকলে কি কেউ ওষুধ বন্ধ করে দিতে পারে?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: রোগ থাকলে ওষুধ চলবেই। নইলে চলবে না। ক্রিয়েটিনিনের মাত্রাটা কোনও বিষয় নয়।
দ্য ওয়াল: একবার ডায়ালিসিস করালে সারাজীবন করাতে হতে পারে ?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: অ্যাকিউট কিডনি ইনজ্যুরি অৰ্থাৎ অ্যাকিউট ডায়েরিয়া, সাপের কামড় বা মুঠোমুঠো ব্যথার ওষুধ থেকে হলে তাতে ১-২ বা ৪-৫ টা ডায়ালিসিসে সেরে যায়। কিন্তু ক্রনিক কিডনি ইনজ্যুরি হলে একেবারেই সারে না কিডনির সমস্যা। তখন সেটা সারা জীবন ধরে চলবে।
দ্য ওয়াল: হাই ব্লাড প্রেশার এবং ডায়াবেটিস থাকলে কিডনি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: দুটোতেই হয়। আগে বলা হত ডায়াবেটিসে ৩৩ শতাংশ ক্ষতি হয়, এখন সেটা ৫০ শতাংশ বলা হয়। প্রেশারেও তাই। তবে নিয়ণ্ত্রণ করা থাকলে মুশকিল কম হয়।
দ্য ওয়াল: জল বেশি খেলে কিডনি পুরো সুস্থ থাকে, এটা কতটা ঠিক?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: এটা একেবারেই মিথ। পরিমিত না হলে সমস্যা হয় যে কোনও কিছুতেই। অনেক সময়ে ওয়াটার টক্সিসিটি হতে পারে জল বেশি খেলে। রক্তে জলের মাত্রা বেড়ে গেলে সোডিয়ামের মাত্রা কমে যেতে পারে। সেটা ঠিক নয়। ডাক্তাররাই বলে দেন কী করা উচিত। কতটা জল খাওয়া উচিত। কিডনির অসুখ অনেকটা এগিয়ে গেলে জল এজন্যই নির্দিষ্ট মাত্রায় খেতে বলা হয় কারণ সেসময় কিডনি ঠিক করে কাজ করতে পারে না। কখনও হৃদপিণ্ড, কখনও ফুসফুসে কখনও পেটে জল জমতে থাকে। তাই জল কম খাওয়া বা ব্যালেন্স করে খেতেই হবে।
শুনুন ডাক্তারবাবু কী বলছেন কিডনি নিয়ে---
https://www.youtube.com/watch?v=BgE-148DvDU&feature=youtu.be
দ্য ওয়াল: পরিমিত জল যখন খেতে বলা হয় তখন সেটা কতটা কঠোর ভাবে মেনে চলতে হয়?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: এই রেস্ট্রিকশনের বিষয়টা খুবই সাবজেকটিভ। রোগীভেদে এক একরকম হয়।
দ্য ওয়াল: শিশুদের এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে আলাদা উপসর্গ থাকে কী?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: শিশুদের ক্ষেত্রে স্টেরয়েড বড়দের চেয়ে বেশি ভালো কাজ করে। নেফ্রাইটিস জাতীয় রোগে শিশুরা বেশি ভালো সাড়া দেয়। যেটা বড়দের শরীর দেয় না।
দ্য ওয়াল: জন্মগত কিডনির সমস্যা থাকতে পারে? হলে সেটা কী? সারানো সম্ভব কী?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: জন্মগত মানে জিনঘটিত অসুখ থাকতেই পারে। সেটা সারানো সম্ভব হয় না।
দ্য ওয়াল: কিডনি প্রতিস্থাপন করাটা কখন জরুরি? কী কী বিষয় এক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হয়?
ডঃ অভিজিৎ তরফদার: কিডনি সবসময়ে সংস্থাপন করা হয়, প্রতিস্থাপন করা হয় না। যাদের কিডনি কাজ করে না, সেগুলো সেখানে রেখেই আলাদা কিডনি শরীরে পেটের নীচের দিকে বসানো হয়। অর্থাৎ সে সময় সেই মানুষের শরীরে ৩টে বা ৪ টে কিডনি থাকছে। একবার ট্রান্সপ্লান্টেশনে ৩টে এবং দুবার ট্রান্সপ্লান্টেশনে ৪টে কিডনি থাকে শরীরে। এটা অনেকেরই জানা থাকে না।
ক্যানসার, সুগার, প্রেশারের সমস্যা থাকলে সবসময়েই বিভিন্ন দিক বিচার করে কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হয়। নইলে শরীর নিতে পারে না।
অতএব জল খান ডাক্তারের কথা মতো। আর চল্লিশ পেরোলেই নিয়মিত ডাক্তারের কাছে যান, নিজেকে সুস্থ রাখুন।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়