দ্য ওয়াল ব্যুরো: না, ডিপ্রেশনের বাংলা মানে মনখারাপ নয়। এটা অনেকেই একন জেনে গেছেন সচেতনতার কল্যাণে। তবে ডিপ্রেশন বা অবসাদ নিয়ে যতটা জানা, তার চেয়েও বেশি অনেক কিছুই বোধহয় এখনও সাধারণ মানুষের অজানা। এমনই একটি বিষয় হল, ছোটদের ডিপ্রেশন।
ছোট বাচ্চাদের অবসাদে ভোগা নিয়ে বেশিরভাগ মানুষই হয়তো অবগত নন। তাই বাচ্চাদের ডিপ্রেশনকে মনখারাপ বলে পাশ কাটিয়ে যান তাদের মা-বাবারাই। কিন্তু 'মন খারাপের' আয়ু দু'সপ্তাহ বা তার বেশি হলেই, সেটা যে ডিপ্রেশনের লক্ষণ, এটা বহু মানুষেরই অজানা। বাচ্চাদের শরীর সুস্থ রাখার প্রতি যেমন বিশেষ নজর দেওয়া হয়, তেমনই তাদের মন কেমন আছে, প্রতিনিয়ত সে খবরও নেওয়া উচিত বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডিপ্রেশন কী
ডিপ্রেশন বা অবসাদ হল মনের এক অসুখ। যা এক মুহূর্তের জন্যেও অবহেলা করা উচিত নয়। যে কোনও বয়সের মানুষের, যে কোনও সময় ধরা পড়তে পারে ডিপ্রেশন। এর জন্যে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরাই মনের গভীর হাতড়ে বার করে আনতে পারেন এর কারণ ও সমাধানকে।
এমনিতে ছোট-বড় নানা ঘটনায় মানুষের মনখারাপ তো হয়ই। কিন্তু মনখারাপের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাপনে হঠাৎ বদল এলে, অসংগতিপূর্ণ আচরণ করলে, পছন্দের জিনিসে আগ্রহ হারালে, সেগুলোই ডিপ্রেশনের প্রথম লক্ষণ বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডিপ্রেশন কি শিশুদের উপর প্রভাব ফেলে
ছোট থেকে হঠাৎ হঠাৎই যেসব শিশুদের মন খারাপ হয়ে যায়, তাদের যত বয়স বাড়ে ততই যেন খিটখিটে মেজাজ বা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হতে দেখা যায়। ডিপ্রেশন কিন্তু একেবারেই আলাদা এর থেকে। বড়দের মতোই ডিপ্রেশনও মারাত্মক প্রভাব ফেলে শিশুদের মনে। কখনও কখনও আত্মহত্যা করার প্রবণতাও দেখা যায় অনেক কম বয়সে। নিজের পছন্দের জিনিসে আগ্রহ চলে যায়। বাবা-মা, বন্ধুবান্ধবদের থেকে দূরে সরে থাকতে পারে সবসময়। ডিপ্রেশন হলে নিজের উপর আস্থা, বিশ্বাস,সবটা ছোট থেকেই হারিয়ে ফেলে বাচ্চারা। এর ফল হয় মারাত্মক।

সমীক্ষা কী বলছে
বর্তমানে সারা বিশ্বে বহু মানুষ ডিপ্রেশনে ভোগেন। নামকরা তারকারাও এই বিষয়ে সরব হয়েছেন বারবার। এখন চিন্তার বিষয়, শিশুরাও ভোগে বড়দের মতোই। সমীক্ষায় জানা যাচ্ছে ৩ থেকে ১৭ বছরের ৭ শতাংশ শিশু উদ্বেগ বা অকারণে দুশ্চিন্তায় ভোগে। আর ৩ শতাংশ ডিপ্রেশনে ভোগে। যুক্তরাষ্ট্রে বয়সে একটু বড়, যেমন ১২ থেকে ১৭ বছরের ৩.২ মিলিয়ন শিশু ডিপ্রেশনে ভুগছে বলে জানাচ্ছে সমীক্ষা।
কী কী কারণে শিশুদের ডিপ্রেশন হয়
ডিপ্রেশন, অকারণে দুশ্চিন্তা করার প্রবণতা বিভিন্ন কারণে হয়। যেমন -
- ১. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই মদ্যপান, ড্রাগে আসক্তি এলে।
- ২. পরিবেশের কারণে।
- ৩. চোখের সামনে বাবা-মায়ের আচরণগত ত্রুটি দেখতে দেখতেও মনের উপর চাপ পড়লে।
- ৪. পারিবারিকভাবে ডিপ্রেশন থাকলে।
- ৫. শারীরিক অসুস্থতার কারণে।
- ৬. কাছের প্রিয়জনকে হারালে।

শিশুদের ডিপ্রেশন বোঝা যায় কীভাবে
একটি শিশুর পক্ষে আর একটি শিশুর ডিপ্রেশন বোঝা সহজ নয়। সেক্ষেত্রে বড়দের, বাবা-মায়েদেরই বিশেষ নজর রাখতে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। যে যে উপসর্গগুলো দেখা দিলে বুঝবেন ডিপ্রেশন হয়েছে -
- ১. স্কুলে আচরণগত ত্রুটি ধরা পড়লে।
- ২. ঘুমোনোর, খাওয়ার অভ্যাস হঠাৎ বদলে গেলে।
- ৩. সবসময় মনখারাপ থাকলে।
- ৪. খেলাধুলো, নিজের পছন্দের জিনিসে আগ্রহ হারালে।
- ৫. পরিশ্রম না করেও শরীরে ক্লান্তিভাব থাকলে।
- ৬. মেজাজ হঠাৎ হঠাৎ বদলে গেলে, বা সর্বক্ষণ খিটখিটে হয়ে থাকলে।
বাচ্চা উদ্বিগ্ন কিনা কীভাবে বুঝবেন
ডিপ্রেশনের মতোই উদ্বেগও শিশুদের মনের উপর ভীষণ প্রভাব ফেলে। কীভাবে বুঝবেন তারা দুশ্চিন্তা করছে -
- ১. ভবিষ্যত নিয়ে সর্বক্ষণ চিন্তা করলে।
- ২. বাবা-মা দূরে গেলেই ভয় পেলে।
- ৩. অতিরিক্ত প্যানিক করে দরদর করে ঘাম হলে।
- ৪. স্কুলে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলে।
- ৫. স্বাভাবিক পড়াশোনা বা খেলাধুলো থেকে দূরে সরে থাকলে।
- ৬. বাবা-মা, প্রিয়জনের কোনও ক্ষতি হয়ে গেল কিনা এবিষয়ে সর্বক্ষণ চিন্তাভাবনা করলে।
বাচ্চা আত্মহত্যার কথা ভাবছে না তো!
সমীক্ষা জানাচ্ছে, ২০১৯ সালে ৯ শতাংশ হাইস্কুল ছাত্র-ছাত্রী আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছেন। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সেই সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। সচরাচর শোনা না গেলেও, শিশুদের মধ্যেও আত্মহত্যা করার প্রবণতা কাজ করে।
- ১. সবসময় মৃত্যু বা, মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা নিয়ে আলোচনা করলে।
- ২. ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখালে।
- ৩. নিজেকে আঘাত দেওয়া, বা নিজের জন্য ক্ষতিকর কাজ বারবার করা।
- ৪. প্রিয়জনদের থেকে একেবারে দূরে সরে থাকা।
- ৫. সারাক্ষণ আত্মহত্যা নিয়ে কথা বললে, বা সেই বিষয়ে আলোচনা করলে।
বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ
বাচ্চার মধ্যে কোনও রকম উপসর্গ দেখা দিলেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করা আবশ্যিক। শারীরিক কিছু অসুস্থতার কারণেও ডিপ্রেশন হতে পারে বলে তাঁদের ধারণা। সেক্ষেত্রে প্রথমেই তাঁরা অসুস্থতার কারণ খুঁটিয়ে দেখবেন। যেমন -
- ১. ডায়াবেটিস,
- ২. অ্যানিমিয়া,
- ৩. এপিলেপ্সি,
- ৪. থায়রয়েডের সমস্যা,
- ৫. ভিটামিন ডির অভাব,
- ৬. মনোনিউক্লিওসিস,
এই ধরনের কোনও সমস্যা থাকলে, তার থেকেও শিশুদের ডিপ্রেশন হতে পারে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

কীভাবে চিকিৎসা করাবেন
সাধারণত কাউন্সেলিং এবং কগনিটিভ বিহেভিয়োরাল থেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা শুরু করা হয়। চিকিৎসার মাধ্যমে সবার আগে যে কোনও কিছুতেই শিশুদের ইতিবাচক মনোভাব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে আস্তে আস্তে ডিপ্রেশন থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্তি পেতে পারে তারা।
আবার কখনও কখনও ওষুধের সাহায্যও নিতে হতে পারে। সাধারণত সিলেকটিভ সেরোটোনিন রিয়ুপটেক ইনহিবিটরসের সাহায্যে শিশুদের চিকিৎসা করা হয়। যা শিশুদের মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। যা হাসিখুশি থাকতে সাহায্য করে।

তবে এক্ষেত্রে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। এই ধরনের চিকিৎসা অনেক সময় শিশুদের উপর কাজ করে না। সেক্ষেত্রে আবারও শিশুদের আচরণের উপর নজর রাখতে হবে। তবে হঠাৎ করেই যেন ওষুধ খাওয়া বন্ধ না করে দেয়। করলে ডিপ্রেশন আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যেটাই করার, সেটা ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েই করা ভাল।
বাড়িতে সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখুন
অনেক সময় দেখা যায়, চিকিৎসার পরে, আবারও ডিপ্রেশন দেখা দিচ্ছে। সেই কারণেই বাড়ির পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। যে বিষয়গুলোতে বিশেষ খেয়াল রাখবেন:
- ১. প্রতিদিন যেন এক্সারসাইজ বা বডি মুভমেন্ট করে।
- ২. সময়মতো ঘুমোনো।
- ৩. স্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়া।
- ৪. শিশুদের সামনে সংযত থাকা।
- ৫. তাদের পাশে আছেন, সেটা সবসময় কথায়, আচরণে বুঝিয়ে দেওয়া।
