
শেষ আপডেট: 24 June 2023 15:13
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘এই একলা ঘর আমার দেশ, আমার একলা থাকার অভ্যেস’...
করোনা মহামারীর এই দু'বছরে মানসিক স্বাস্থ্যের (Mental Health) একদম দফারফা হয়ে গেছে। খালি মনে হয় মন ভাল নেই। সেই সঙ্গেই একরাশ স্ট্রেস, অবসাদ। ঘন ঘন মুড বদল। সেই সঙ্গেই গ্রাস করছে একাকীত্ব (Loneliness)। একদিকে কেরিয়ার, অন্যদিকে সংসার–এই দুইয়ের জাঁতাকলে মানুষ নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে কোথাও। হৈ হুল্লোড়ের মাঝে থেকেও নিজেকে একা মনে হচ্ছে। মেলামেশার ইচ্ছে চলে যাচ্ছে। মনের উপর ছায়া ফেলছে অবসাদ। গবেষকরা বলছেন, এই একাকীত্ব বোধই মানুষের আয়ু কমিয়ে দিতে পারে। মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে শরীরে।
মনোবিদরা বলছেন, একা থাকা আর একাকীত্ব কিন্তু এক নয়। অনেকেই একা থাকেন কিন্তু জীবনকেও উপভোগ করেন। আর একাকীত্ব হল একটা বোধ, যা মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে। গভীর অবসাদ, মানসিক চাপ, হঠাৎ করে পাওয়া কোনও মানসিক আঘাত, ট্রমা, অতীতের কোনও ঘটনা বা দুর্ঘটনার কারণে মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভয় বা আতঙ্ক–এই সবই একাকীত্ব বোধের কারণ হতে পারে। দীর্ঘদিন কোনও রোগে ভুগলেও তার থেকে একাকীত্বের ভাবনা আসতে পারে। একাকীত্ব বোধ যদি মনকে আচ্ছন্ন করে তাহলে মানসিক যন্ত্রণা বেশি হয়। নিজের তৈরি করা মানসিক জগতে হারিয়ে গিয়ে নানারকম মনের অসুখের শিকার হতে হয়। আর তার প্রভাব পড়ে শরীরেও।

লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজের গবেষকরা বলছেন, একাকীত্ব ১৫ বছর আয়ু কমিয়ে দিতে পারে। ‘ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স’ জার্নালে এই গবেষণার ব্যাপারে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে।
একাকীত্বের (Loneliness) কী কী প্রভাব পড়তে পারে শরীরে
সায়েন্টিফিক আমেরিকানের রিপোর্ট বলছে, ডিপ্রেশন থাবা গেড়ে বসলে তার থেকে একাকীত্ব বোধ জন্ম দেয়। আর একাকিত্বের ভাবনা একবার মনে বসে গেলে তার থেকে ক্রমাগত মন খারাপ, মুড সুয়িং ইত্যাদি ব্যাপারগুলো অনেক বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে কমতে আরম্ভ করে শারীরিক শ্রমের পরিমাণও। ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার ফল খারাপ হতে আরম্ভ করে, অযথা ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত হয় তারা, নেশার খপ্পরেও পড়ে কেউ কেউ। বেড়ে যায় রাগ, মাথাব্যথা, গা-হাত পায়ে অসহ্য যন্ত্রণা। ইনসমনিয়া, শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যাও থাকে কারও কারও ক্ষেত্রে।

গবেষণা বলছে, ২০২০ সাল অর্থাৎ করোনাকালের পর থেকে মানসিক উদ্বেগ, রাগ, অবসাদের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে, যা গত ১০ বছরের তুলনায় দ্বিগুণ (সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে, বাড়ি থেকে কাজ, বেকারত্ব, সম্পর্কের অবনতি, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, গার্হস্থ্য হিংসা–সব মিলিয়ে অবসাদ ও একাকীত্ব বেড়েছে। একই সঙ্গে মানসিক উদ্বেগও বেড়েছে নানা কারণে। এমনও দেখা গেছে, ইদানীংকালে সবচেয়ে বেশি অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারে ভুগছেন মানুষজন। এর থেকে হার্টের রোগ, কিডনির সমস্যা এমনকী ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিনাশ, অ্যালঝাইমার্সের মতো মানসিক অসুখও মাথাচাড়া দিচ্ছে।
সমাজত্ত্ববিদদের অনেকেরই মত, একাকীত্ব থেকে বিরক্তিভাব, অসহিষ্ণুতা বাড়ছে। আমরা যে গতিতে ছুটছি আজকাল, জীবনে যা যা অর্জন করতে চাইছি, তার মূলেই লুকিয়ে রয়েছে মনোরোগের বীজ। দীর্ঘদিন একাকীত্বে ভুগলে শরীর, মন দুইয়ের উপরেই প্রভাব পড়বে। এমনকি শরীরে এমন কিছু প্রভাব পড়ে যা কিন্তু সহজে ঠিক হয় না। যেমন স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই কমে যায়। হৃদরোগের সমস্যাও বাড়ে। রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। মনের উপর চাপ এতটাই বাড়ে যে মানুষ খুব দ্রুত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। তাই নিজেকে ভালবেসেই এই একাকীত্ব বোধ কাটানোর চেষ্টা করুন।