হরমুজ প্রণালী নিয়ে আমেরিকা আগ্রাসী ভূমিকা নিলে ইজরায়েল ও আরবের মিত্র দেশগুলি বাদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কাউকে পাশে পাবেনা এমন সম্ভাবনাও প্রবল। ইতিমধ্যেই ইউরোপীয় সামরিক জোট ন্যাটো মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জানিয়ে দিয়েছে তারা এই যুদ্ধে নেই।

শেষ আপডেট: 31 March 2026 10:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যুদ্ধ সংঘাতকে (West Asia Conflict) কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট (Fuel Crisis) নতুন নয়। গত শতকের নয়ের দশকে উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং তার আগে দীর্ঘ কয়েক দশক যাবত ইরাক ও ইরানের মধ্যে লড়াইয়ের খেসারত দিতে হয়েছে বিশ্বের বহু দেশকে। তারও আগে দ্বিতীয় তেল ধাক্কা আসে ১৯৭৯ সালে, ইরানের বিপ্লবের সময়।
সেই ইরানকে ঘিরে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সংঘাত (US ISrael Strikes in Iran) এবং তাতে আরব দুনিয়ার (Middle East Tension) বহু দেশের জড়িয়ে পড়ার জেরে চলমান তেল সংকট (Oil Crisis) কতদিন চলবে তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে বিশ্বজুড়ে। অনেকেই মনে করছেন চলতি সংকট স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়কর পরিস্থিতিকেও ছাপিয়ে যেতে পারে যা দেখা দিয়েছিল আজ থেকে ৫৬ বছর আগে ১৯৭০ সালে।

১৯৭০। যখন গোটা বিশ্বে জ্বালানিতে রেশনিং চালু হয়েছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (US) নামজাদা জ্বালানি সরবরাহকারী সংস্থা মার্স্কের সাবেক পরিচালক এবং শিপিং বিশেষজ্ঞ লার্স জেনসেন বিবিসিতে প্রকাশিত নিবন্ধে লিখেছেন, 'ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল যুদ্ধের প্রভাব ১৯৭০-এর দশকের অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার তুলনায় অনেক বেশি বড় হতে পারে।'
একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন আর এক আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ বিশেষজ্ঞ ফাতিহ বিরোল। তিনি বলেছেন যে বিশ্ব 'ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এখন হুমকির মুখোমুখি'।
তাঁর কথায়, এটি ১৯৭০-এর দশকের তেলের দামের ধাক্কার চেয়েও অনেক বড়। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর আমরা যে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামের ধাক্কা দেখেছি, তার চেয়েও এটি বিপজ্জনক।

যদিও কোন কোন বিশেষজ্ঞ এমন কথাও বলছেন হরমুজ প্রণালী (Hormuz Pronali) বন্ধ হয়ে যাওয়া বৈশ্বিক সরবরাহে বিঘ্ন ঘটালেও আজকের বিশ্বে অনেক বিকল্প আছে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) যেভাবে ইরান নিয়ে সুর অদল বদল করছেন তাতে অনেকেই মনে করছেন হরমুজ প্রণালী নিয়ে তিনি বেশ বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে আছেন। সেই কারণেই তিনি ইরানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আঘাত হানতে দ্বিধান্বিত বলে মনে করা হচ্ছে।
শুধু তাই নয় হরমুজ প্রণালী নিয়ে আমেরিকা আগ্রাসী ভূমিকা নিলে ইজরায়েল ও আরবের মিত্র দেশগুলি বাদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কাউকে পাশে পাবেনা এমন সম্ভাবনাও প্রবল। ইতিমধ্যেই ইউরোপীয় সামরিক জোট ন্যাটো মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জানিয়ে দিয়েছে তারা এই যুদ্ধে নেই। ন্যাটোর এই ভূমিকায় বেজায় ক্ষুব্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে পদে তাদের মূণ্ডপাত করছেন। ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছিলেন। সোমবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন ব্রিটেনের সেনা ইরানকে আক্রমণে আমেরিকার পাশে দাঁড়াবে না।
১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটে কী ঘটেছিল?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন তেল সংকট এবারের তুলনায় ভিন্ন ছিল। ক্রিস্টল এনার্জির প্রধান নির্বাহী আধিকারিক অর্থনীতিবিদ ক্যারল নাখলে বিবিসি-কে বলেছেন সেই সময় প্রথম ধাক্কাটি ছিল ইচ্ছাকৃত নীতিগত সিদ্ধান্তের ফল। '১৯৭৩-এর অক্টোবরে ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধের সময় ইজরায়েলকে সমর্থন দেওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কিছু দেশের ওপর আরব তেল উৎপাদকরা তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই নীতির পাশাপাশি সমন্বিতভাবে তেল উৎপাদনও কমানো হয়। এর ফলে কয়েক মাসের মধ্যেই তেলের দাম প্রায় চারগুণ বেড়ে যায়,' বলছেন নাখলে।
এর ফলে বড় বড় দেশগুলিতে জ্বালানি রেশনিং (Fuel rationing) চালু করতে হয়। নাখলের মতে, 'এটি একটি 'বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ও আর্থিক সংকট সৃষ্টি করে যার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ছিল।'
বেলফাস্টের কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. টিয়ারনান হিনি বলেন, তেলের উচ্চমূল্য সর্বত্র মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়, ফলে ব্যবসা আরও সংকুচিত হয়ে বেকারত্ব দ্রুত বৃদ্ধি করে।
তিনি আরও বলেন, 'এর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সমাজের কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে—অনেক দেশে ব্যাপক ধর্মঘট, অস্থিরতা এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়, কারণ বহু পরিবার জীবিকা নির্বাহে হিমশিম খেতে থাকে।'
প্রসঙ্গত বাংলাদেশে (Bangladesh) এই পরিস্থিতি এখনই অনেকটা দেখা দিয়েছে। সেখানে তেল নিয়ে অস্থিরতা জেড়ে খুন, ফুয়েল স্টেশনে ভাঙচুর হামলা, গাড়ি থেকে তেল চুরির মতো ঘটনা তো আছেই, পাশাপাশি বহু ছোট কলকারখানা জ্বালানির অভাবে বন্ধ করে দিয়েছে মালিকপক্ষ। ফলে কয়েক লাখ শ্রমিক এখন কর্মহীন। এছাড়া চাষের কাজে মোটর ব্যবহার করতে না পারায় ধান রোপণের কাজ প্রবল ভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সাশ্রয়ে জোর দিয়ে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যুৎ খরচ কমাতে উদ্যোগী হয়েছে। কারণ সে দেশে জ্বালানির প্রায় সাত শতাংশ বিদ্যুৎ এবং সার কারখানায় ব্যবহার হয়ে থাকে। জ্বালানি সাশ্রয় করতে বন্ধ রাখা হয়েছে সার কারখানাও।
ভারতেও ছোট ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েছেন। রান্নার গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্ন এবং বাড়তি দামের কারণে হোটেল রেস্তোরাঁয় খাবারের দাম চড়তে শুরু করেছে। বাড়ছে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কয়েক দফায় দেশবাসীকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, জ্বালানির কারণে ফের বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে। করোনা পরিস্থিতির মতো সেই সম্ভাব্য সংকট সকলে মিলে মোকাবিলা করতে হবে।
শুধু বাংলাদেশ নয় ভারতের প্রতিবেশী সব দেশেই জ্বালানির ওপর নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কাকে ভারত ইতিমধ্যে জ্বালানি দিয়ে সহায়তা করেছে।
৫৬ বছর আগের সেই জ্বালানি সংকটের জেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন—উভয় দেশেই ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত মন্দা চলেছিল এবং তা ১৯৭৪ সালে টেড হিথের কনজারভেটিভ সরকারের পতনের কারণ হয়। ফলের চলতি জ্বালানি সংকট নিয়ে সব দেশেই সরকার ও শাসক দল অনেক বেশি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে আছে
বর্তমান তেল সংকটে কী ঘটছে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল এক মাস আগে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে হরমুজ প্রণালী কার্যত জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে।
এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে তেল, গ্যাস এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, যেখান থেকে সাধারণত বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল রপ্তানি করা হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেলের প্রবাহ পুনরুদ্ধারের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন—মিত্র দেশগুলোকে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে নিরাপত্তা দেওয়ার আহ্বান জানানো এবং ইরানকে হুমকি দিয়েছেন যে, যদি জাহাজ চলাচল নিরাপদ না করা হয়, তবে আরও কঠোর আঘাত হানা হবে।
ভেসপুচি মেরিটাইম নামে একটি পরামর্শক সংস্থা পরিচালনাকারী জেনসেন বিবিসির টুডে অনুষ্ঠানে বলেন, এক মাসেরও বেশি আগে উপসাগর ছেড়ে যাওয়া অনেক তেল এখনও বিশ্বজুড়ে শোধনাগারে পৌঁছাচ্ছে, কিন্তু সেই প্রবাহ খুব শিগগিরই বন্ধ হয়ে যাবে।
তারা আরও বলেছে, 'আমরা যে তেলের ঘাটতি এখন দেখছি, তা আরও খারাপ হবে—এমনকি যদি কালই হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেওয়া হয় তাহলেও সংকট মিটবে না।'
ওই সংস্থার কথায়, 'আমরা বিপুল জ্বালানি ব্যয়ের মুখোমুখি হব—শুধু এই সংকট চলাকালীনই নয়, বরং এটি শেষ হওয়ার পরও ছয় থেকে বারো মাস পর্যন্ত এর রেশ থাকবে।
বর্তমান তেল সংকটে কী ঘটছে?
এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল, গ্যাস এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, যেখান থেকে সাধারণত বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ রপ্তানি করা হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উপসাগরীয় তেল সরবরাহ পুনরায় চালু করতে বিভিন্ন কৌশল নিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে মিত্র দেশগুলোকে জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানানো এবং ইরানকে আরও কঠোরভাবে আঘাত করার হুমকি দেওয়া, যদি তারা প্রণালীর মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ না করে।
বর্তমান সংকট কি ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের চেয়েও খারাপ হতে পারে?
অর্থনীতিবিদ নাখলে আরব এনার্জি ক্লাবের মহাসচিবও। তাঁর পরামর্শ, সবচেয়ে ভাল পরিস্থিতি হবে যত দ্রুত সম্ভব এই সংঘাতের অবসান ঘটানো এবং কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
ন্যাটিক্সিস সিআইবির এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ আলিসিয়া গার্সিয়া হেরেরোর মতে, '১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটে দাম আকাশচুম্বী হয়েছিল, তবে তখন বৈশ্বিক সরবরাহ মাত্র ৫-৭% কমেছিল। এর বিপরীতে, বর্তমান সংকট বিশ্ব সরবরাহের ২০% প্রভাবিত করছে, যা ১৯৭০-এর দশকের সংকটকেও ছাড়িয়ে গেছে।'
তিনি বলেন, 'যদি পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতি না হয়, তবে বর্তমান ইরান যুদ্ধজনিত সংকট আরও বড় ধাক্কায় পরিণত হতে পারে। এটি শুধু তেল নয়, গ্যাস ও অন্যান্য পরিশোধিত পণ্যের সরবরাহ সংকটও তৈরি করছে।
তিনি আরও বলেন, 'এর প্রভাবে আমরা তেলের দামের তীব্র বৃদ্ধি, বিস্তৃত মুদ্রাস্ফীতি এবং গভীর মন্দার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারি, বিশেষ করে আমদানি নির্ভর এশিয়ায়।