ব্রিটিশদের ১৯৪৭ সালের গোপন নথি থেকে শুরু করে ট্রাম্প-মুনির বৈঠক পর্যন্ত, বারবার প্রমাণ মিলেছে—পাকিস্তানের স্বৈরশাসকরাই যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক অংশীদার। কেন ভারত নয়, পাকিস্তানই পছন্দ? বিস্তারিত জানুন এই বিশ্লেষণে।

ট্রাম্প ও মুনির।
শেষ আপডেট: 19 June 2025 09:32
দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'ওরা স্বৈরশাসক, কিন্তু আমাদের স্বৈরশাসক।' ডোমিনিকান শাসক রাফায়েল ত্রুজিলো সম্পর্কে একবার এই মন্তব্য করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট। সে কথাই যেন আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে ২০২৫ সালে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যাহ্নভোজ সারলেন পাকিস্তানের ‘ফিল্ড মার্শাল’ আসিম মুনিরের সঙ্গে। এই বৈঠকে যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছে, আমেরিকার চোখে আজও পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের অবস্থান বেশ সুবিধাবাদী।
ইতিহাস বলছে, ১৯৪৭ সালের ৭ জুলাই, ব্রিটিশ চিফস অব স্টাফ কমিটির একটি গোপন নথিতে লেখা ছিল, 'পাকিস্তানের এলাকা উপমহাদেশে সবচেয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অধিকাংশ স্ট্র্যাটেজিক চাহিদা পাকিস্তান থেকেই মেটানো সম্ভব... ভারতের (হিন্দুস্তানের) সঙ্গে চুক্তি না হলেও আমাদের অবস্থান পাল্টাতে হবে না।'
এই বক্তব্যে স্পষ্ট, পাকিস্তানকে একটি সুবিধাজনক ভূ-রাজনৈতিক “প্রক্সি স্টেট” হিসেবেই তৈরি করেছিলেন ব্রিটিশরা, যা পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উত্তরাধিকার হয়ে ওঠে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সীমান্তে, আফগানিস্তান ও ইরান ঘেঁষা অবস্থানে থাকা পাকিস্তানকে ঘিরে ছিল তেলসমৃদ্ধ আরব বিশ্বের প্রবেশদ্বার।
১৯৪৮ সালে গিলগিট-বালটিস্তান দখলের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান গড়ে তোলে চিনের সঙ্গে সীমান্ত, যা তাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে পশ্চিমের জন্য।
সোভিয়েত আগ্রাসনের সময় জিয়াউল হক থেকে শুরু করে ৯/১১-র পর পারভেজ মোশারফ— পাকিস্তানের সামরিক শাসকরাই আমের্সকার বচেয়ে বড় মিত্রে পরিণত হন বারবার। তবে এর বিনিময়ে পাকিস্তান পায় কোটি কোটি ডলারের সাহায্য, IMF ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ঋণ, এবং FATF-এর ‘গ্রে লিস্ট’ থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ।
সেই আটের দশকে জিয়াউল হক যখন মার্কিন সহায়তায় সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন, তখনই পাকিস্তান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে। পরে সিআইএ-র দেওয়া অস্ত্র চলে যায় কাশ্মীর ও পাঞ্জাবে। মোশারফ পরবর্তী সময়ে এই অস্ত্রভাণ্ডার ও জঙ্গিদের একত্র করে তৈরি করেন ‘নিউক্লিয়ার ব্ল্যাকমেইল’—যার আওতায় ভারত সন্ত্রাসের শিকার হলেও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া প্রায় শূন্য।
'আর্মি, আল্লাহ ও আমেরিকা' এই তিন A দেশ চালায় বলে কথিত আছে পাকিস্তানকে নিয়ে। এটি একটি 'রেন্টিয়ার স্টেট'।
২০২৫ সালে এসে এই একই চক্র আবার ঘুরছে। ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধের মধ্যে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এখন ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের অতিথি। আলোচনার প্রধান বিষয়: মার্কিন ও ইজরায়েলি বিমানবাহিনীর জন্য পাকিস্তানি ঘাঁটি ব্যবহার, মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত সহায়তা এবং ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়ার অনুরোধ।
বিনিময়ে মুনির চাইতে পারেন উন্নত অস্ত্র, অর্থনৈতিক সহায়তা ও কাশ্মীর ইস্যুতে হস্তক্ষেপ। আর ঠিক এখানেই ভারত উদ্বিগ্ন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইজরায়েলি গণহত্যা, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সূচনা এবং তার মধ্যেই আসিম মুনিরের ‘টু নেশন থিওরি’ বক্তৃতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা হয়েছিল। পরে তারই প্রতিফলন দেখা যায় ২২ এপ্রিল পহেলগামে ভারতীয় পর্যটক হত্যাকাণ্ডে। এর পরে ১২ মে অপারেশন সিঁদুর দিয়ে ভারতের জবাবে পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটিতে মিসাইল হামলা চলে এবং ইন্দাস জলচুক্তি স্থগিত করা হয়।
তার পরেই পাকিস্তান বিরতি চায়, ভারত সম্মত হয়। মুনির নিজেকে ঘোষণা করেন ফিল্ড মার্শাল। এর মধ্যে আমেরিকা দাবি করে বসে, ট্রাম্পের কথাতেই থেমেছে এই সংঘর্ষ। ভারত বারবার এই দাবি উড়িয়ে দিলেও, আন্তর্জাতিক মহলে এটি নিয়ে আলোচনা চলছেই।
এমনকি শোনা যাচ্ছে, আমেরিকার দাবিকে সত্যি বলে সাক্ষী দিয়ে পাকিস্তান এখন প্রচার চালাচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য দাবিদার। এসবের মাঝে মুনির আবার মার্কিন মঞ্চে, নিজের অবস্থান পুনর্গঠনে ব্যস্ত।
পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা ইতিহাস জুড়ে আন্তর্জাতিক সংকটকে ব্যবহার করেছেন নিজেদের স্বার্থে। কিন্তু প্রতিবারই এর পরিণাম হয়েছে দেশের জন্য ভয়াবহ। এখন প্রশ্ন, মুনির কি সেই পথেই হাঁটছেন, নাকি এবারও তাঁর ভাগ্যে শেষমেশ ব্যর্থতাই জুটবে?