এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ইরানের হাতে আসলে কতটা শক্তিশালী সামরিক অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে? ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, ক্রুজ মিসাইল, এমনকি সমুদ্রপথে হামলার সক্ষমতা—সব মিলিয়ে ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

শেষ আপডেট: 4 March 2026 12:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ইরান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের (Iran war) সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই সহ একাধিক শীর্ষ সামরিক আধিকারিক নিহত হওয়ার পরই পাল্টা জবাব দিতে শুরু করেছে তেহরান। ইজরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেছে ইরান।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ইরানের হাতে আসলে কতটা শক্তিশালী সামরিক অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে? ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, ক্রুজ মিসাইল, এমনকি সমুদ্রপথে হামলার সক্ষমতা—সব মিলিয়ে ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইরানের প্রধান শক্তি: ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় ও বৈচিত্র্যময় ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে ইরানের। আধুনিক যুদ্ধবিমান তুলনায় কম থাকলেও সেই ঘাটতি পূরণ করেছে শক্তিশালী মিসাইল প্রোগ্রাম। ইরানের দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ২০০০ থেকে ২৫০০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত আঘাত হানতে পারে। অর্থাৎ ইজরায়েল, কাতার, বাহরিন, কুয়েত, সৌদি আরব কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলিও এই পরিসরের মধ্যে পড়ে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে সক্ষম নয়।
স্বল্পপাল্লার মিসাইল: দ্রুত পাল্টা আঘাতের অস্ত্র
ইরানের স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের রেঞ্জ সাধারণত ১৫০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার। এগুলি মূলত নিকটবর্তী সামরিক ঘাঁটি বা লক্ষ্যবস্তুর উপর দ্রুত আঘাত হানার জন্য ব্যবহৃত হয়। এই শ্রেণির গুরুত্বপূর্ণ মিসাইলগুলির মধ্যে রয়েছে—ফতেহ সিরিজ, জুলফিকার, কিয়াম-১, শাহাব-১ ও শাহাব-২। একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে নিক্ষেপ করে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভ্রান্ত করাই এদের কৌশল।
২০২০ সালে মার্কিন সেনা জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর ইরান ইরাকের আইন আল-আসাদ মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। সেই হামলায় ঘাঁটির পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শতাধিক মার্কিন সেনা আহত হন।

<strong>মিসাইল সিটি</strong>
মাঝারি পাল্লার মিসাইল: আঞ্চলিক শক্তির মূল অস্ত্র
ইরানের ১৫০০ থেকে ২০০০ কিলোমিটার পাল্লার মিসাইলগুলিই আসলে মধ্যপ্রাচ্যে তার কৌশলগত শক্তি তৈরি করেছে।
এই শ্রেণির মধ্যে উল্লেখযোগ্য—শাহাব-৩ , এমাদ, ঘাদর-১, খোররামশাহর, সেজিল, খেইবার শেখান, হাজ কাসেম এর মধ্যে সেজিল একটি সলিড-ফুয়েল মিসাইল। ফলে এটি দ্রুত প্রস্তুত করা যায় এবং হঠাৎ আঘাত হানার ক্ষমতা বেশি।
ক্রুজ মিসাইল ও ড্রোন: আকাশপথে নতুন কৌশল
ইরানের সামরিক কৌশলে এখন বড় ভূমিকা নিচ্ছে ক্রুজ মিসাইল ও ড্রোন। ক্রুজ মিসাইল সাধারণত নিচু দিয়ে উড়ে যায় এবং ভূখণ্ডের সঙ্গে মিল রেখে চলতে পারে। ফলে এগুলি শনাক্ত করা কঠিন। ইরানের ব্যবহৃত উল্লেখযোগ্য ক্রুজ মিসাইলগুলির মধ্যে রয়েছে—সৌমার, হোভেইজে, পাভেহ, কুদস সিরিজ, রা’দ-এর মধ্যে সৌমার মিসাইলের পাল্লা প্রায় ২৫০০ কিলোমিটার। অন্যদিকে ড্রোন তুলনামূলক সস্তা এবং বড় সংখ্যায় ব্যবহার করা যায়। অনেক সময় ড্রোনের একাধিক ঢেউ পাঠিয়ে প্রতিপক্ষের এয়ার ডিফেন্স দুর্বল করে দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়।
ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’
ইরান বহু বছর ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভূগর্ভস্থ টানেল ও গোপন ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি তৈরি করেছে। এগুলিকে অনেকে “মিসাইল সিটি” বলে উল্লেখ করেন। এই ব্যবস্থা ইরানকে বড় আঘাতের পরেও দীর্ঘ সময় পাল্টা হামলা চালানোর সক্ষমতা দেয়। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ে।

হরমুজ প্রণালী: বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের উপর চাপ
ইরানের কৌশল শুধু স্থলভিত্তিক হামলায় সীমাবদ্ধ নয়। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথগুলির একটি। এই পথে চাপ তৈরি করতে ইরান ব্যবহার করতে পারে— অ্যান্টি-শিপ মিসাইল, নৌ মাইন, ড্রোন, দ্রুতগতির যুদ্ধজাহাজ। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড দাবি করেছে, তারা ইতিমধ্যে এই অঞ্চলের কাছে মার্কিন ও ব্রিটিশ সংযোগযুক্ত তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এদিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিপিং সংস্থা মার্স্ক জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তারা আপাতত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ রেখেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি: সুযোগ ও ঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার একাধিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে—কাতার, বাহরিন, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে। এই ঘাঁটিগুলিতে সেনা ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বিস্তৃত ঘাঁটির নেটওয়ার্ক সবসময়ে সমানভাবে সুরক্ষিত রাখা কঠিন। ফলে কোথাও প্রতিরক্ষা ভেদ হলে তার রাজনৈতিক প্রভাবও বড় হতে পারে।

সংঘাত কি বড় যুদ্ধে রূপ নেবে?
ইরানের বার্তা স্পষ্ট—তাদের ভূখণ্ডে হামলা মানেই “সীমিত সংঘাত” নয়, বরং বৃহত্তর যুদ্ধের সূচনা। ইতিমধ্যেই লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী ইরানের পাশে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে। ফলে এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের আরও বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং সামুদ্রিক কৌশল—এই তিন শক্তিই আগামী দিনের সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।