পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ বা আগ্রাসনের পথে না গিয়ে মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীরা এমন কিছু ‘হাই-ইমপ্যাক্ট’ কিন্তু সীমিত অভিযান নিয়ে ভাবছেন, যা ইরানের কৌশলগত শক্তিকে দুর্বল করতে পারে, বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি রুটের ওপর দেশটির প্রভাব কমানো যায়।

যুদ্ধ নয়, সীমিত স্থল অভিযানেই জোর আমেরিকার
শেষ আপডেট: 29 March 2026 16:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যুদ্ধবিরতি, শান্তি আলোচনা সব বিতর্কের মধ্যেই এবার পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি (Middle East crisis) গুরুতর দিকে মোড় নিতে চলেছে। বহুদিন ধরেই এমন ইঙ্গিত দিচ্ছিল আমেরিকা, তবে এবার সূত্রের খবর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সীমিত পরিসরের স্থল অভিযানের সম্ভাব্য পরিকল্পনা (US ground operations Iran) তৈরি করছে - যার মধ্যে হরমুজ প্রণালীর আশেপাশে লক্ষ্যভিত্তিক হামলা এবং খার্গ দ্বীপ দখলের মতো পদক্ষেপও (Hormuz Kharg Island capture US plan) থাকতে পারে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ বা আগ্রাসনের পথে না গিয়ে মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীরা এমন কিছু ‘হাই-ইমপ্যাক্ট’ কিন্তু সীমিত অভিযান নিয়ে ভাবছেন, যা ইরানের কৌশলগত শক্তিকে দুর্বল করতে পারে, বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি রুটের ওপর দেশটির প্রভাব কমানো যায়।
পেন্টাগন নাকি ইতিমধ্যেই এমন পরিকল্পনা তৈরি করছে, যেখানে স্পেশাল অপারেশনস ফোর্স এবং পদাতিক বাহিনীকে ব্যবহার করে দ্রুত ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চালানো হবে। লক্ষ্য, ইরানের সামরিক অবকাঠামোতে আঘাত হানা, তবে দীর্ঘমেয়াদি দখল বা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়িয়ে চলা।
এই পরিকল্পনার পটভূমিতে রয়েছে ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক উত্তেজনা। ইরান ইতিমধ্যেই বাহরিন এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির শিল্পাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সেই সঙ্গে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরাও এই সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী ও খার্গ দ্বীপ
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণের পথ। বিশ্বে ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও তার প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে এবং বিশ্ব বাণিজ্যে।
মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে আলোচনা চলছে, কীভাবে প্রণালীর কাছাকাছি উপকূলে স্থাপিত ইরানের অস্ত্রব্যবস্থাকে নিষ্ক্রিয় করা যায়, যা বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, ইরানের দক্ষিণ উপকূলের কাছে অবস্থিত খার্গ দ্বীপ দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল রফতানি কেন্দ্র। এখান থেকেই ইরানের অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল বিদেশে পাঠানো হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বীপের পরিকাঠামো দখল বা অচল করে দিতে পারলে ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে এবং আলোচনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বড় চাপ তৈরি করতে পারবে।
তবে সামরিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন - খার্গ দ্বীপের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা এটিকে যেমন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে, তেমনই এটি ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র পাল্টা হামলার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়, সীমিত স্থল অভিযানেই জোর
মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য স্থল অভিযান দীর্ঘমেয়াদি দখল নয়, বরং দ্রুত এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক হবে। স্পেশাল অপারেশন ইউনিটের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে হুমকি তৈরি করতে পারে এমন ইরানি অস্ত্রব্যবস্থাকে ধ্বংস করাই মূল লক্ষ্য।
ইতিমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলের কাছে বিপুল সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত অভিযানে সক্ষম মেরিন ইউনিট এবং যেকোনওরকম যুদ্ধপরিস্থতির জন্য প্রস্তুত বাহিনী।
তবে এখনও পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনও স্থল অভিযান অনুমোদন করেননি। হোয়াইট হাউসের বক্তব্য, এই সামরিক প্রস্তুতি মূলত কৌশলগত বিকল্প খোলা রাখার জন্য, তাৎক্ষণিক যুদ্ধ বাড়ানোর সংকেত নয়।
মার্কিন বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিওও ইঙ্গিত দিয়েছেন, বড় সংখ্যায় সেনা মোতায়েন না করেও ওয়াশিংটনের লক্ষ্য পূরণ সম্ভব বলে তারা মনে করছে।
ইরানের বাইরে ছড়াচ্ছে সংঘাত
এই সংঘাত ইতিমধ্যেই ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত আঞ্চলিক রূপ নিচ্ছে। AFP-র রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় বাহরিন এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আহত হয়েছেন শ্রমিকরা। এর ফলে বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও ইজরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, যার ফলে লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলেও বিঘ্নের আশঙ্কা বাড়ছে।
সৌদি আরব ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে কিছু তেল রফতানির পথ পরিবর্তন করেছে, যা এই সংঘাতের অর্থনৈতিক অভিঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদি এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ হয়ে যায় বা ব্যাহত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
দর কষাকষির হাতিয়ার খার্গ দ্বীপ
একাধিক বিশ্লেষকের মতে, খার্গ দ্বীপ দখল করতে পারলে ভবিষ্যৎ আলোচনায় এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় ‘বার্গেনিং চিপ’ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, এই দ্বীপে বিশাল তেল মজুত ও রফতানি পরিকাঠামো রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, ইরানের মূল ভূখণ্ডের এত কাছাকাছি কোনও এলাকা দীর্ঘদিন ধরে দখল করে রাখা অত্যন্ত কঠিন। ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং আর্টিলারি হামলার ঝুঁকি সবসময়ই থাকবে। সেই কারণেই সামরিক পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি দখলের বদলে স্বল্প সময়ের দ্রুত অভিযানকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
এক মার্কিন আধিকারিক দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-কে জানিয়েছেন, “এটা হঠাৎ করে তৈরি পরিকল্পনা নয়”। ইঙ্গিত, এই ধরনের সামরিক পরিস্থিতির জন্য আগেই বিস্তারিতভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
সামরিক প্রস্তুতির মাঝেই কূটনৈতিক তৎপরতা
যদিও সামরিক প্রস্তুতি জোরকদমে চলছে, তবুও উত্তেজনা কমানোর জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগও চালু রয়েছে। পাকিস্তান মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে সৌদি আরব, তুরস্ক এবং মিশরকে নিয়ে বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে, যাতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনার পথ খোলা যায়।
ইরানের পক্ষ থেকেও এই মধ্যস্থতার ইঙ্গিত স্বীকার করা হয়েছে। ফলে এখনও আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি বদলানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
তবে বাস্তবতা হল, হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে উত্তেজনা এবং ধারাবাহিক হামলার প্রেক্ষিতে মার্কিন স্থল অভিযানের সম্ভাবনা এখন আর উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আরব দুনিয়ার এই সংঘাত ঠিক কোন দিকে মোড় নেবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।