ইরানের গভীর বাঙ্কারে হামলা চালাতে পারে আমেরিকার জিবিইউ-৫৭এ/বি এমওপি বোমা। এটি শুধু বি-টু স্পিরিট যুদ্ধবিমানে বহনযোগ্য। এখনো ইজরায়েলের কাছে নেই এই অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ।

এমওপি বোমা।
শেষ আপডেট: 19 June 2025 16:19
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইরানের পাহাড়ের নীচে লুকোনো পারমাণবিক বাঙ্কারগুলোয় আঘাত হানার মতো শক্তিশালী অস্ত্রের মধ্যে অন্যতম একটি হল আমেরিকার 'জিবিইউ-৫৭এ/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর' বা এমওপি। তবে এখনও পর্যন্ত এটি ব্যবহৃত হয়নি। এমনকি ইজরায়েলের পক্ষেও এই বোমা ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
এমওপি কোনও পারমাণবিক বোমা নয়, এটি একটি অতি শক্তিশালী নন-নিউক্লিয়ার বাঙ্কার ব্লাস্টার। ওজন ৩০ হাজার পাউন্ড বা ১৩ হাজার ৬০০ কেজি। এটি মাটির প্রায় ২০০ ফুট নিচে গিয়েও বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। এই অস্ত্র এতটাই ভারী ও শক্তিশালী যে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের বি-টু স্পিরিট (B-2 Spirit) স্টিলথ যুদ্ধবিমানই এটি বহন করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন এই বোমাটি এখনও কোনও যুদ্ধে ব্যবহার হয়নি, তবে নিউ মেক্সিকোর হোয়াইট স্যান্ডস মিসাইল রেঞ্জে এটি সফলভাবে পরীক্ষিত হয়েছে। এর প্রস্তুতকারক বোয়িং। শক্তিশালী বিস্ফোরক ক্ষমতার দিক থেকে এটি ২০১৭ সালে আফগানিস্তানে ব্যবহৃত 'মাদার অব অল বম্বস' বা এমওএবি-র চেয়েও কার্যকর বলে মনে করা হয়।
এমওপি বহনের জন্য উপযোগী একমাত্র বিমান হলো বি-টু স্পিরিট। এটি নর্থরপ গ্রুম্যান কোম্পানির তৈরি এবং মার্কিন বিমানবাহিনীর সবচেয়ে উন্নত স্টিলথ প্রযুক্তিসম্পন্ন বোমারু বিমান। এই বিমান একটানা ৭ হাজার মাইল এবং একবার জ্বালানি ভরে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার মাইল পর্যন্ত উড়তে পারে। এটি পৃথিবীর যে কোনও জায়গায় এক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছাতে পারে বলেও দাবি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের।
বি-টু একসঙ্গে দুটি এমওপি বহন করতে সক্ষম, যার সম্মিলিত ওজন ২৭ হাজার কেজির বেশি। তবে এমন অস্ত্রের সংখ্যা আমেরিকারও খুবই সীমিত। অনুমান করা হয়, ১০ থেকে ২০টির মতো আছে।
ইরানের ফোর্ডো পারমাণবিক সমৃদ্ধিকরণ কেন্দ্র তেহরান থেকে প্রায় ৯৫ কিমি দূরে পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত। এই ফোর্ডোই এমওপি বোমার সম্ভাব্য টার্গেট। এই স্থাপনাটি প্রায় ৮০ মিটার পাথর ও মাটির নীচে এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা সুরক্ষিত। ইজরায়েলের প্রধান লক্ষ্যই হল, এই কমপ্লেক্স ধ্বংস করা।
তবে ইজরায়েলের নিজস্ব এমন কোনও অস্ত্র নেই, যা ফোর্ডোর মতো গভীর বাঙকারে আঘাত হানতে পারে। তাই এমওপি ব্যবহারের জন্য তাদের আমেরিকার সাহায্য দরকার। কিন্তু আমেরিকা এখনও ইজরায়েলকে এই অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি।
এই পরিস্থিতিতে মনে করা হচ্ছে, ইরানে এমওপি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি মার্কিন প্রশাসনের ওপর নির্ভর করছে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর এই সিদ্ধান্ত আরও রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে।

পিস স্টাডিজ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পল রজার্স মনে করেন, ইরানের মতো শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এমওপি ব্যবহার করতে হলে শুধু বি-টু নয়, সঙ্গে এফ-২২ যুদ্ধবিমান ও ড্রোন ব্যবহারেরও প্রয়োজন হবে। তিনি আরও বলেন, আমেরিকা আসলে চায় না, ইজরায়েল একা এই হামলায় নেতৃত্ব দিক।
ইজরায়েলের মার্কিন দূত ইয়েখিয়েল লেইটার জানিয়েছেন, ফোর্ডো নিশ্চিহ্ন করাই এই পুরো অভিযানের লক্ষ্য। সবসময় আকাশপথেই বোমা ফেলে সব কিছু করা হয় না, একথাও উল্লেখ করেন তিনি
ইরান সবসময় বলে এসেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। তারা কখনওই পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে চায়নি। তবে ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা (IAEA) জানায়, তারা ইরানে এমন ইউরেনিয়াম কণা পেয়েছে যার পরিশোধন মাত্রা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি।
সম্প্রতি সংস্থাটির বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ইরান আন্তর্জাতিক চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেছে।
সব মিলিয়ে, ফোর্ডোর মতো স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাতে হলে আমেরিকাকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, তারা কি ইজরায়েলকে এই যুদ্ধ-ক্ষমতাসম্পন্ন বোমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে? নাকি সরাসরি আমেরিকা নিজেই জড়াবে এমন অভিযানে?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, ইরানের উপর হামলার অভিঘাত কতটা হবে।