মা এলিজাবেথ-টু -র (Elizabeth II) প্রিয় সন্তান হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। সেনা কর্মকর্তা হিসেবে ছিল তাঁর জনপ্রিয়তা। কিন্তু এখন তিনি ব্রিটিশ রাজপরিবারের সবচেয়ে বিতর্কিত সদস্যদের মধ্যে অন্যতম— কারণ এক কিশোরীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।

শেষ আপডেট: 18 October 2025 18:54
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিতর্ক ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগে শেষ পর্যন্ত রাজকীয় উপাধি ছাড়লেন ব্রিটিশ যুবরাজ প্রিন্স অ্যান্ড্রু। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চলে আসা আইনি লড়াই ও জনমতের চাপের পর শুক্রবার এক বিবৃতিতে তিনি ঘোষণা করেন— আর তিনি ডিউক অব ইয়র্ক (Prince Andrew, Duke of York) বা রাজপরিবারের নাইটহুডের মতো মর্যাদা বহন করবেন না।
মা এলিজাবেথ-টু -র (Elizabeth II) প্রিয় সন্তান হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। সেনা কর্মকর্তা হিসেবে ছিল তাঁর জনপ্রিয়তা। কিন্তু এখন তিনি ব্রিটিশ রাজপরিবারের সবচেয়ে বিতর্কিত সদস্যদের মধ্যে অন্যতম— কারণ এক কিশোরীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
৬৫ বছর বয়সী প্রিন্স অ্যান্ড্রু জানান, তাঁর বিরুদ্ধে চলতি অভিযোগ রাজপরিবার ও রাজা চার্লসের (Charles III) এর কাজে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। তাই পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করেই তিনি সব উপাধি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি যুক্তরাজ্যের প্রাচীনতম সম্মান— ‘অর্ডার অব দ্য গার্টার’-এর সদস্যপদও আর রাখছেন না। তবে তিনি ‘প্রিন্স’ উপাধিটি রাখবেন, কারণ সেটি জন্মসূত্রে পাওয়া। কিন্তু আর ‘ডিউক অব ইয়র্ক’ বলা হবে না। এই উপাধিটি তিনি পেয়েছিলেন প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের কাছ থেকে।
অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন মার্কিন নাগরিক ভার্জিনিয়া জিউফ্রি। তিনি আদালতে বলেন— ২০০১ সালে, মাত্র ১৭ বছর বয়সে, তাঁকে যৌন নিপীড়ন করেছিলেন প্রিন্স অ্যান্ড্রু। অভিযোগটি ওঠে কুখ্যাত মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টিনের (Jeffrey Epstein) পাচার চক্রের প্রসঙ্গে। এই জেফরি এপস্টিন ছিলেন এক বিতর্কিত আর্থিক বিনিয়োগকারী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। ২০০৮ সালে তিনি প্রথম শিশু যৌন পাচারের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন। পরে তাঁর ব্যক্তিগত জেটে করে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে দ্বীপে পার্টির আয়োজন এবং সেখানে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচারের অভিযোগে ফের মামলা হয়। ২০১৯ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই বছরই জেল সেলে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়— যা নিয়ে আজও বিতর্ক থামেনি।
এপস্টিনের সঙ্গে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। ২০১০ সালে নিউইয়র্কে তাঁদের একসঙ্গে দেখা যায়— যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। পরে অ্যান্ড্রু দাবি করেন, তিনি ওই সময়ের পর আর এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেননি। কিন্তু তদন্তে বেরিয়ে আসে, তিনি পরেও যোগাযোগ রেখেছিলেন। এই সম্পর্কই তাঁকে বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর থেকেই বাকিংহাম প্যালেসের উপর চাপ বাড়তে থাকে। ২০২২ সালে প্রয়াত রানি এলিজাবেথ তাঁর সামরিক ও রাজকীয় মর্যাদা ফিরিয়ে নেন। এরপর থেকেই তিনি জনজীবন থেকে প্রায় সরে যান এবং রাজকীয় অনুষ্ঠান থেকেও দূরে থাকেন।এই অভিযোগ ও বিতর্কের জেরে অ্যান্ড্রুর আর্থিক লেনদেন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। চিনা এক গুপ্তচরের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়েও তদন্ত শুরু হয়। সব মিলিয়ে রাজপরিবারের ভাবমূর্তিতে পড়তে থাকে তীব্র আঁচ।এই কারণেই রাজা চার্লস ও যুবরাজ উইলিয়ামের (William, Prince of Wales) সঙ্গে পরামর্শ করে উপাধি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন অ্যান্ড্রু। এই সিদ্ধান্তের ফলে অ্যান্ড্রুর সাবেক স্ত্রী সারাহ ফার্গুসনও ‘ডাচেস অব ইয়র্ক’ মর্যাদা হারাবেন। তবে তাঁদের দুই মেয়ে প্রিন্সেস উপাধি বহাল রাখতে পারবেন। অ্যান্ড্রু উইন্ডসরের ‘রয়্যাল লজ’-এ নিজের নামে থাকা ইজারার ভিত্তিতে থাকতে পারবেন, যার মেয়াদ ২০৭৮ সাল পর্যন্ত।
২০১৯ সালে বিবিসি নিউজনাইটের সাক্ষাৎকারে অ্যান্ড্রু দাবি করেছিলেন— এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অতীত। কিন্তু ফাঁস হওয়া ই–মেইল ও সাক্ষ্য প্রমাণে উঠে আসে ভিন্ন ছবি। এরপর থেকে তিনি কড়া নজরদারির মধ্যে রয়েছেন।
প্রিন্স অ্যান্ড্রুর এই কেলেঙ্কারি শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত ইস্যু নয়— এটি যুক্তরাজ্যের রাজপরিবারের ভাবমূর্তিতেও গভীর আঘাত হেনেছে বলে মনে করা হচ্ছে। অ্যান্ড্রুর পদত্যাগ তাই শুধু ব্যক্তিগত নয়, এক অর্থে রাজপরিবারের মর্যাদা রক্ষার কৌশল বলেই বিশ্লেষকদের অভিমত।