ভারতের ঘরোয়া পরিবেশেও তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। বিশাখাপত্তনম থেকে সামরিক মহড়া শেষে ফেরার সময়েই মার্কিন সাবমেরিন থেকে ছোড়া টর্পেডোর আঘাতে জাহাজের সলিল সমাধি ঘটে। তা নিয়েই এবার গভীর উদ্বেগ করলেন প্রাক্তন বিদেশ সচিব নিরূপমা রাও। তাঁর কার্যত সরাসরি প্রশ্ন, এর পর আমেরিকার প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে তো?

প্রাক্তন বিদেশ সচিব নিরূপমা রাও
শেষ আপডেট: 7 March 2026 13:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারত মহাসাগরের (Indian Ocean) বিস্তীর্ণ জলরাশিতে ইরানের যুদ্ধজাহাজ ‘ডেনা’ (Dena) ডুবে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র ইতিমধ্যেই আন্দোলিত আন্তর্জাতিক কূটনীতি। ভারতের ঘরোয়া পরিবেশেও তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। বিশাখাপত্তনম থেকে সামরিক মহড়া শেষে ফেরার সময়েই মার্কিন সাবমেরিন থেকে ছোড়া টর্পেডোর আঘাতে জাহাজের সলিল সমাধি ঘটে। তা নিয়েই এবার গভীর উদ্বেগ করলেন প্রাক্তন বিদেশ সচিব নিরূপমা রাও। তাঁর কার্যত সরাসরি প্রশ্ন, এর পর আমেরিকার প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে তো?
কূটনৈতিক কেরিয়ারে নিরূপমা ওয়াশিংটনেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১১ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন তিনি। তার আগে চিনেও ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। পরে বিদেশ মন্ত্রী হন। এহেন নিরূপমা এদিন পরিশীলিত কূটনৈতিক কথায় মার্কিন আচরণ নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা নজর করার মতই। তাঁর কথায়, “যুক্তরাষ্ট্রকে তার প্রতিষ্ঠান, সংস্কৃতি ও আদর্শের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বহু মানুষ শ্রদ্ধার চোখে দেখেছে। কিন্তু যুদ্ধের মানবিক মূল্য সম্পর্কে এমন নির্লিপ্ততা দেখা গেলে তা গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে”।
শুধু তা নয়, প্রাক্তন বিদেশ সচিব এও বোঝাতে চেয়েছেন, ক্ষমতা আর শক্তির নেশায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এখন উন্মত্ত। তারা কোনও আত্মসমালোচনাই করছে না। ফলে সংযম হারিয়ে ফেলেছে। প্রাক্তন বিদেশ সচিবের কথায়, “যুদ্ধের এমন কিছু মুহূর্ত থাকে যা কৌশল, শক্তি বা ভূরাজনীতির হিসেবকে ভেদ করে সরাসরি মানবিক দুঃখ-বেদনার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়”। তাঁর মতে, ভারত মহাসাগরের গভীরে ইরানের যুদ্ধজাহাজ ডেনা ডুবে যাওয়ার ঘটনাটি তেমনই এক মুহূর্ত—যেখানে যুদ্ধের বাস্তবতা কেবল সামরিক পরিভাষায় আর সীমাবদ্ধ নেই, বরং বহু সংখ্যক মানুষের প্রাণহানির সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
নিরূপমা রাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, একটি যুদ্ধজাহাজ মানে শুধু সামরিক শক্তির প্রতীক নয়। সেখানে থাকে বহু তরুণ নাবিক—যাঁরা নিজেদের দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে, পরিবার থেকে বহু দূরে দায়িত্ব পালন করেন। সেই জাহাজ হঠাৎ করেই গভীর সমুদ্রের অন্ধকারে তলিয়ে গেলে, তা শুধু একটি সামরিক ঘটনা নয়—এ এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিও।
প্রাক্তন বিদেশ সচিব লিখেছেন, “যুদ্ধের আইনি যুক্তি থাকতে পারে, কৌশলগত ব্যাখ্যাও থাকতে পারে। কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে পড়ে যায়—সমুদ্র তো ভূরাজনীতি বোঝে না। সে জানে শুধু নীরবতা।”
নিরূপমার মতে, ভারত মহাসাগর বরাবরই ইতিহাসে ছিল বাণিজ্য, সংস্কৃতি, সঙ্গীত ও মানুষের আদানপ্রদানের এক উন্মুক্ত পথ। সেই সমুদ্রকে যদি যুদ্ধজাহাজের কবরস্থানে পরিণত হতে দেখা যায়, তা গভীরভাবে ব্যথিত করে। তাঁর কথায়, ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ নৌ-মহড়া শেষ করে ফিরছিল, অথচ নিজের উপকূল থেকে এত দূরে এসে এমন পরিণতি—এ যেন অন্য কোনও যুগের যুদ্ধের দৃশ্য।

নিরূপমা রাও আরও লিখেছেন, এই ঘটনার কথা ভাবলে বারবার মনে পড়ে যায় সেই সব পরিবারের কথা, যারা হয়তো প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায় ছিল। এমন অনেক চিঠি হয়তো আর লেখা হবে না, অনেক গল্প অসম্পূর্ণই থেকে যাবে—সমুদ্রের ঠান্ডা জলের নীচে হারিয়ে যাবে বহু জীবনের স্বপ্ন।
তাঁর প্রশ্ন, এত দূরের সমুদ্রে এত মানুষের প্রাণহানি—তার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? সেই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেছেন, “শক্তি যদি আত্মসমালোচনা ছাড়া প্রয়োগ করা হয়, তবে তা একসময় নৈতিক সংযম হারিয়ে ফেলে। আর তখন যুদ্ধ শুধু কৌশলগত সংঘাত নয়—মানবিক শোকের ইতিহাস হয়ে ওঠে”।