.jpeg)
সুনীতা উইলিয়ামস।
শেষ আপডেট: 23 March 2025 16:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছোটবেলা থেকে অনেকেরই স্বপ্ন থাকে মহাকাশচারী হওয়ার। রকেটে চড়ে মহাকাশে যাওয়া, পৃথিবীকে দূর থেকে দেখা, ভাসমান অভিকর্ষশূন্য পরিবেশে উড়ে বেড়ানো-- যেন এক স্বপ্ন। সম্প্রতি সেই স্বপ্নকে আরও উস্কে দিয়েছে সুনীতাদের ২৮৬ দিনের রুদ্ধশ্বাস মহাকাশ অভিযান।
কিন্তু বাস্তবে মহাকাশে জীবন মোটেও সহজ নয়। বিপদের ঝুঁকি এতটাই বেশি যে, মহাকাশচারীরা মিশনে যাওয়ার আগে উইল করে যান, পরিবারকে সব বুঝিয়ে দিয়ে যান।
নাসার কঠোর বাছাই প্রক্রিয়া পেরিয়ে গুটিকয়েক ভাগ্যবানই মহাকাশে পা রাখার সুযোগ পান। কিন্তু সেখানে টিকে থাকাই এক বড় চ্যালেঞ্জ। খাবার স্বাদহীন, ঢেকুর তোলা যায় না, শরীরের উচ্চতা বাড়তে থাকে, আর প্রতিনিয়ত লড়তে হয় শূন্যতার সঙ্গে।
মহাকাশে আমাদের শরীর একেবারে অন্যরকম আচরণ করে:
স্বাদহীন খাবার: মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় রক্ত শরীরের উপরের দিকে উঠে আসে, ফলে স্বাদগ্রন্থিগুলোর কার্যকারিতা কমে যায়। তাই খাবার পানসে লাগে।
ঢেকুর তোলা যায় না: পৃথিবীতে পাকস্থলীতে থাকা গ্যাস সহজেই বেরিয়ে আসে, কিন্তু মহাকাশে তরল ও গ্যাস আলাদা হয় না। তাই ঢেকুর তুলতে গেলে খাবারও উঠে আসতে পারে।
উচ্চতা বৃদ্ধি: অভিকর্ষ না থাকায় মেরুদণ্ড প্রসারিত হয়, ফলে উচ্চতা প্রায় ২ ইঞ্চি পর্যন্ত বেড়ে যায়। তবে পৃথিবীতে ফিরলে তা আবার কমে যায়।
পেশি ও হাড় দুর্বল হয়ে যায়: পা ও কোমরের পেশি ব্যবহার না হওয়ায় তারা ক্রমশ শক্তি হারায়, হাড়ও পাতলা হয়ে যায়। তাই মহাকাশচারীদের প্রতিদিন অন্তত দু'ঘণ্টা ব্যায়াম করতে হয়।
মুখ ফোলাফোলা দেখায়: মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় রক্ত নীচে নামতে পারে না, ফলে মুখ ফোলা দেখায়। এতে ব্রেনেও বাড়তি চাপ পড়ে।

স্পেসওয়াক ও নিরাপত্তা: মহাকাশযানের রক্ষণাবেক্ষণ করতে মাঝে মাঝে মহাকাশচারীদের বাইরে বের হতে হয়। এটি ‘স্পেসওয়াক’ নামে পরিচিত, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ছোট্ট একটি ভুল হলেই মহাকাশচারী চিরতরে শূন্যে হারিয়ে যেতে পারেন।
মহাকাশে অসুস্থ হলে: মহাকাশে ডাক্তার নেই, হাসপাতালও নেই। তাই মহাকাশযাত্রার আগে প্রতিটি মহাকাশচারীকে মেডিক্যাল প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘হাফ-ডাক্তার’ বানানো হয়। তবুও, গুরুতর অসুস্থ হলে পৃথিবীতে ফেরার কোনও সহজ উপায় থাকে না।
মহাকাশে কোনও বেসিন বা কল নেই, তাই স্বাভাবিকভাবে দাঁত ব্রাশ করা, স্নান করা বা হাত ধোয়া সম্ভব নয়।
মুখ ধোয়া: কুলকুচি করা যায় না, তাই ভেজা টিস্যু দিয়ে মুখ মুছতে হয়।
স্নান: বিশেষ সাবান ও শ্যাম্পু ব্যবহার করতে হয়, যা জল ছাড়া পরিষ্কার হয়। সাবান মাখার পর ভেজা তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে নেওয়া হয়।
বাথরুম: অভিকর্ষ না থাকায় মল-মূত্র নীচে পড়ে না, তাই ভ্যাক্যুম টয়লেট ব্যবহার করতে হয়। মূত্র ফিল্টার করে শুদ্ধ জল বানিয়ে পুনরায় ব্যবহার করা হয়।
মহাকাশযানে রান্নার সুযোগ নেই, তাই খাবার নিয়ে যেতে হয় শুকনো বা প্রক্রিয়াজাত অবস্থায়।
নাসার ল্যাবে পরীক্ষা করা খাবারই মহাকাশে পাঠানো হয়, যাতে কোনও মহাকাশচারী অসুস্থ না হয়ে পড়েন।
খাবার সাধারণত টিউব ফুড বা ফ্রিজ-ড্রায়েড (শুকনো) খাবার হিসেবে থাকে।
খাবারে স্বাদ আনতে সস, কেচাপ, কাসুন্দি ব্যবহার করা হয়, তবে লবণ ও গোলমরিচ তরল আকারে থাকে, যাতে গুঁড়ো ছড়িয়ে সমস্যা না তৈরি করে।
দুধ-মাখন মেশানো ডিম, দানাশস্য, ফল, কোকো, পাস্তা, হট ডগ, পাউরুটি, বাদাম, ফলের রস, স্যুপ, চালের পোলাও, ফলের মিশ্রণ, পুডিং, চিংড়ির ককটেল-- সবই থাকে, তবে নুন-চিনি ছাড়া।
মহাকাশে শুধু কাজই নয়, ছুটির দিনেও নানা বিনোদনের সুযোগ থাকে:
পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা।
গান শোনা, সিনেমা দেখা, বই পড়া।
সহকর্মীদের সঙ্গে তাস বা দাবা খেলা।
জানালা দিয়ে অসাধারণ নানা দৃশ্য দেখা। যেমন প্রতি ৪৫ মিনিটে একবার সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখা যায়!
মহাকাশে ‘উপর’ বা ‘নীচ’ বলে কিছু নেই, তাই মহাকাশচারীরা যেভাবে খুশি ঘুমোতে পারেন।
শূন্যে যাতে ভেসে না যান, তাই তাঁরা নিজেদের বিছানার সঙ্গে বেল্ট দিয়ে বেঁধে ঘুমান।
ঘুমোনোর সময় কেবিনে হালকা আলো ও গান শোনার ব্যবস্থা থাকে।
দিন-রাত না থাকলেও ঘুমের নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে চলতে হয়।
মহাকাশ থেকে ফেরার পরেও মহাকাশচারীদের নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। দীর্ঘদিন অভিকর্ষশূন্য পরিবেশে থাকার ফলে তাঁদের পেশি দুর্বল হয়ে যায়, রক্তচাপ কমে যায়, ভারসাম্য বজায় রাখতে সমস্যা হয়। তাই পৃথিবীতে ফেরার পর তাঁদের দীর্ঘদিন পুনর্বাসন ও শারীরিক থেরাপির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।
মহাকাশচারী হওয়া কেবল স্বপ্ন নয়, এটি এক কঠোর লড়াই। প্রতিদিন তাদের শরীর, মন এবং বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। একদিকে তাঁরা বিজ্ঞান ও গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছেন, অন্যদিকে তাঁদের জীবন ঝুঁকির মুখে প্রতি মুহূর্তে।
তবু মহাকাশের অজানা রহস্য উন্মোচনের নেশা তাঁদের ঠেলে নিয়ে যায় আরও দূরে। সুনীতাদের মতো সে সব সাহসী মানুষদের জন্যই আমরা জানতে পারছি মহাবিশ্বের নতুন নতুন তথ্য, যা একদিন হয়তো বদলে দেবে আমাদের ভবিষ্যৎ।