পশ্চিমি দেশগুলোর সঙ্গে লড়াইয়ের ইরানকে প্রস্তুত করেছিলেন খামেনেই।বর্তমান সংঘাত আর অস্থিরতার মাঝে ইরানের ভবিষ্যৎ এখন গভীর অনিশ্চয়তায়।

আয়াতোল্লা আলি খামেনেই
শেষ আপডেট: 1 March 2026 12:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই (Ali Khamenei) আর নেই। ৮৬ বছর বয়সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (United States) ও ইজরায়েলের (Israel) যৌথ বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন তিনি। রবিবার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) দাবি করেছিলেন, খামেনেইকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে শনিবার। তিনি রবিবার ভোর রাতে খামেনেই পরবর্তী শাসকের ইঙ্গিতও একটি সাক্ষাৎকারে দিয়ে ফেলেছেন।
ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, শনিবার সকালে খামেনেইয়ের কমপাউন্ডে হামলা হয়। সেই আঘাতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ইরানি সূত্র আরও দাবি করেছে, হামলায় তাঁর মেয়ে, জামাই, নাতি-নাতনি ও পরিবারের কয়েকজন সদস্যও নিহত হয়েছেন।
খামেনেইয়ের মৃত্যু শুধু একজন নেতার অবসান নয়—এটি ইরানের ৩৫ বছরের রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি। এখন প্রশ্ন, এরপর কী?
বিপ্লব থেকে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব
১৯৩৯ সালে মাশহাদে জন্ম আলি খামেনেইয়ের। শিয়া ধর্মতাত্ত্বিক পরিবারে বড় হয়ে ওঠেন। অল্প বয়সেই কোরান ও ইসলামি শিক্ষায় দীক্ষা নেন। পরে নাজাফ ও কুমের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্রে পড়াশোনা করেন।
ষাট ও সত্তরের দশকে শাহ রেজা পাহলভির শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় হন। একাধিকবার গ্রেফতারও করে পুলিশ। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর নতুন ইরান গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তিনি।
১৯৮১ সালে হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে গেলেও ডান হাত অকেজো হয়ে যায়। একই বছরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের (Iran-Iraq War) সময় তিনি দেশের নেতৃত্বে ছিলেন। সেই যুদ্ধ তাঁর রাজনৈতিক মানসিকতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
১৯৮৯ সালে আয়াতোল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেইনি (Ruhollah Khomeini)-র মৃত্যুর পর খামেনেইকে 'সর্বোচ্চ নেতা' নির্বাচিত করা হয়। সংবিধানের কিছু শর্ত শিথিল করেই তাঁকে এই পদে বসানো হয়। শুরু হয় দীর্ঘ শাসন।
নিরাপত্তা-রাষ্ট্রের স্থপতি
খামেনেইয়ের শাসনের মূল দর্শন ছিল ‘প্রতিরোধ’। তাঁর বিশ্বাস ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের শক্তি ইরানের বিরুদ্ধে স্বভাবতই শত্রুভাবাপন্ন। তাই দেশকে সব সময় নিরাপত্তা-সতর্ক অবস্থায় থাকতে হবে। এই সময়েই ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (Islamic Revolutionary Guard Corps বা IRGC) বিশাল শক্তিতে পরিণত হয়। সামরিক বাহিনী থেকে অর্থনীতি—সব ক্ষেত্রেই তাদের প্রভাব বাড়ে।
খামেনেই ‘রেজিস্ট্যান্স ইকোনমি’ (Resistance Economy) ধারণা সামনে আনেন। লক্ষ্য—পশ্চিমের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও স্বনির্ভরতা। একই সঙ্গে তিনি গড়ে তোলেন তথাকথিত ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ (Axis of Resistance)—হিজবুল্লাহ (Hezbollah), হামাস (Hamas), সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ (Bashar al-Assad) সরকার, ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী—এই জোট ইরানের প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
এই কৌশলের প্রধান স্থপতি ছিলেন কাসেম সোলেইমানি (Qassem Soleimani), যিনি ২০২০ সালে মার্কিন হামলায় নিহত হন।
আপোস ও অনমনীয়তা
খামেনেই পুরোপুরি কঠোর ছিলেন না। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে তিনি প্রেসিডেন্ট হাসান রৌহানির (Hassan Rouhani) সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির পথে এগোন। সেই যৌথ সমঝোতা চুক্তি জেসিপিওএ (JCPOA)—ইরানের ইউরেনিয়াম কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে। কিন্তু ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন। ফের নিষেধাজ্ঞা। খামেনেই আবার কঠোর অবস্থানে ফেরেন। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়ানো হয়।
তাঁর বিখ্যাত নীতি ছিল ‘না শান্তি, না যুদ্ধ’ (Neither peace nor war)। অর্থাৎ সরাসরি সংঘর্ষ নয়, কিন্তু সম্পূর্ণ আপোসও নয়।
প্রতিবাদ, দমন ও ক্ষোভ
খামেনেইয়ের শাসন বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সমস্যা হয়েছে ইরানের অভ্যন্তরে। ২০০৯ সালের ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ (Green Movement), ২০১৯ সালের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি-বিরোধী আন্দোলন, ২০২২ সালে মাহসা আমিনির (Mahsa Amini) মৃত্যুর পর নারী অধিকার নিয়ে দেশজুড়ে প্রতিবাদ—প্রতিবারই কঠোর দমননীতি নেওয়া হয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলির দাবি, বহু মানুষ নিহত হন। খামেনেই বরাবরই এই আন্দোলনকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দেন।
অর্থনৈতিক দুরবস্থা, মুদ্রার পতন, বেকারত্ব—সব মিলিয়ে তরুণ প্রজন্মের একাংশ তাঁর নীতিকে প্রশ্ন করতে শুরু করে।
শেষ অধ্যায়: যুদ্ধ ও হামলা
২০২৫ সালে ইজরায়েল (Israel) ইরানের একাধিক পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। পরে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে দুই দেশ। পরিস্থিতি চরমে ওঠে যখন যুক্তরাষ্ট্র (United States) প্রকাশ্যে সামরিক অভিযান শুরু করে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ‘মেজর কমব্যাট অপারেশন’ শুরু হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল—শাসন পরিবর্তনই লক্ষ্য।
হামলার জেরে খামেনেই নিহত হন। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু (Benjamin Netanyahu) বলেন, ‘অস্তিত্বের হুমকি’ দূর করতেই এই অভিযান।
সামনে কী?
খামেনেই কখনও প্রকাশ্যে উত্তরসূরির নাম জানাননি। ফলে এখন ইরানের ক্ষমতার ভার কার হাতে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রবিবার সকাল থেকেই একাধিক নাম সামনে আসছে, তাতে রয়েছে খামেনেইের ছেলেও কিন্তু তেহরান কিছুই স্পষ্ট করেনি এখনও। দেশ ইতিমধ্যেই অর্থনৈতিক চাপে। প্রতিবাদ ও দমনচক্রের স্মৃতি এখনও তাজা।
একদিকে জাতীয়তাবাদী আবেগ, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে দাঁড়িয়ে ইরান। এদিকে, খামেনেই ছিলেন কঠোর, কিন্তু কৌশলী। তাঁর শাসন ইরানকে আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেছে, আবার একই সঙ্গে গভীর আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতায় ঠেলে দিয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর ইরান কোন পথে যাবে—আরও কঠোর নিরাপত্তা-রাষ্ট্র, না কি নতুন আপসের রাজনীতি—সেই উত্তর নির্ধারণ করবে আরবদুনিয়ার আগামী মানচিত্র।