বিক্ষোভ দমনে খামেনেইয়ের শাসনব্যবস্থা নাকি আরবি ভাষা জানা ইরাকি শিয়া ভাড়াটে সেনাদের মাঠে নামিয়েছে, এমনটাই দাবি বিভিন্ন প্রতিবেদনের।
.jpeg.webp)
মাসে ৬০০ ডলারের বিনিময়ে ইরাকি তরুণদের নিয়োগ করা হচ্ছে।
শেষ আপডেট: 15 January 2026 12:07
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এক সন্ধ্যায় ইরান সীমান্তে রুটিন ডিউটিতে ছিলেন ইরাকের এক সরকারি কর্মকর্তা। একটি বাস চেকপোস্টে এসে থামে। বলা হয়, বাসটিতে শিয়া তীর্থযাত্রীরা ইরানে যাচ্ছেন। কিন্তু সন্দেহ জাগে দ্রুতই। যাত্রীদের মধ্যে পরিবার নেই, নেই বৃদ্ধ বা শিশু। কেবল তরুণ পুরুষে ঠাসা। সবাই একই রকম কালো টি-শার্ট পরা। এই কর্মকর্তা, আলি ডি, পরে মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে জানান, এ ধরনের ‘তীর্থযাত্রী’ বাস একের পর এক আসছিল। ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৬০টি ৫০ আসনের বাস সীমান্ত পেরিয়েছে।
এই দৃশ্যই ইঙ্গিত দিচ্ছে আরও বড় এক অভিযানের। ইরানে মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-বিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। আর সেই বিক্ষোভ দমনে খামেনেইয়ের শাসনব্যবস্থা নাকি আরবি ভাষা জানা ইরাকি শিয়া ভাড়াটে সেনাদের মাঠে নামিয়েছে, এমনটাই দাবি বিভিন্ন প্রতিবেদনের।
বিক্ষোভ, স্লোগান ও রক্তপাত
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে শুরু হওয়া আন্দোলনে এখন ‘মোল্লাতন্ত্রে পতন হবেই’— এমন স্লোগান শোনা যাচ্ছে। ৩১টি প্রদেশের অন্তত ৬১৪টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। সরকার দমনপীড়নের আশ্রয় নিয়েছে। এ পর্যন্ত ট্রাম্পের কথায়, ৩৫০০-র বেশি প্রতিবাদকারীর মৃত্যু হয়েছে। ইরান ও আমেরিকা দুদেশই যুদ্ধের জন্য তাল ঠুকছে। এই পরিস্থিতিতে শুক্রবার ভোররাত থেকেই ইরানে হামলা চালাতে পারে আমেরিকা, এমনও গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৩,৫০০-র বেশি মানুষ নিহত এবং ২০,০০০-এর বেশি বিক্ষোভকারী গ্রেফতার হয়েছেন। মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক দিনের মধ্যেই লাফিয়ে বেড়েছে। সপ্তাহের শুরুতে যেখানে সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০, সোমবার তা ৬০০ ছুঁয়েছে, মঙ্গলবার ২,২০০ ছাড়িয়েছে, আর বুধবার প্রায় ২,৬০০ এবং বৃহস্পতিতে তা ৩,৫০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে। লন্ডনভিত্তিক ইরান ইন্টারন্যাশনাল এই সংখ্যা প্রায় ১২,০০০ বলে দাবি করেছে। এই হিংসা বৃদ্ধির সময়কালে মিলছে ইরাক থেকে আরবিভাষী শিয়া ভাড়াটে সেনা ইরানে ঢোকার খবরে।
গাজা যুদ্ধ (৭ অক্টোবর ২০২৩) এবং জুনের ১২ দিনের সংঘাতে ক্ষয়ক্ষতির পর ইরানের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী— আইআরজিসি, বসিজ এখনও ধাক্কা সামলাচ্ছে। এর মধ্যেই কুর্দি মানবাধিকার সংগঠন হেঙ্গাও জানিয়েছে, কিছু নিরাপত্তাকর্মী নিজেরই দেশের বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালাতে অস্বীকার করেছে। পরে তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। ইরানি বিরোধী নেতা মেহদি রেজা দ্য মিডিয়া লাইন-কে বলেন, ইরাকি ভাড়াটে সেনাদের অনেককে সরকারি ও সামরিক ঘাঁটি পাহারায় মোতায়েন করা হয়েছে।
একই সময়ে সাংবাদিক নেজাত বাহরামি সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও পোস্ট করে সতর্ক করেন— হিজবুল্লা ও হাশদ আল-শাবির পতাকা হাতে জনসমাবেশে ‘ইরানে গিয়ে দমন চালানোর প্রস্তুতি’ ঘোষণা করা হচ্ছে।
কাতায়েব হিজবুল্লাহ, হারাকাত হিজবুল্লাহ আল-নুজাবা, বদর, পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস, কাতায়েব সাইয়িদ আল-শুহাদা— এমন একাধিক গোষ্ঠীর যোদ্ধারা ইরানে ঢুকেছে বলে দাবি। অর্থাৎ, খামেনেই যে ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ গড়ে তুলেছিলেন আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের জন্য, সেটিই এবার ব্যবহৃত হচ্ছে ইরানি নাগরিকদের বিরুদ্ধে। আমেরিকার বিদেশ মন্ত্রকের ফারসি ভাষার এক্স হ্যান্ডলও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের বক্তব্য— ইরানি মানুষের অর্থে গড়া সন্ত্রাসী প্রক্সি বাহিনীকে নিজের জনগণের বিরুদ্ধে নামানো চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, জানুয়ারির শুরু থেকেই ইরান-সমর্থিত ইরাকি ভাড়াটে যোদ্ধা নিয়োগ শুরু করে। প্রায় ৮০০ যোদ্ধা ইতিমধ্যে ইরানে রয়েছে। তাঁরা শালামচেহ, চাজাবেহ ও খসরাভি সীমান্ত দিয়ে ‘ইমাম রেজার দরগায় তীর্থযাত্রা’র আড়ালে ঢোকে। আহভাজের একটি সামরিক ঘাঁটি খালি করে সেখানে ইরাকি ভাড়াটে সেনাদের রাখা হয়েছে বলেও দাবি। পরে ফক্স নিউজ ডিজিটাল দুই সূত্রের খবরে জানায়, প্রায় ৮৫০ জন হিজবুল্লা, ইরাকি ভাড়াটে সেনা ও কুদস ফোর্স-ঘনিষ্ঠ যোদ্ধা ইরানে প্রবেশ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ১৯৭৯-পরবর্তী পুরনো কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি। নিজস্ব বাহিনীর পাশাপাশি আদর্শগতভাবে অনুগত বিদেশি সেনা ব্যবহার।
প্রতিবেদন বলছে, মাসে ৬০০ ডলারের বিনিময়ে ইরাকি তরুণদের নিয়োগ করা হচ্ছে। দ্য মিডিয়া লাইন এক ৩৭ বছরের ইরাকি যুবকের পরিবারের কথা তুলে ধরেছে, যিনি কাজের অভাবে এই প্রস্তাব গ্রহণ করে ইরানে যান, তারপর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সীমান্তে থাকা কর্মকর্তা আলি ডি জানান, এসব বাসে কেবল তরুণ পুরুষ। একই পোশাক, কোনও তীর্থযাত্রী থাকার লক্ষণ নেই।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সাঁজোয়া যান নিয়ে ইরানের শহরে টহল দিচ্ছে বাহিনী— যাদের ভাষা আরবি। ডেজফুল শহর থেকে পাঠানো এক বার্তায় দাবি করা হয়, শহর ‘হাশদ আল-শাবির অবরুদ্ধ’, স্নাইপাররা ছাদে দাঁড়িয়ে নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে। ইন্টারনেট বন্ধ, স্টারলিংক জ্যাম, ঘরে ঘরে তল্লাশি, সব মিলিয়ে তথ্য বাইরে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা চলছে।