
শেষ আপডেট: 16 October 2023 12:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: হিমপাত্রের ঢাকনাটা সেইমাত্র খুলেছেন রাব্বি। ভক করে তাঁর মুখে এসে লাগল একটা পচা, তীব্র দুর্গন্ধ! অন্য সময় হলে মুখ বিকৃত হয়ে যেত রাব্বির, নাকে চাপা দিয়ে সরে যেতেন সেখান থেকে। কিন্তু সেদিন সরলেন না। উল্টে প্রাণ ভরে শ্বাস নিলেন। কটু সেই গন্ধ প্রশ্বাসের সঙ্গে মিশে পেরিয়ে পৌঁছে গেল শরীরের ভিতর, ফুসফুস পর্যন্ত, ছড়িয়ে পড়েছে শিরায় শিরায়। এ গন্ধ যে তাঁর ভাইয়ের মৃত্যুর গন্ধ, তাঁর বোনের মৃত্যুর গন্ধ, তাঁরই সন্তানের মৃত্যুর গন্ধ, তাঁরই দেশের হাজার হাজার মানুষের মৃতদেহের গন্ধ। বাস্তব থেকে লুকিয়ে কেমন করে তা থেকে মুখে ফিরিয়ে নিতেন তিনি!
রাব্বি ইজরায়েল ওয়েজ ইজরায়েলের মিলিটারির প্রাক্তন প্রধান। তবে ৭ অক্টোবর হামাস যখন ইজরায়েলের শিশু বৃদ্ধ মহিলা নির্বিশেষে তাঁদের উপর অতর্কিত রকেট হামলা চালায়, তখনই তিনি বুঝে গেছিলেন, আর বিশ্রামে থাকার অবকাশ নেই তাঁর। তার পর থেকেই কাজে নেমেছেন রাব্বি। কী তাঁর কাজ? হামাসের হামলায় মৃত অন্তত ১৪০০ মানুষের মৃতদেহ, যা কিনা হিমপাত্রে বন্দি, তা শনাক্ত করা এবং তাঁদের শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা।
চিকিৎসক, ডেন্টিস্ট, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং স্বেচ্ছাসেবকদের একটি দল সূরা মিলিটারি বেসে এসে পৌঁছানো শয়ে শয়ে দেহের শনাক্তকরণে দিনরাত এক করে কাজ করে চলেছেন। হামাসের সেদিনের হামলার পর ৮দিন কেটে গেছে, তবুও মৃতদেহবাহী ঠান্ডা কন্টেনার এসে পৌঁছানো শেষই হচ্ছে না। সূরা মিলিটারি বেস ছাড়াও আরও ৪টি কেন্দ্রে এই কাজ চলছে। শেষকৃত্যের আগে দেহ শনাক্ত করার জন্য যখন তা কন্টেনার থেকে বের করা হচ্ছে, তখন তীব্র পচা দুর্গন্ধে টেকা দায় হচ্ছে। তাই কর্মীদের জন্য মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেই নির্দেশ মানেননি রাব্বি। 'আমি যখন কন্টেনারের দরজা খুলি, তখন ওই গন্ধ আমার নাকে এসে পৌঁছায়। আমি তখন বড় করে শ্বাস নিই, যাতে বুঝতে পারি, আমার দেশের মানুষকে কী অপরিসীম যন্ত্রণা সইতে হয়েছে মৃত্যুর আগে,' জানিয়েছেন রাব্বি।
মৃতদের মধ্যে রয়েছে অজস্র শিশু এবং মহিলা। হামাসের হামলা থেকে ছাড় পাননি তাঁরা। বয়স নির্বিচারে তাঁদের ধর্ষণ করা হয়েছে, নারকীয় নির্যাতন করা হয়েছে। 'এরকম ভয়াবহ ঘটনা আমি জীবনে দেখিনি। এক একটা কন্টেনারে অন্তত ৫০টা দেহ, তাদের কারও মুন্ডু নেই, কারও হাত-পা কেটে নেওয়া হয়েছে। একজন গর্ভবতী মহিলার দেহ দেখেছি, তাঁর গর্ভ ফাটিয়ে ফালাফালা করে বের করে এনে হত্যা করা হয়েছে শিশুকে। বেশিরভাগ মহিলাকেই ধর্ষণ করা হয়েছে,' জানিয়েছেন রাব্বি।
হামাস যদিও ধর্ষণ সহ অন্যান্য নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে ইজরায়েলের দাবি, শিশুদের বেঁধে রেখে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে। যেসব মানুষ প্রাণভয়ে এদিক ওদিক লুকিয়ে পড়েছিলেন, তাঁদের শেষ করে দিতে গ্রেনেড ছোড়া হয়েছিল বলে দাবি করেছে ইজরায়েল।
ডিএনএ নমুনা, আঙুলের ছাপ এবং দাঁতের রেকর্ড দিয়ে দেহ শনাক্তকরণের কাজ চলছে। এখনও পর্যন্ত মৃত ২৮৬ জন সৈনিকের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশকেই শনাক্ত করা গেছে। তবে সাধারণ নাগরিক যাঁরা এই হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের বেশিরভাগেরই পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে ইজরায়েল।