হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা। ইরানের আইআরজিসি সতর্ক করেছে, তেলের দাম ব্যারেলপিছু ২০০ ডলারেও পৌঁছতে পারে।

ছবি: এআই
শেষ আপডেট: 12 March 2026 08:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের (Iran USA Israel War) মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় জলপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি আরও তীব্র করে ইরানের আধাসামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে— এই পথ দিয়ে ‘এক লিটার তেলও’ যেতে দেওয়া হবে না (Global Oil Prices)।
আইআরজিসির খাতাম আল-আনবিয়া সদর দপ্তরের এক মুখপাত্র বুধবার জানান, আমেরিকা, ইজরায়েল বা তাদের মিত্রদের সঙ্গে যুক্ত যে কোনও জাহাজকে তারা ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচনা করবে। তাঁর দাবি, কৃত্রিমভাবে তেলের দাম কমিয়ে রাখা সম্ভব নয় এবং পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছতে পারে যে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ২০০ ডলারেও পৌঁছতে পারে। মুখপাত্রের কথায়, তেলের দাম নির্ভর করে আঞ্চলিক নিরাপত্তার উপর, আর সেই অস্থিরতার মূল উৎস হিসেবে তিনি আমেরিকা ও তাদের মিত্রদেরই দায়ী করেন।
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির জেরে বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে পদক্ষেপ নিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ)। সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের ৩২টি সদস্য দেশ জরুরি মজুত থেকে মোট ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়তে সম্মত হয়েছে, যাতে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। প্যারিসে আইইএ-র সদর দপ্তর থেকে সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল জানান, বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তার তাৎক্ষণিক প্রভাব কমানোর লক্ষ্যেই এই বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আইইএ-র বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সদস্য দেশগুলি নিজেদের সুবিধামতো সময়সূচি অনুযায়ী এই তেলের মজুত বাজারে ছাড়বে। যদিও বিস্তারিত সময়সারণি প্রকাশ করা হয়নি। ইতিমধ্যেই জার্মানি ও অস্ট্রিয়া জানিয়েছে, তারা জরুরি তেলের মজুতের একটি অংশ দ্রুত বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেবে। ভিয়েনা প্রশাসন আবার তাদের জাতীয় কৌশলগত গ্যাস মজুত বাড়ানোর কথাও ঘোষণা করেছে।
অন্যদিকে জাপান-এর অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রক জানিয়েছে, তারা সরকারি ও বেসরকারি মজুত মিলিয়ে প্রায় আট কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়বে। কারণ তাদের ব্যবহৃত প্রায় ৭০ শতাংশ তেলই এই জলপথ দিয়ে আসে। সোমবার থেকেই এই তেল ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে।
ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে শুরু হওয়া এই সংঘাত কত দিন চলবে তা নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। যুদ্ধ থামার কোনও ইঙ্গিত এখনও মেলেনি। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। তাই এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং উপসাগরীয় কিছু দেশে উৎপাদন কমে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলিও জানিয়েছে, বুধবার হরমুজ প্রণালীতে তিনটি জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেক্টাইল হামলার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ওমান উপকূলের উত্তরে প্রায় ১১ নটিক্যাল মাইল (১৮ কিলোমিটার) দূরে একটি থাই পতাকাবাহী কার্গো জাহাজে আঘাত হানে হামলা। জাহাজটি ভারতের কান্ডলা বন্দর-এর দিকে যাচ্ছিল।
এই সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব এবং তা মোকাবিলার উপায় নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু করেছে জি৭ দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন-সহ বিশ্বের বিভিন্ন নেতৃত্ব। কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়-এর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ক্রিশ্চিয়ান বুগার সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত যদি হরমুজ প্রণালী খুলে না দেওয়া হয়, তবে ইউরোপ বড় ধরনের জ্বালানি সঙ্কটে পড়তে পারে। তাঁর মতে, দ্রুত কোনও শক্তিশালী বার্তা না এলে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছতে পারে যেখানে শিপিং সঙ্কট কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।