
লিথুয়ানিয়ায় মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে সদ্য যোগ দেওয়া সৈন্যরা।
শেষ আপডেট: 21 July 2024 17:55
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শব্দটার সঙ্গে আমাদের পরিচিতি অল্পবিস্তর হলেও আছে। 'কনস্ক্রিপশন।' অর্থাৎ, বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে যোগদান। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন প্রথা। অথচ আজও বিভিন্ন উন্নত দেশে কনস্ক্রিপশনের নিয়ম রয়েছে। যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, ইজরায়েল, ব্রাজিল, তুরস্ক, কাজাখস্তান, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে বা সুইডেন। যাই হোক না কেন, বাধ্যতামূলকভাবে নির্দিষ্ট দিন সেনাবাহিনীতে কাজ করতে হবে। ধনী-গরীব, ধর্ম, জাতি, ভাষা কোনও কিছু দিয়েই আলাদা করা যাবে না। বস্তুত, দক্ষিণ কোরিয়ায় নিয়ম এমনই কড়া যে, দুই বছরের জন্য বিরতি নিয়ে সেনাদলে যোগ দিয়েছেন বিশ্ববিখ্যাত দক্ষিণ কোরীয় ব্যান্ড বিটিএসের সদস্যরা।
কিন্তু রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের প্রেক্ষিতে এবার সম্পূর্ণ নতুনভাবে কনস্ক্রিপশনের কথা ভাবছে ইউরোপ!
ইউরোপের অন্দরে যা খবর, তাতে ক্রমশই অতলান্তিক থেকে বাল্টিক সাগরের আকাশে ঘনিয়ে আসছে আশঙ্কার কালো মেঘ। সরকারিভাবে কোনও দেশই এখনও ঘোষণা করেনি। কিন্তু পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের একাধিক নেটো গোষ্ঠীর দেশ তলায় তলায় শুরু করে দিয়েছে প্রস্তুতি। কীসের? অধিকাংশ নেতা-মন্ত্রীরা মুখে কুলুপ আঁটলেও জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস কথাটা ঠারেঠোরে বলেই দিয়েছেন। "২০২৯ সালের মধ্যে আমাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে!"
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দৌলতে এবার ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে চলেছে ইউরোপ।
আশি বছর পেরোতে চলল। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাৎসি ইতিহাস এখনও তাড়া করে বেড়ায় জার্মানিকে। অতি যত্নে এখনও সেদেশে সংরক্ষণ করা হয় মানব ইতিহাসের জঘন্যতম অধ্যায়কে। যাতে এই ইতিহাস কেউ ভুলে না যায়, যাতে এই ইতিহাস থেকে কচিকাঁচারা অবধি শিক্ষা নিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে সেনাসজ্জা নিয়ে ছুঁতমার্গ ছিল জার্মানিতে। ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও সামরিক সাজসজ্জা নিয়ে বিশেষ উচ্চবাচ্য করত না বার্লিন। কিন্তু এবার কার্যত নজিরবিহীন পদক্ষেপ করতে চলেছে তারা। জানানো হয়েছে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে যোগদানের নিয়ম চালু করতে পারে বার্লিন।
ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসানের পর এতটা আশঙ্কা কখনও দেখেনি ইউরোপ। কিন্তু এবার তলায় তলায় কোমর বাঁধতে শুরু করেছে লাটভিয়া, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, পোল্যান্ড, রোমানিয়ার মত একাধিক দেশ। আশঙ্কা, ইউক্রেন দখল হয়ে গেলে সম্ভবত ভ্লাদিমির পুতিন হাত বাড়াবেন বৃহত্তর ইউরোপের দিকে। নিজেই একাধিকবার বলেছেন, হারিয়ে যাওয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের পূর্বতন গৌরব ফিরিয়ে আনা তাঁর লক্ষ্য। দেওয়ালের লিখনটাও পড়ে নিয়েছেন পুতিন। ইউরোপের সবচেয়ে বড় খুঁটির জোর ছিল আমেরিকা। বিপদে-আপদে নেটোর নামে বকলমে আমেরিকাই শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা ছাতা হয়ে দাঁড়াত ইউরোপের পাশে। এখনও পৃথিবীতে সামরিক শক্তিতে ওয়াশিংটনের ধারেকাছে কেউ নেই। চিন দ্বিতীয় স্থানে আছে, কিন্তু সেও অনেক পরে। পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে, যে কোনও শক্তিশালী দেশের মহড়া নিতে পারে মার্কিন সেনা।
এতদিন এই ভরসাতেই নিশ্চিন্ত ছিলেন ব্রাসেলসের কর্তারা। কিন্তু এইবার হোয়াইট হাউস টালমাটাল হতেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরা সিঁদুরে মেঘ দেখতে শুরু করেছেন। জো বাইডেনের ওপর ভরসা করা যাবে না। বয়স আশি পেরিয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে, আরও এক দফা রাষ্ট্রপতি থাকার জন্য ঠিক উপযুক্ত নন। এদিকে উল্টোদিকে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিছুদিন আগেই বিতর্কে যার কাছে বিব্রত হয়েছেন বাইডেন। কান ঘেঁষে গুলি বেরিয়ে যাওয়ার পর ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা লাফিয়ে বাড়ছে। এরপর হোয়াইট হাউসে তিনি ঢুকে পড়লে ক্রেমলিনে হয়ত পুতিন আলাদা করে একটা ভোজসভার আয়োজন করতে পারেন। এমনিতেই ট্রাম্প দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছেন পুতিনকে। তার ওপর যেভাবে বারবার 'আমেরিকা ফার্স্ট' বলে যাচ্ছেন, অর্থাৎ বকলমে যেভাবে 'আমেরিকার বাইরে কে কী করল তাতে আমেরিকার যায় আসে না' লাইন নামিয়েছেন, তাতে প্রায় রাতের ঘুম উড়েছে একাধিক ইউরোপীয় দেশে।
ব্রাসেলস, লন্ডন, প্যারিস, বার্লিনে জোর জল্পনা, ট্রাম্প একবার হোয়াইট হাউসে ঢুকে পড়লে ইউক্রেন ছাপিয়ে পুতিন সম্ভবত হানা দেবেন আরও পশ্চিমে। সরাসরি আশঙ্কার মুখে রয়েছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ ফিনল্যান্ড ও সুইডেন। এদিকে লাটভিয়াও তালিকার ওপরে রয়েছে। ২০০৬ সালে কনস্ক্রিপশন প্রথা বাতিল করেছিল লাটভিয়া। এই বছর থেকে আবার তারা সেটা চালু করে দিয়েছে। ১৮ বছর বয়স হলেই বারো মাসের জন্য বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে কাজ করতে হবে। এপ্রিল মাসে নরওয়ে জানিয়েছে, তারা নতুন সামরিক পরিকল্পনা হাতে নিতে চলেছে। যাতে দেশের প্রতিরক্ষা খাতে খরচ প্রায় দ্বিগুণ বাড়ানো যাবে। অন্তত ২০ হাজার অতিরিক্ত সদস্যকে সেনাবাহিনীকে নেওয়া যাবে। এমনিতেই নরওয়েতে এই বিধি ছিল। কিন্তু ২০১৫ সালে প্রথম নেটো দেশ হিসেবে পুরুষ ও মহিলা উভয়কে সমানভাবে সেনাতে যোগ দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে অসলো। লিথুয়ানিয়াতেও ছাত্র ইউনিয়নদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে।
ফিনল্যান্ড এবং সুইডেন এই নিয়ে দুটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী নীতি নিয়েছে। এমনিতে ফিনল্যান্ডের সেনাবাহিনীর সক্রিয় সদস্য সংখ্যা মাত্র ১৩ হাজার। কিন্তু তারা এমন এক অভিনব 'রিজার্ভিস্ট' বাহিনী গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে, যাতে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে এক লপ্তে ৯ লক্ষ সৈন্যের এক বিরাট বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত করে তোলা যাবে। যার অন্তত ২ লক্ষ ৮০ হাজার সেনা তৎক্ষণাৎ যুদ্ধে চলে যেতে পারবে।
সুইডেনে প্রতি বছর কনস্ক্রিপশন তালিকায় নাম তোলানোর তালিকা লম্বা হচ্ছে। এমনিতে সুইডেনেও বরাবর কনস্ক্রিপশন প্রথা ছিল। কিন্তু আগে সেসব মূলত তরুণদের ভাল চাকরি-বাকরি পেতে সিভিতে দেখানোর প্রথা ছিল। বস্তুত, প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের কর্তারাই এসব বলে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতেন। এখন কিন্তু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টেছে। সুইডিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রকের তরফে বলা হচ্ছে, সুইডেনকে বাঁচাতে হলে এখন তোমাদের এই কর্তব্য পালন করতেই হবে।