নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে বাঙালিদের দুর্গাপুজো যেন বিশ্বসংস্কৃতির মহামিলন, যেখানে মিলল চিন-জাপান-মেক্সিকোসহ বহু সংস্কৃতি।

নিউ জিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ দুর্গাপুজো।
শেষ আপডেট: 1 October 2025 14:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সুদূরের সে দ্বীপদেশের ডাক নাম অটেয়ারোয়া। যার অর্থ, "দীর্ঘ সাদা মেঘের দেশ। নিজের ভূপ্রাকৃতিক সৌন্দর্যের গুণে এই নামের মুকুট পড়েছে সে। কিন্তু গোটা বিশ্ব তাকে চেনে, নিউজিল্যান্ড নামেই। সেই দেশের বুকে, দক্ষিণের শহর ক্রাইস্টচার্চে বেজে উঠেছে ঢাক-কাঁসরের বাদ্যি। সেখানকার হ্যাগলি ওভালের সবুজ মাঠের পাশেই যেন জেগে উঠেছে এক টুকরো বাংলা। সেখানে মা দুর্গা আসেন কেবল বাঙালির আরাধ্যা দেবী রূপে নয়, তিনি আসেন এক সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের প্রতীক হয়ে।

নয়-নয় করে এভাবেই দশটা বছর পূর্ণ করল ক্রাইস্টচার্চের দুর্গাপুজো। এক দশক আগেও যে শহরে দুর্গোৎসবের আভাস ছিল না, আজ সেখানে পুজো হয়ে উঠেছে বহুজাতিক উৎসবের এক রঙিন ক্যানভাস। এই উৎসবের স্বীকৃতি আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে আন্তর্জাতিক সম্মান। ইউনেস্কোর Representative List of the Intangible Cultural Heritage of Humanity-তে এই দুর্গাপুজো জায়গা পেয়েছে স্বমহিমায়।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিশ্বসম্মান পাবে নাই বা কেন ক্রাইস্টচার্চের পুজো! এবারের কথাই ধরা যাক। উৎসবের শুরুতেই উপস্থিত সকলে যেন বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যান। কারণ একদল চিনা শিল্পী তাঁদের ঐতিহ্যবাহী লায়ন ডান্স পরিবেশন করে দেবী দুর্গার উদ্দেশে প্রণাম জানালেন। যেন সিংহাসনে বসা দুর্গা ও তাঁদের নৃত্যসিংহ একাকার হয়ে গেল।
শুধু তাই নয়, জাপানি দল তাঁদের 'তাইকো ড্রামিং'এর বজ্রগর্জন তুললেন বিশাল ঢোলে। সে বাজনার প্রতিটি আঘাতে যেন ধ্বনিত হচ্ছিল দেবীর আবাহন। সব মিলিয়ে, এশিয়া, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা থেকে আসা শিল্পীদের সমবেত সুর ও নৃত্যে নির্মাণ হল এমন এক আবহ, যেখানে দেশ-কাল-জাতি-ধর্মের সমস্ত সীমান্ত বিলীন হয়ে যায় উৎসবে, উৎসর্গে।

সমস্ত দর্শক-ভক্ত-আয়োজকদের বুকে যেন ধ্বনিত হল রবীন্দ্রনাথের সেই অমর আহ্বান—
“এসো হে আর্য, এসো হে অনার্য, হিন্দু মুসলমান,
এসো এসো আজ তুমি ইংরেজ, এসো এসো ক্রিশ্চান।”
পুজো শুরুর পর প্রথমেই মঞ্চে অনুষ্ঠিত হল “মহিষাসুর মর্দিনী” নৃত্যনাট্য। ৯ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৮০ বছরের প্রবীণ— সবার একসঙ্গে মঞ্চে উঠে আসা ছিল এক অপূর্ব দৃশ্য। শুধু নৃত্য নয়, সেখানে মিশে ছিল নিবেদনের আবেগ, সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা, আর একাত্মতার ছোঁয়া।
বার্নসাইড হাই স্কুলের তরুণ শিল্পীরা জ্যাজের সুরে মাতিয়ে তুললেন দর্শকদের। মেক্সিকান নৃত্যদল তাঁদের ছন্দে আনল রঙের ঝলকানি, শ্রীলঙ্কান শিল্পীরা ফুটিয়ে তুললেন সিংহলি সংস্কৃতির ঐতিহ্য। ভারতীয় বৈচিত্র্যের বাহার—বিহু, ভরতনাট্যম, কথাকলি, মারকথামণি, সব একসঙ্গে যেন উৎসবের ক্যানভাসে সংস্কৃতির এক রঙিন কোলাজ হয়ে উঠল।

আর সব শেষে যখন ভাঙরার ঢোল বাজল, তখন দর্শক-শিল্পী থেকে শুরু করে অতিথি, কেউই আর আসনে ধরে রাখতে পারেননি নিজেকে, সবাই মিলে মঞ্চকে পরিণত করলেন নৃত্যভূমিতে।
দুর্গাপুজো কি আদৌ সম্ভব মহাভোগ ছাড়া? সে পুজোর আয়োজনে যদি থাকেন বাঙালিরা, উত্তরটা এককথায় না। যতই প্রবাসজীবনের ছাপ দৃঢ় হোক না কেন, পুজোর সময় খাবার পাতে নো কম্প্রোমাইজ।
তাই খিচুড়ি, লাবড়া, আলুর দম, ভাজা, চাটনি, পাঁপড়, লাড্ডু, গুলাব জামুন, পায়েস— সব মিলিয়ে যেন গড়ে উঠল মায়ের অন্নপ্রসাদে ভরা অর্ঘ্য। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে এই স্বাদ যেন এক মুহূর্তে ফিরিয়ে নিল পাড়ার প্যান্ডেলের স্মৃতি।

ক্রাইস্টচার্চ বেঙ্গলি কমিউনিটি ইনকরপোরেটেড সোসাইটি যখন এই উৎসবের সূচনা করেছিল, উদ্যোক্তাদের স্বপ্ন ছিল একটাই—“Unity in Diversity”। বৈচিত্র্যের ভিতর ঐক্য খুঁজে বের করা, আর সব সংস্কৃতিকে এক ছাদের তলায় নিয়ে আসা।
কারণ দুর্গাপুজো একান্ত বাঙালির আবেগ হলেও, উৎসব সকলের। তাই এই পুজোয় যেমন কিউইদের অংশগ্রহণ রয়েছে, রয়েছে চিনের সিংহনাচ, জাপানের ঢোল, মেক্সিকোর ছন্দ, ভারতের নৃত্য ঐতিহ্য। সব মিলে যেন এক বিশ্বনাগরিক দুর্গোৎসব।
উৎসবের পরিধি প্রতি বছরই বড় হচ্ছে, বড় হচ্ছে আয়োজন। সকলের উচ্ছ্বাসও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। প্রতি বছরের মতো গড়ে উঠছে চিরপরিচিত সেই অঙ্গীকার— “আসছে বছরে আবার হবে।”