মোবাইল ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় আজ লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরে বসেই অভিজ্ঞ জ্যোতিষীদের পরামর্শ পাচ্ছেন, যা এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাকে আধুনিক রূপ দিয়েছে।

এআই দিয়ে বানানো ছবি
শেষ আপডেট: 8 September 2025 21:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশ্বজুড়ে অনলাইন জ্যোতিষচর্চায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, আর তার নেপথ্যে রয়েছে অ্যাস্ট্রোটক। মোবাইল ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় আজ লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরে বসেই অভিজ্ঞ জ্যোতিষীদের পরামর্শ পাচ্ছেন, যা এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাকে আধুনিক রূপ দিয়েছে।
ডিজিটাল যুগেও আধ্যাত্মিক পরামর্শ ও দিকনির্দেশনার গভীর চাহিদা যে অব্যাহত আছে, অ্যাস্ট্রোটকের সাফল্য তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। শুধু ভারত নয়, বিশ্বজুড়েই জ্যোতিষসেবার ধরণ পাল্টে দিচ্ছে এই প্ল্যাটফর্ম, যেখানে প্রযুক্তি আর প্রাচীন জ্ঞান একসাথে মিশে তৈরি করছে এক নতুন অধ্যায়।
অনলাইন জ্যোতিষের নতুন ধারা
একসময় জ্যোতিষীর কাছে সরাসরি উপস্থিত না হলে পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ ছিল না। এখন সেই জায়গা নিয়েছে মোবাইল অ্যাপ আর ওয়েবসাইট। অ্যাস্ট্রোটক (Astrotalk) এই পরিবর্তনের নেতৃত্বে দাঁড়িয়ে বিশ্বব্যাপী অনলাইন জ্যোতিষ পরিষেবার এক নতুন ধারা তৈরি করেছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জ্যোতিষসেবা এখন আরও সহজ, দ্রুত ও ব্যক্তিগত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, যারা প্রযুক্তির সঙ্গে স্বচ্ছন্দ, তারাই অনলাইন পরামর্শের দিকে ঝুঁকছে। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, মানসিক চাপ এবং জীবনের দিকনির্দেশনা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই এ প্রবণতার মূল কারণ।
অ্যাস্ট্রোটকের অভাবনীয় সাফল্য
২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত অ্যাস্ট্রোটক আজ ভারতের অন্যতম সফল স্টার্টআপ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এর অপারেটিং আয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫১ কোটি টাকা, আর নেট মুনাফা দশগুণ বৃদ্ধি পেয়ে পৌঁছায় ৯৪ কোটিতে।
এই সাফল্যের মূলে রয়েছে সহজলভ্যতা ও ব্যবহারকারীর চাহিদার সঙ্গে নিখুঁত সামঞ্জস্য। প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহারকারীদের রিয়েল-টাইমে যাচাই করা জ্যোতিষীদের সঙ্গে চ্যাট বা কলের মাধ্যমে সংযুক্ত করে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এর মোট আয়ের প্রায় ৯৫% আসে ব্যক্তিগত পরামর্শ থেকে।
ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও বৈশিষ্ট্য
অক্টোবর ২০২৪ পর্যন্ত অ্যাস্ট্রোটকের রেজিস্টার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৬০ মিলিয়ন। প্রতি মাসে প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন অর্থপ্রদানের সেশন পরিচালিত হয়। এখানে ১৫ হাজারেরও বেশি জ্যোতিষী যুক্ত আছেন।
ব্যবহারকারীদের মধ্যে মূলত ২৫–৩৪ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীরাই রয়েছেন। পুরুষের সংখ্যা ৫১.৫% এবং মহিলার সংখ্যা ৪৭.৫%। অধিকাংশই উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির এবং তারা চ্যাট-ভিত্তিক পরামর্শকেই অগ্রাধিকার দেন।
বিয়ে, সম্পর্ক ও কর্মজীবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তরুণরা এখানে পরামর্শ নেন। ভারতে আনুষ্ঠানিক পেশাদার বা বিবাহ-পরামর্শ সহজলভ্য না হওয়ায় অ্যাস্ট্রোটকের মতো প্ল্যাটফর্ম জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তি ও অ্যাডভান্সড জ্যোতিষ
অ্যাস্ট্রোটক শুধু প্রাচীন জ্ঞানের উপর নির্ভর করছে না। এআই, মেশিন লার্নিং ও বিগ ডেটার মতো প্রযুক্তির ব্যবহার এটিকে দিয়েছে এক ভিন্নমাত্রা। জন্মছক, গ্রহের অবস্থান ও নক্ষত্রের গতিপথ দ্রুত ও নির্ভুলভাবে বিশ্লেষণ করছে এ প্ল্যাটফর্ম।
এআই-চালিত চ্যাটবট ও ভার্চুয়াল জ্যোতিষীরা ২৪ ঘণ্টা, সাত দিন পরামর্শ দিচ্ছে। বিগ ডেটা-ভিত্তিক পূর্বাভাস রাশিফলকে আরও নির্ভরযোগ্য করছে। ফলে ব্যবহারকারীরা পাচ্ছেন ব্যক্তিগতকৃত ও ডেটা-সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা।
অ্যাস্ট্রোটক কমিশন-ভিত্তিক মডেল অনুসরণ করে, যেখানে প্রতিটি পরামর্শের লেনদেন থেকে নির্দিষ্ট শতাংশ আয় করে। প্রতি মিনিটের চার্জ ৫ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত।
নতুন ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করতে ‘প্রথম চ্যাট ফ্রি’ মডেল ব্যবহার করা হয়। এর পাশাপাশি বিনামূল্যে রাশিফল, কুন্ডলী ম্যাচিং, পূজা পরিষেবা এবং ই-কমার্সে রত্নপাথর-সহ আধ্যাত্মিক সামগ্রী বিক্রিও করছে।
ভারত ছাড়িয়ে অ্যাস্ট্রোটক আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে। বর্তমানে এর আয়ের প্রায় ২০% আসে বিদেশ থেকে। কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য, ব্রিটেন ও আমেরিকায় তাদের উপস্থিতি বিস্তারের পরিকল্পনা চলছে।
সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক-ভিত্তিক ভেনচার ক্যাপিটাল ফার্ম Left Lane Capital থেকে ২০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন পেয়েছে অ্যাস্ট্রোটক। এই তহবিল আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ, নতুন পরিষেবা এবং নেতৃত্ব বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হবে।
প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও পুনিত গুপ্তার লক্ষ্য, ২০২৬ সালের মধ্যে IPO-তে প্রবেশ এবং তার আগেই আয় ২,০০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা।
রেডসিয়ার স্ট্র্যাটেজি কনসালট্যান্টস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের অনলাইন জ্যোতিষ বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে দশগুণ বাড়তে পারে। ২০২১ সালে এর আকার ছিল ১২.৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩১ সালে ২২.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছনোর সম্ভাবনা।
অতিমারী পরবর্তী সময়ে অনলাইন জ্যোতিষের চাহিদা আরও বেড়েছে। স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রসার, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সহজলভ্যতা এবং তরুণ প্রজন্মের চাহিদা এই বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করছে।
এখন আর জ্যোতিষশাস্ত্র বইয়ের পাতা বা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং সোশ্যাল মিডিয়া, অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এটি বিশ্বজুড়ে মানুষের হাতের মুঠোয় পৌঁছে যাচ্ছে।