জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী গ্রহের অশুভ প্রভাব কাটাতে নানা প্রতিকার মানা হয়। কিন্তু এগুলি কতটা কার্যকর? সত্যিই কি ভাগ্যের চাকা ঘোরানো যায় জ্যোতিষীয় উপায়ে?

শেষ আপডেট: 23 August 2025 12:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বর্তমান অস্থির সময়ে মানুষ নিজের ভাগ্যকে ঘোরানোর জন্য নানান উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে। সেই সব উপায়ের মধ্যে জ্যোতিষশাস্ত্র (Astrology) এবং গ্রহের প্রতিকার বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। রত্ন ধারণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পূজা-পাঠ—ভালো ভবিষ্যতের আশায় অনেকেই এই উপায়গুলোতে আশ্রয় নেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি এই জ্যোতিষীয় প্রতিকারগুলো মানুষের জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারে? নাকি এগুলি কেবল বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রথা?
জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রাচীন ইতিহাস ও গুরুত্ব
মানবসমাজে জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চা প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। ভারতীয় উপমহাদেশে সিন্ধু সভ্যতার সময়কাল থেকে এর অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে। বেদাঙ্গ জ্যোতিষ, যা প্রায় ১৪০০-১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রচিত প্রাচীনতম গ্রন্থগুলির একটি, সেখানে সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র ও চান্দ্র-সৌর ক্যালেন্ডারের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীন যুগে যজ্ঞের শুভ সময় নির্ধারণে জ্যোতিষশাস্ত্রের ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। হিন্দু জ্যোতিষশাস্ত্র (Astrology) বেদের একটি সহায়ক শাখা। এর মূল ভিত্তি হলো মানুষ ও মহাবিশ্বের মধ্যে অটুট সংযোগের ধারণা। প্রাচীনকালে জ্যোতিষশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞানকে একসঙ্গে দেখা হলেও সপ্তদশ শতকের পর থেকে দুটি আলাদা শাখা হিসেবে চিহ্নিত হয়। আজকের দিনে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিজ্ঞানের অংশ, আর জ্যোতিষশাস্ত্রকে অনেকেই ছদ্মবিজ্ঞান মনে করেন। তবুও এর প্রতি মানুষের বিশ্বাস আজও অটুট।
জ্যোতিষ প্রতিকার কী এবং কেন প্রয়োজন হয়
জ্যোতিষশাস্ত্র মূলত গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে মানুষের ভাগ্য বিশ্লেষণ করে। জীবনে ব্যর্থতা, হতাশা বা নেতিবাচকতা দেখা দিলে অনেকেই জ্যোতিষীর শরণাপন্ন হন। জন্মপত্রিকা বিশ্লেষণ কিংবা হস্তরেখা দেখে জ্যোতিষীরা ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দেন এবং প্রতিকারের পরামর্শ দেন।
প্রতিকার বলতে বোঝায়—গ্রহের অশুভ প্রভাবকে শান্ত করা বা নিরসন করার উদ্দেশ্যে বিশেষ নিয়ম বা পদ্ধতি অনুসরণ করা। কারও জীবনে শারীরিক, মানসিক, আর্থিক বা দাম্পত্য সমস্যা দেখা দিলে, জন্মছকের দুর্বল গ্রহ অবস্থানের কারণে জ্যোতিষীরা প্রতিকারের দিশা দেখান।
প্রচলিত জ্যোতিষ প্রতিকার
জ্যোতিষশাস্ত্রে নানা প্রতিকারের উল্লেখ আছে। অনেকগুলো খুব সহজে বা অল্প খরচেই করা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
রত্ন ধারণ: নির্দিষ্ট গ্রহের শক্তি বৃদ্ধির জন্য বিশেষ রত্ন যেমন রুবি, পান্না, মুক্তা, পোখরাজ ইত্যাদি ধারণ করা হয়। তবে অযথা রত্ন ধারণ করলে উপকারের বদলে ক্ষতিও হতে পারে।
গাছের মূল ধারণ: সূর্যের জন্য বেল গাছের শিকড়, চন্দ্রের জন্য খেজুরের মূল, মঙ্গলের জন্য খয়ের গাছ, বুধের জন্য বৃহদ্বারক, বৃহস্পতির জন্য কলা গাছ, শুক্রের জন্য রামবাসক, শনির জন্য লজ্জাবতী, রাহুর জন্য সাদা চন্দন, কেতুর জন্য অশ্বগন্ধার মূল ধারণ করা হয়।
মন্ত্রপাঠ ও পূজা: রবির জন্য সূর্যপ্রণাম, চন্দ্রের জন্য শিবপূজা, মঙ্গলের জন্য হনুমান চালিশা, বুধের জন্য শ্রীবিষ্ণু বা গণেশ পূজা, বৃহস্পতির জন্য ব্রাহ্মণ সেবা, শুক্রের জন্য পরিচ্ছন্নতা, শনির জন্য শনি পূজা, রাহুর জন্য দুর্গাপূজা এবং কেতুর জন্য গণেশ পূজা করা হয়।
দান: দুঃস্থদের সাহায্য বিশেষত রাহুর অশুভ প্রভাব কমাতে কার্যকর বলে মনে করা হয়।
জীবনযাপনে পরিবর্তন: মা-বাবা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের সেবা, পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন, হলুদ বা নীল রঙের পোশাক ব্যবহার ইত্যাদি অভ্যাসও শুভ প্রভাব আনতে পারে।
বিজ্ঞান বনাম জ্যোতিষশাস্ত্র
জ্যোতিষশাস্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মতভেদ রয়েছে। অনেকে এটিকে কেবল ছদ্মবিজ্ঞান বলে উড়িয়ে দেন। তাঁদের মতে, কোনো নিয়ন্ত্রিত বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জ্যোতিষশাস্ত্রের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়নি। ১৯৭৫ সালে দ্য হিউম্যানিস্ট পত্রিকায় বহু বিজ্ঞানী প্রকাশ্যে জ্যোতিষশাস্ত্রের বিপক্ষে অবস্থান নেন। বিজ্ঞানী কার্ল সেগানও তাঁর প্রামাণ্যচিত্রে এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তবে সমর্থকরা বলেন, চাঁদ-সূর্যের প্রভাবে যেমন পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা হয়, তেমনি গ্রহ-নক্ষত্রও মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁদের মতে, জ্যোতিষশাস্ত্র এক প্রাচীন বিদ্যা, যেখানে বিজ্ঞান, গণিত ও আধ্যাত্মিকতা মিলেমিশে আছে।
মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
জ্যোতিষ প্রতিকারের একটি বিশেষ দিক হলো এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। প্রতিকার গ্রহণ করলে মানুষের মনে আশার সঞ্চার হয়। জ্যোতিষীর আশ্বাস হতাশাকে দূর করে আত্মবিশ্বাস জাগায়। অনেক সময় এটি ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত যেমন আত্মহত্যার মতো প্রবণতাকেও থামিয়ে দেয়। তাই জ্যোতিষশাস্ত্রকে অনেকেই মানসিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির উৎস মনে করেন।
প্রতিকার সবসময় কাজে দেয় না কেন
প্রতিকার গ্রহণ করার পরও অনেক সময় সমস্যার সমাধান হয় না। এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে—
ভুল প্রতিকার নির্বাচন,
জন্মছক অনুযায়ী সঠিক বিশ্লেষণ না হওয়া,
কিংবা বাস্তু দোষ।
উদাহরণস্বরূপ, সন্তানের পড়াশোনায় সমস্যা হলে জ্যোতিষ প্রতিকার নেওয়ার পরও উন্নতি নাও হতে পারে, যদি বাড়ির পূর্ব কোণে বাস্তু দোষ থেকে যায়। কারণ পূর্ব দিক বৃহস্পতির দিক, যা শিক্ষা-সংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত। সেক্ষেত্রে জ্যোতিষ প্রতিকারের পাশাপাশি বাস্তু প্রতিকারও প্রয়োজন হয়।
('দ্য ওয়াল' এই বিষয়বস্তুর প্রচারক নয়; এটি কেবল তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে।)