দিনে সক্রিয় এডিস মশা ডেঙ্গি ছড়ায়। সচেতনতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও দ্রুত পরীক্ষা-ই এই প্রাণঘাতী রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার মূল উপায়। সতর্ক করছেন ডা. জয়দীপ ঘোষ।

Dr Joydeep Ghosh, Consultant, Internal Medicine, Fortis
শেষ আপডেট: 20 August 2025 19:54
কলকাতা: প্রতিদিন আমাদের আশেপাশে ঘুরে বেড়ানো ছোট্ট এক পতঙ্গ—মশা। অথচ সেই ছোট্ট মশার কামড়েই প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ ভুগছেন; ডেঙ্গি (Dengue), ম্যালেরিয়া (Malaria), চিকুনগুনিয়া (Chikungunya) বা জিকা (Zika virus), ইত্য়াদির মতো প্রাণঘাতী রোগে।
ওয়ার্ল্ড মস্কিটো ডে (World Mosquito Day) উপলক্ষে ফোর্টিস (Fortis) হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ মেডিসিন বিভাগের পরামর্শদাতা ডা. জয়দীপ ঘোষ (Dr. Jaydeep Ghosh) জানালেন, বর্তমানে ডেঙ্গির সংক্রমণ ভয়াবহ হারে বাড়ছে, এবং সাধারণ মানুষের উচিত এখনই সতর্ক হওয়া।
সঠিক সময় ও লক্ষ্য
ডা. ঘোষ বলেন, “এডিস মশা (Aedes mosquito) সাধারণ মশার মতো রাতে কামড়ায় না। ওরা দিনে কামড়ায়—বিশেষ করে সূর্য ওঠার পর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত এবং বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা অবধি। তাই যারা ভাবছেন মশারি দিলেই চলবে, তারা ভুল করছেন।” তিনি আরও জানান, হাত, পা, গোঁড়ালি—এই খোলা জায়গাগুলিতেই এদের নিশানা বেশি। তাই দিনের বেলাতেও ফুলহাতা জামা-প্যান্ট পরা উচিত।
জ্বর এলেই পরীক্ষা করান, বাড়বে বিপদ
মশার কামড়ের কয়েকদিনের মধ্যে যদি উচ্চ জ্বর (Fever), মাথা ও গাঁটে ব্যথা, বা র্যাশ হয়, তা হলে দেরি না করে রক্ত পরীক্ষা করিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিলেন তিনি। তাঁর সংযোজন, “ডেঙ্গুর অন্যতম বিপজ্জনক দিক হলো প্লেটলেট (Platelet) কমে যাওয়া। তখন রোগীর রক্তে জমাট বাঁধার ক্ষমতা কমে যায়, ফলে দেখা দিতে পারে ঘাম, নাক, প্রস্রাব বা মলের সঙ্গে রক্তপাত। কিছুক্ষেত্রে রোগীকে ICU-তেও ভর্তি করতে হয়।”
মশার ঠিকানা, আপনারই ঘর
ডা. ঘোষ জানালেন, “এডিস মশা জমা জলেই জন্মায়। তাই বাড়ির আশেপাশে ফুলদানি, ফ্রিজের পিছনে বা ড্রেনের কাছে জমে থাকা জল সপ্তাহে অন্তত একবার ফেলে দেওয়া দরকার। টবের নিচে প্লেট থাকলে সেটাও পরিষ্কার রাখুন।” তিনি আরও বলেন, ঘরে থাকা অবস্থাতেও মশা তাড়ানোর ব্যবস্থা রাখা উচিত—যেমন লিকুইড মেশিন, মশারি, অথবা প্রাকৃতিক উপায় যেমন তুলসী, লেবু ঘাস ইত্যাদি।
প্রতিরোধের মূল মন্ত্র
আজকাল নতুন কিছু প্রযুক্তি যেমন মশা তাড়ানোর স্মার্ট ডিভাইস, ক্লিপ-অন রেপেলেন্ট, UV লাইট মেশিন ইত্যাদি এসেছে। কিন্তু ডা. ঘোষের মতে এগুলো সহায়ক হলেও বিকল্প নয়। “প্রতিরোধে প্রথম শর্ত—পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা (Cleanliness) ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা (Personal protection)। আর দ্বিতীয়টি—জ্বর হলে অবহেলা নয়। আজ যা হালকা ঠান্ডা মনে হচ্ছে, কাল সেটা ICU অবধি নিয়ে যেতে পারে।”
একটি সতর্কবার্তা
শেষ কথা বলতে গিয়ে ডা. জয়দীপ ঘোষ মনে করিয়ে দিলেন এক নির্মম সত্যি—“আমরা প্রতিদিন হাজারো ছোট জিনিস এড়িয়ে চলি—একটা পিঁপড়ের কামড়, একটা সিঁড়ি না মুছে রাখা, কিংবা একটা মশার কামড়। কিন্তু কখন যে এই অবহেলাই মৃত্যুর দুয়ার খুলে দেয়, তা আমরা বুঝি না। তাই ডেঙ্গির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটাই মন্ত্র—‘প্রতিরোধই শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা।’”
আপনার প্রস্তুতি ঠিক আছে তো?
🔲 জানালা-দরজায় মশারি বা জাল আছে?
🔲 বাড়িতে কোথাও জল জমে আছে?
🔲 দিনে বা সন্ধ্যায় ফুলহাতা জামা পরছেন?
🔲 শিশুদের মশা থেকে রক্ষা করছেন?
🔲 জ্বর হলে একদিনও দেরি না করে রক্ত পরীক্ষা করাচ্ছেন?
এই ওয়ার্ল্ড মস্কিটো ডে-তে প্রত্যেকের উচিত নিজের ঘর থেকে যুদ্ধ শুরু করা, কারণ সচেতনতার এই যুদ্ধেই রয়েছে জয়। জীবন বাঁচাতে বড় অস্ত্র গুলি নয়, বরং সচেতনতা। মশার এক কামড় আপনার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে—কিন্তু সচেতন হলে, আপনি নিজেই হয়ে উঠবেন নিজের রক্ষাকর্তা।