শীতকালে নাক বন্ধ, মাথাব্যথা বাড়ছে? সাইনুসাইটিস কেন হয়, কারা ঝুঁকিতে, কখন চিকিৎসা জরুরি—জানুন বিস্তারিত প্রতিবেদনে।

শীতের শত্রু সাইনাস
শেষ আপডেট: 30 December 2025 18:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শীত পড়লেই অনেকের দিন শুরু হয় ভারী মাথা, নাক বন্ধ হয়ে থাকা, চোখের চারপাশে চাপ আর মুখভরা অস্বস্তি নিয়ে। প্রথমে মনে হয় সাধারণ সর্দি-কাশি। কিন্তু দিন গড়ায়, উপসর্গ কমার বদলে বাড়ে। তখনই ধরা পড়ে—এটা আসলে সাইনুসাইটিস।
সাইনুসাইটিস এমন এক সমস্যা, যা নাকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ধীরে ধীরে তা প্রভাব ফেলে মাথা, চোখ, গলা এমনকি দৈনন্দিন জীবনযাত্রাতেও। আর শীতকালে এই সমস্যার বাড়বাড়ন্ত নতুন কিছু নয়। চিকিৎসকেরাও বলছেন, বছরের এই সময়টায় সাইনুসাইটিসের রোগী উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়।
আমাদের নাকের চারপাশে, কপাল, গাল ও চোখের নীচে বাতাসে ভরা কিছু ফাঁপা গহ্বর থাকে। এগুলিকেই বলা হয় সাইনাস। স্বাভাবিক অবস্থায় এই সাইনাসের ভেতরে বাতাস চলাচল করে এবং সামান্য শ্লেষ্মা বেরিয়ে আসে নাক দিয়ে। কিন্তু কোনও কারণে যদি সেই পথ বন্ধ হয়ে যায়, ভেতরে শ্লেষ্মা জমে গিয়ে সংক্রমণ তৈরি হয়। তখনই শুরু হয় সাইনুসাইটিস।
এই সংক্রমণ ভাইরালও হতে পারে, ব্যাকটেরিয়ালও হতে পারে। কখনও আবার অ্যালার্জি বা নাকের গঠনগত সমস্যার জন্যও সাইনাসে সমস্যা তৈরি হয়।
সাইনুসাইটিস হলে নাক দিয়ে ঘন সর্দি পড়া বা নাক পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া খুবই সাধারণ উপসর্গ। তার সঙ্গে যুক্ত হয় কপাল, গাল বা চোখের চারপাশে চাপের মতো ব্যথা। অনেকের ক্ষেত্রে মাথাব্যথা এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে ঝুঁকে কাজ করা বা শুয়ে পড়াও কষ্টকর হয়ে ওঠে।
গলা ব্যথা, কাশি, মুখে দুর্গন্ধ, ঘ্রাণশক্তি কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। সর্দি সেরে গেলেও যদি এই উপসর্গগুলি থেকে যায়, তাহলে সেটাকে আর সাধারণ ঠান্ডা বলে ভুল করা উচিত নয়।
শীতকালের বাতাস সাধারণত শুষ্ক হয়। এই শুষ্কতা নাকের ভেতরের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়। ফলে নাকের ভেতরের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ঠান্ডা বাতাসে সাইনাসের মুখের চারপাশের শ্লেষ্মা ঘন হয়ে যায়, সহজে বেরোতে পারে না। জমে থাকা এই শ্লেষ্মাই সংক্রমণের আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।
এছাড়া শীতকালে সর্দি-কাশির প্রকোপ বেশি থাকে। ভাইরাল সংক্রমণ থেকেই অনেক সময় সাইনুসাইটিসের সূত্রপাত হয়। ঘরের জানালা-দরজা বন্ধ রেখে থাকার প্রবণতা, কম রোদ পাওয়া, দূষণ—সব মিলিয়ে শীতকাল সাইনুসাইটিসের জন্য একেবারে উপযুক্ত সময়।
যাঁদের অ্যালার্জির সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সাইনুসাইটিস বারবার ফিরে আসতে পারে। নাকের পলিপ, নাকের হাড় বাঁকা থাকা (ডেভিয়েটেড সেপটাম) বা দীর্ঘদিনের সর্দি-কাশির ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকি বাড়ে। ধূমপান বা ধোঁয়ার পরিবেশে থাকা মানুষজনের ক্ষেত্রেও সাইনাসের সমস্যা বেশি দেখা যায়।
অনেকে আবার নিজের ইচ্ছেমতো অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে ফেলেন। এতে সাময়িক আরাম মিললেও ভবিষ্যতে সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে।
চিকিৎসকদের মতে, সব সাইনুসাইটিসে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। ভাইরাল সাইনুসাইটিসে অ্যান্টিবায়োটিক কোনও কাজই করে না। বরং অযথা খেলে শরীরের ক্ষতি হতে পারে।
সঠিক কারণ নির্ণয় করেই চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। কখনও নাক পরিষ্কার রাখা, স্টিম নেওয়া, অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণ করলেই উপসর্গ অনেকটাই কমে যায়।
যদি ৭–১০ দিনের বেশি সময় ধরে উপসর্গ থাকে, যদি চোখ বা মুখ ফুলে যেতে শুরু করে, জ্বরের সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা হয় বা বারবার একই সমস্যা ফিরে আসে—তাহলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
অনেকেই ভেবে নেন, একবার সাইনুসাইটিস হলে বুঝি সারাজীবন ভুগতেই হবে। বাস্তবটা কিন্তু তা নয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা, কারণ অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং কিছু জীবনযাত্রার পরিবর্তন—এই তিনটে ঠিক থাকলেই সাইনুসাইটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
শীত এলেই নাক-মাথার যন্ত্রণা সহ্য করে বসে থাকার কোনও দরকার নেই। শরীরের এই সংকেতগুলোকে গুরুত্ব দিন। ঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসাই পারে শীতের এই নাক-যন্ত্রণাকে কাবু করতে।