খাবারের 'চয়েস' সঠিক হলেও সঠিক সময়ে খাচ্ছেন তো? সেটাতেই এখন বেশি করে গুরুত্ব দিচ্ছেন চিকিৎসক থেকে শুরু করে পুষ্টিবিদরা।

শেষ আপডেট: 27 January 2026 20:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আপনি কী খাচ্ছেন, ডায়েটে কী রাখবেন, এসব প্রশ্নই এতদিন ছিল স্বাস্থ্যচর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণাতে আরও বেশি করে গুরুত্ব পাচ্ছে একটি বিষয় - খাবারের 'চয়েস' সঠিক হলেও সঠিক সময়ে খাচ্ছেন তো? সেটাতেই এখন বেশি করে গুরুত্ব দিচ্ছেন চিকিৎসক থেকে শুরু করে পুষ্টিবিদরা (why dinner time matters more than diet)।
এই বিষয়টি সম্প্রতি তুলে ধরেছেন ক্যালিফোর্নিয়ার গ্যাসট্রোএন্টারোলজিস্ট সৌরভ শেঠী। হার্ভার্ড, স্ট্যানফোর্ড ও AIIMS-এ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই চিকিৎসক সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টে লেখেন, “আপনার ডিনারের সময় হয়তো আপনি রাতের খাবারে কী খাচ্ছেন, তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ (early dinner benefits)।”
প্রসঙ্গত, প্রাচীন ভারতে মানুষ সাধারণত সন্ধ্যার আগেই রাতের খাবার সেরে ফেলতেন। সূর্যাস্তের আগেই খেতে হবে দিনের শেষ খাবার, এটাই রীতি। এর পিছনে একাধিক কারণ ছিল - শরীরের স্বাভাবিক সার্কেডিয়ান রিদমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা, মেটাবলিজম ও অন্ত্রের স্বাস্থ্য বজায় রাখা। তখন বিষয়টি আরও সহজ ছিল কারণ, সেই সময় ইলেকট্রিসিটির মতো আধুনিক সুযোগসুবিধা সুবিধা ছিল না।
দেরিতে ডিনার করলে শরীরের কী ক্ষতি হয়?
ডা. সৌরভ শেঠীর মতে, রাতে দেরিতে খাওয়ার (late night eating) প্রভাব শুধু অন্ত্রেই পড়ে না, পাশাপাশি ইনসুলিন সেনসিটিভিটিও কমে যায়।
দেরিতে খেলে -
ডাক্তারের কথায়, “এটা হয় কারণ শরীর যখন নিজেকে 'রিপেয়ার ও ডিটক্স' করার কথা, তখনও হজমের কাজ চলতে থাকে। সেই জন্যই অনেক সময় ৮ ঘণ্টা ঘুমোনোর পরেও সকালে শরীর ভারী লাগে, পেট ফাঁপা থাকে বা ক্লান্তি কাটে না।”
কেন রাতের খাবারের থেকেও খাবারের সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিনে প্রকাশিত একটি গবেষণার উল্লেখ করে ডা. শেঠী জানান, সন্ধ্যার দিকে তাড়াতাড়ি ডিনার সেরে ফেলতে পারলে শরীরে একাধিক ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়।
আগেভাগে ডিনার করলে -
ঘুমের মান ভাল হয়
উল্লেখ্য, যদি দেরিতে আর তাড়াতাড়ি ডিনারের ক্যালোরি একই থাকে, তাহলেও শরীর সেই বাড়তি ক্যালোরি 'ম্যানেজ' করে নিতে পারে। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডাঃ শেঠী বলেন, “সূর্যাস্তের পর স্বাভাবিকভাবেই মেলাটোনিন বাড়তে থাকে এবং ইনসুলিন নিঃসরণ কমতে থাকে। এর ফলে রাতে ঘুমে প্রভাব পড়ে এবং শরীরে অতিরিক্ত ফ্যাট জমার প্রবণতা বাড়ে।”
মাত্র দেড় ঘণ্টার ব্যবধানেই বদলে যেতে পারে ফলাফল
ডা. শেঠীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ডিনারের সময়ের পার্থক্য মাত্র আড়াই ঘণ্টা হলেও শরীরের উপর তার বড় প্রভাব পড়ে।
কেউ যদি সন্ধ্যা ৭টায় ডিনার করেন, তাঁর ঘুম ভাল হয় এবং সুগার স্পাইক স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু যদি শেষ খাবার হয় রাত সাড়ে ৯টায়, তাহলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ডায়াবেটিসে ভুগছেন বা প্রি-ডায়াবেটিক এবং ফ্যাটি লিভারের সমস্যা যাঁদের আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুতর। দেরিতে ডিনার করলে তাঁদের সুগার স্পাইক ৩০% থেকে ৫০% পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
এই কারণেই ডা. শেঠীর মন্তব্য, “প্রিডায়াবেটিস, ডায়াবেটিস এবং ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে হরমোন ও সুগার নিয়ন্ত্রণে আগেভাগে ডিনার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
আয়ুর্বেদও বলে, সূর্যাস্তের পর হজমের ‘আগুন’ ধীরে ধীরে কমে যায়, ফলে খাবার ঠিকমতো প্রক্রিয়াকরণ শরীরের পক্ষে কঠিন হয়ে ওঠে। আধুনিক বিজ্ঞানও আজ সেই কথাই বলছে। একাধিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, গভীর রাতে খাওয়া বা মাঝরাতের স্ন্যাকিংয়ের তুলনায় আগেভাগে ডিনার অন্ত্রের জন্য অনেক বেশি উপকারী।
সবশেষে চিকিৎসকের পরামর্শ, লাইফস্টাইলে চরম বদলের দরকার নেই। শুধু শরীরের স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চললেই যথেষ্ট। তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেলে শুধু জীবনযাত্রার মানই উন্নত হবে না, ঘুমের প্যাটার্ন ঠিক হবে, শরীর ভাল থাকবে, পাশাপাশি কয়েকটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।