ইন্টারনেট নানারকম অলৌকিক ব্যাখ্যা দিলেও বাস্তব কারণটা অনেক বেশি বৈজ্ঞানিক এবং তাতে একেবারেই কোনও গভীর রহস্য লুকিয়ে নেই।

শেষ আপডেট: 2 March 2026 16:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাত তিনটে। চারপাশে স্তব্ধতা। হঠাৎই ঘুম ভেঙে গেল (waking up at 3 AM)। বাথরুম যাওয়ার দরকার এমনও নয়, জলতেষ্টাও পায়নি, তবু চোখ আর বন্ধ হচ্ছে না (night awakening)। অনেকেই বিছানায় এদিক ওদিক করে বাকি রাতটা কাটিয়ে দেন (insomnia)। এমন অভিজ্ঞতার কথা প্রায়ই শোনা যায়। ইন্টারনেটে এই সময়টাকে কেউ বলেন ‘উইচিং আওয়ার’, কেউ আবার জুড়ে দেন নানা অলৌকিক ব্যাখ্যা।
কিন্তু বাস্তব কারণটা অনেক বেশি বৈজ্ঞানিক এবং তাতে একেবারেই কোনও গভীর রহস্য লুকিয়ে নেই (night awakening causes)।
দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন স্লিপ মেডিসিন (sleep medicine) ও পেডিয়াট্রিক নিউরোলজির চিকিৎসক ক্রিস্টোফার যে অ্যালেন তাঁর সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টে এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানান, রাতের ওই নির্দিষ্ট সময়ে শরীরের একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াই এর পিছনে কাজ করে, যার জন্যই কোনও 'নির্দিষ্ট কারণ' ছাড়াই ঘুম ভেঙে যেতে পারে।
তবে চমকে ওঠার আগে বিষয়টি পুরোটা বোঝা দরকার। আর তার সঙ্গে জানা দরকার, ঘুম ভেঙে গেলে কীভাবে আবার ঘুমিয়ে পড়া যায়।
কেন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়?
ড. অ্যালেন স্পষ্ট করে বলছেন, এটা মোটেই কাকতালীয় নয়। এর পিছনে রয়েছে শরীরের প্রাকৃতিক স্ট্রেস সিস্টেম। আর একজন মানুষের দৈনন্দিন মানসিক চাপের মাত্রা নির্ধারণ করে দেয় সে ওই সময়ে জেগে উঠবে, নাকি ঘুমের মধ্যেই প্রক্রিয়াটি পার করে দেবে। অর্থাৎ, আপনি যত বেশি স্ট্রেসে থাকবেন, তত বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠবেন রাতের এই স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের প্রতি।
ড. অ্যালেনের কথায়, “রাত প্রায় ২টো থেকে ৪টের মধ্যে শরীর কর্টিসল নামে একটি হরমোন নিঃসরণ করে। কর্টিসলকে ভাবতে পারেন মস্তিষ্কের ‘ওয়েক-আপ ক্রু’ হিসেবে। এটি ধীরে ধীরে শরীরকে সকালের জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করে, বিভিন্ন সিস্টেমকে আস্তে আস্তে চালু করে।”
এই প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক। অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এটি ধীরে ধীরে ঘটে এবং তারা ঘুমের মধ্যেই তা পেরিয়ে যায় (cortisol hormone at night)। কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন স্ট্রেসের মাত্রা বেশি থাকে।
ড. অ্যালেন ব্যাখ্যা করছেন, “যাদের স্ট্রেস বেশি, তাদের ক্ষেত্রে কর্টিসলের উত্থানটা যেন হঠাৎ লাইটের সুইচ অন করার মতো। এক মুহূর্তে ঘুম কেটে যায়। আর একবার জেগে উঠে মন ছুটতে শুরু করলে, মস্তিষ্কের ‘অ্যারাউজাল সিস্টেম’ সক্রিয় হয়ে যায়, ফলে আপনি পুরোপুরি সজাগ হয়ে ওঠেন।”
ফলত, স্ট্রেসে থাকা মানুষদের ঘুম হয় হালকা। কর্টিসলের মাত্রা বেশি থাকায় আবার ঘুমিয়ে পড়া কঠিন হয়ে যায়। অনেক সময় গোটা রাতটাই কেটে যায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে, নিজেকে জোর করে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে।
তাহলে ফের ঘুমোবেন কীভাবে?
ঘুম ভেঙে গেলে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। “এখনই ঘুমোতে হবে”, “কাল সকালেই কাজ আছে” - এই চাপ নিজেই আরও সতর্কতা বাড়িয়ে দেয়। ডাঃ অ্যালেনের মতে, এখানেই মূল ভুলটা হয়। কারণ আমরা ঘুমকে জোর করে ধরে রাখতে চাই। আর সেই লড়াই-ই আমাদের আরও বেশি জাগিয়ে তোলে।
তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন - প্রথমেই মেনে নিন, মাঝেমধ্যে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ঘুম ভেঙে যাওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
ড. অ্যালেনের কথায়, “স্বল্প সময়ের জন্য জেগে ওঠা স্বাভাবিক। এর বিরুদ্ধে লড়াই করাই আপনাকে জাগিয়ে রাখে।” অর্থাৎ, ঘুম ভাঙলে আতঙ্কিত না হয়ে সেটাকে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করা জরুরি। ‘ঘুমই আসছে না’ - এই চিন্তাকে বড় করে না দেখলে মস্তিষ্কের সতর্কতা ধীরে ধীরে কমে আসে।
স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে রাখা, দিনের বেলা মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা এবং রাতে ঘুমের সময় নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ না বাড়ানো - এই কয়েকটি বিষয়ই দীর্ঘমেয়াদে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।