ট্যাটুর ক্ষত থেকে ত্বক সেরে ওঠার পরও ট্যাটুর রাসায়নিক উপাদান শরীরের অভ্যন্তরীণ নানা প্রক্রিয়ার সঙ্গে ক্রমাগত প্রতিক্রিয়া চালিয়ে যায়।

শেষ আপডেট: 18 February 2026 17:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ট্যাটু অনেকের কাছেই ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। কিন্তু ট্যাটু ফুটিতে তুলতে ত্বকের নীচে যে কালি (body ink effects) ব্যবহার করা হয়, তা আসলে ঠিক ট্যাটুর জায়গাতেই স্থির হয়ে থাকে না, সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে শরীরের নানা অংশে, বলছে নতুন গবেষণা (tattoo health risks research)।
প্রসেডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স (Proceedings of the National Academy of Sciences)-এ প্রকাশিত এক গবেষণা জানাচ্ছে, ট্যাটুর কালি শরীরের (tattooed skin) কাছে ফরেন পার্টিকল বা বহিরাগত কণার মতো আচরণ করে। শরীর ক্রমাগত চেষ্টা করে এগুলোকে সরিয়ে দিতে (tattoo immune system response)।
ইঁদুরের উপর করা এই গবেষণায় দেখা গেছে, ট্যাটুর রং শুধু ত্বকের উপর 'স্থির চিত্র' হয়ে থাকে না, বরং শরীরের ভিতরে নানা অংশেও পৌঁছে যায়। অর্থাৎ, ট্যাটু শুধু 'বডি আর্ট' নয়, এটি আসলে কেমিক্যাল ও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী পারস্পরিক ক্রিয়া (tattoo impact on immune system)।
ট্যাটু করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই বিষয়টি বোঝা জরুরি, কারণ শরীর কখনও পুরোপুরি এই 'বহিরাগত পদার্থে'র প্রতি প্রতিক্রিয়া বন্ধ করে না।
ট্যাটুর কালি কীভাবে শরীরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে?
ট্যাটুর সূচ ত্বক ভেদ করে মাঝের স্তর, অর্থাৎ ডার্মিসে সেই রং জমা করে। সঙ্গে সঙ্গে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা এটিকে 'আক্রমণকারী' হিসেবে শনাক্ত করে। তখন ম্যাক্রোফেজ নামে শ্বেত রক্তকণিকা এগুলোকে ঘিরে ফেলে। কিছু কোষ কালি ধরে রাখলেও, ছোট কণাগুলো লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমের মাধ্যমে শরীরের ভেতরে পরিবাহিত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই ক্ষুদ্র কণা শেষ পর্যন্ত লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থিতে জমা হয়, যেগুলো শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার ফিল্টার হিসেবে কাজ করে। এতটাই নিয়মিত এই প্রক্রিয়া যে, অনেক সময় অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকেরা রোগীর লিম্ফ নোডে ট্যাটুর রঙের দাগ দেখতে পান।
অর্থাৎ, ট্যাটুর ক্ষত থেকে ত্বক সেরে ওঠার পরও ট্যাটুর রাসায়নিক উপাদান শরীরের অভ্যন্তরীণ নানা প্রক্রিয়ার সঙ্গে ক্রমাগত প্রতিক্রিয়া চালিয়ে যায়।

ট্যাটু কি ইমিউন প্রতিক্রিয়া বদলে দিতে পারে?
ট্যাটুর কালি বিভিন্ন ধাতু ও রাসায়নিক যৌগ দিয়ে তৈরি। এগুলো শরীরে স্থায়ী প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। ফলে শরীর সব সময় সতর্ক অবস্থায় থাকে, যা বাস্তব বিপদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।
লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমে কালি জমা হওয়া শুধু অদ্ভুত ঘটনা নয়, এটি শরীরের প্রতিরোধ সংক্রান্ত সিগনাল ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে। গবেষণায় বলা হয়েছে, এই কণাগুলোর জমা হওয়ায় লিম্ফ নোডে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা দেখা দেয়। সেগুলো ফুলে যেতে পারে।
অনেকেই ট্যাটু নিয়ে স্বাভাবিক জীবন কাটালেও, দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে এই কণাগুলোর উপস্থিতি বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে।
নানা প্রমাণ বলছে, প্রায় ১০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ট্যাটু কি ভ্যাকসিনের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে?
ট্যাটু ও ভ্যাকসিন - দুটোই ত্বক ও লিম্ফ নোডের প্রতিরোধ কোষের উপর নির্ভর করে। তাই বিজ্ঞানীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, ট্যাটুর কালি ভ্যাকসিনেশনের প্রতিক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে কিনা।
যদি ভ্যাকসিন শরীরের এমন জায়গায় দেওয়া হয় যেখানে ট্যাটু বেশি, তবে আগে থেকেই থাকা প্রদাহ প্রতিরোধ কোষের 'মনোযোগ' সরিয়ে দিতে পারে। ফলে ভ্যাকসিনের প্রতি প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া কম হতে পারে।
যদিও মানুষের উপর আরও গবেষণা প্রয়োজন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ট্যাটু করা ত্বকের পরিবর্তিত প্রতিরোধ ক্ষেত্র বিশেষে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরির ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ:
সম্ভব হলে ট্যাটু করা অংশে সরাসরি ভ্যাকসিন না নেওয়াই ভাল, যাতে প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়ার ঠিকঠাক প্রভাব পাওয়া যায়।
অনেকের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সমস্যা না হলেও, শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনও চলছে।