একদিকে যখন দেশের নামজাদা কর্পোরেট হাসপাতালগুলি হাত তুলে নিয়েছিল, ঠিক তখনই আশার আলো দেখাল পিজি-র নতুন শাখা 'অনন্য'। প্রায় ৮ কেজি ওজনের এক বিশালাকার টিউমার সফল অস্ত্রোপচার করে ২৩ বছর বয়সি এক যুবককে যমরাজার দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনলেন হাসপাতালের বিশিষ্ট সার্জন ডা. দীপ্তেন্দ্র সরকার ও তাঁর টিম।
.jpeg.webp)
রেট্রোপেরিটোনিয়াল টিউমারে আক্রান্ত রোগীকে সুস্থ করলেন পিজি-র চিকিৎসকরা
শেষ আপডেট: 16 March 2026 20:54
সদ্য পড়াশোনা শেষ করে ব্যবসাকেই ধ্যানজ্ঞান করেছিল ২৩ বছর বয়সি শাহানওয়াজ গাজি। কিন্তু হঠাৎই শুরু হল তীব্র পায়ের যন্ত্রণা (Pain)। কাজ ফেলে বাড়িতে বিশ্রাম। চিকিৎসা করতে গেলে প্রথমেই নানা টেস্ট শুরু হয়। পায়ে ব্যথা দিয়ে শুরু হলেও রোগটা পাকে খাদ্যনালীতে। একদিকে যখন দেশের নামজাদা কর্পোরেট হাসপাতালগুলি হাত তুলে নিয়েছিল, ঠিক তখনই আশার আলো দেখাল পিজি-র (sskm) নতুন শাখা 'অনন্য'। প্রায় ৮ কেজি ওজনের এক বিশালাকার টিউমার (Tumor) সফল অস্ত্রোপচার করে ২৩ বছর বয়সি এক যুবককে যমরাজার দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনলেন হাসপাতালের বিশিষ্ট সার্জন ডা. দীপ্তেন্দ্র সরকার ও তাঁর টিম।
যন্ত্রণা কাটাতে, অন্তহীন লড়াই
মুমূর্ষু সেই যুবকের বাড়ি দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে। যখন সে সব জায়গায় ঘুরে চিকিৎসা করাতে এসএসকেএম-এ এলেন তাঁর পেটের আয়তন দেখে মনে হচ্ছিল পূর্ণগর্ভবতী কোনও মহিলা। গত কয়েক মাস ধরে রেট্রোপেরিটোনিয়াল টিউমারে আক্রান্ত হয়ে আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন তিনি। চিকিৎসার সন্ধানে বেঙ্গালুরু থেকে মুম্বই— হন্যে হয়ে ঘুরেছে পরিবার। কিন্তু বিশাল খরচের পাহাড় আর অস্ত্রোপচারের চরম ঝুঁকির কথা শুনিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিল দেশের তাবড় সব চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। হতাশ হয়ে যখন বাড়ির লোক সব আশা ছেড়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন, ঠিক তখনই শেষ চেষ্টার জন্য তাঁরা দ্বারস্থ হন এসএসকেএম-হাসপাতালে।
অপারেশন থিয়েটারে সাড়ে চার ঘণ্টার যুদ্ধ
ডা. দীপ্তেন্দ্র সরকারের তত্ত্বাবধানে যখন রোগীকে ভর্তি করা হয়, তখন তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত জটিল। খাদ্যনালীর পিছন দিকে থাকা সেই টিউমারের ওজন ছিল প্রায় ৭ কেজি ৬০০ গ্রাম। টিউমারটি এতটাই বড় হয়ে গিয়েছিল যে তা পেটের ভেতরের মূল শিরা ও ধমনিতে প্রবল চাপ সৃষ্টি করছিল। টিউমারটা খাদ্যনালীকে সামনের দিকে ঠেলতে শুরু করে। তারপর এটি প্রস্রাবের নালি (ইউরেটার) ছাপিয়ে তা শিরদাঁড়ার হাড়ের ভেতরেও প্রবেশ করে গিয়েছিল।
ডা. সরকারের কথায়, “অপারেশনটি ছিল অসম্ভব ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল প্রাণের সংশয়। আমরা পরিবারকে সমস্তটা জানাই। রোগীর অপারেশন টেবিলেই মৃত্যু হতে পারতো। সমস্ত সম্মতি নিয়েছিলাম। সাড়ে চার ঘণ্টার এক ম্যারাথন যুদ্ধ চালিয়েছি আমি আর আমার পুরো টিম। একা এটা করা কখনই সম্ভব হত না। কারণ এক্ষেত্রে একাধিক চ্যালেঞ্জ ছিল, টিউমার বাদ যাবে অথচ রোগী যেন প্যারালিসিস হয়ে না যায়, কিডনি ও খাদ্যনালী যেন ঠিক থাকে, শরীরে মূল ধমনি ও শিরাকে রক্ষা করে সফল অপারেশন করা।”
এসএসকেএম-এর নতুন শাখা 'অনন্য'-তে এখনও পর্যন্ত হওয়া হাতেগোনা কয়েকটি বড় অপারেশনের মধ্যে এটি অন্যতম এক মাইলফলক । ডা. সরকার আরও যোগ করেন, “অন্যান্য বড় হাসপাতাল এই ঝুঁকি নিতে ব্যর্থ হলেও, এসএসকেএম-এর পরিকাঠামো এবং চিকিৎসকদের লড়াই করার মানসিকতাতেই এই কাজটি সফল করা সম্ভব হয়েছে। অদম্য ইচ্ছার কাছে হার মেনেছে সব বাধা। অস্ত্রোপচার সফল হওয়ার পর যখন ওটি থেকে বেরিয়ে রোগীর তিন ভাইকে জানাই, ‘আপনাদের ভাই ভাল আছে, বিপদ কেটে গেছে’— সেই মুহূর্তেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁরা। তিন ভাই আমার সামনে মাটিতে বসে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। সেই আবেগঘন দৃশ্য আজও ভাবায়। এটাই হয়তো একজন চিকিৎসক হিসেবে সমাজের জন্য কিছু করা।”
বর্তমানে রোগী সুস্থ আছেন। এবং তাঁর এই ফিরে আসা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জয় হিসেবেই দেখছে বিশেষজ্ঞ মহল।
রেট্রোপেরিটোনিয়াল টিউমার (Retroperitoneal Tumor) কী আদতে ক্যানসার?
এই ধরণের টিউমার পুরোপুরি কার্সিনোজেনিক বা ক্যানসার নয়, আবার সাধারণ ‘বিনাইন’ টিউমারও নয়— এটি মাঝামাঝি পর্যায়ের একটি জটিল টিউমার। ডা. সরকারের মতে, “এটি সাধারণত খাদ্যনালীর পিছন দিকে হয়। সবথেকে বড় ভয় ছিল, টিউমার বাদ দিতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিরা বা ধমনি ছিঁড়ে যাওয়ার। এমনকি শিরদাঁড়া থেকে টিউমার বিচ্ছিন্ন করার সময় স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রোগীর আজীবন প্যারালাইসিস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত প্রস্রাবের নালিও (ইউরেটার)।”
এতগুলো জীবনমরণ ঝুঁকি সামলে সফলভাবে সম্পন্ন হয় এই ‘ওপেন সার্জারি’। এই অপারেশন যেমন রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, তেমনই কঠিন পরীক্ষা ছিল সার্জনদের জন্যও। অত্যাধিক অ্যাড্রিনালীন নিঃসরণ আর মানসিক চাপের সেই লড়াই শেষে এখন সুস্থ শাহানওয়াজ। অপারেশনের পরের দিন থেকেই তিনি উঠে দাঁড়াতে পারছেন।
কেন হয় এই টিউমার? লক্ষণই বা কী?
সাধারণত জিনের কিছু ‘দুর্ঘটনা’ বা মিউটেশনের কারণেই এই ধরণের টিউমার হয়ে থাকে। তবে যে কারও যেকোনও সময় এমন হতে পারে। শাহানওয়াজের ক্ষেত্রে প্রধান লক্ষণ ছিল খেতে না পারা এবং বারবার বমি হওয়া। এরপর হঠাৎ করেই পেট ফুলতে শুরু করে তাঁর। ডা. সরকার সতর্ক করে জানিয়েছেন, আগামী কয়েক মাস রোগীকে কড়া পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে। কারণ এই ধরণের টিউমার ফিরে আসার একটা সম্ভাবনা থাকে, তবে সঠিক চিকিৎসায় থাকলে ভয়ের কিছু নেই।
'অনন্য'-তে সাশ্রয়ী ও বিশ্বমানের পরিষেবা
এসএসকেএম-এর এই নতুন শাখা ‘অনন্য’-তে সাধারণ মানুষের জন্য রয়েছে অত্যন্ত মিতব্যয়ী চিকিৎসার সুযোগ। এখানে একটি নির্দিষ্ট ও সীমিত বেড ভাড়ার মধ্যেই ওষুধ, অপারেশন এবং অন্যান্য যাবতীয় খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকে। বড় কোনও অপারেশনের ক্ষেত্রেও এই খরচ সীমিত, যা অন্যান্য সাধারণ স্বাস্থ্যবীমা দিয়েও কভার করা সম্ভব। স্বাস্থ্যসাথী ধার্য নয়। উন্নত সরকারি মডেলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের হাত ধরে এত কম খরচে এমন জটিল চিকিৎসা পরিষেবা নিঃসন্দেহে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক অনন্য নজির।