কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য আইনি বিচ্ছেদ, প্রেমিকাকে বিয়ে, সফল ট্রান্সপ্লান্ট—তারপর আবার প্রথম স্ত্রীর কাছে ফেরা। সম্পর্ক, আইন ও চিকিৎসার টানাপড়েন জড়ানো এক চাঞ্চল্যকর জীবনকাহিনি।

কিডনিদানের রুদ্ধশ্বাস কাহিনি।
শেষ আপডেট: 5 March 2026 15:05
জীবন বড় অদ্ভুত। কখনও কখনও প্রাণের দায়ে মানুষকে এমন সব রাস্তায় হাঁটতে হয়, যা রুপোলি পর্দার রোমহর্ষক চিত্রনাট্যকেও (Medical Thriller) হার মানায়। অনন্ত দাসের (নাম পরিবর্তিত) জীবনটা ঠিক তেমনই।
এসএসকেএম হাসপাতালের (SSKM Hospital) নেফ্রোলজি বিভাগের (Nephrology) ওপিডিতে আসা এই অনন্তবাবুর কিছুদিন আগেই মৃত্যু হয়েছে এক বেসরকারি হাসপাতালে। তাঁর জীবনেই ঘটেছে এমন অদ্ভুত ঘটনা। একটি কিডনি আর প্রাণ রক্ষার জন্য ঘটিয়েছেন বিচ্ছেদ, পরকীয়া, দ্বিতীয় বিয়ে পর্যন্ত! এবং সবশেষে আবারও ফিরেছেন পুরনো সম্পর্কে, প্রথম স্ত্রীর কাছে।
তবে এসবের কয়েক বছর পরে, সব মায়া কাটিয়ে মারা গিয়েছেন তিনি।
এসএসকেএম হাসপাতালের নেফ্রোলজিস্ট ডা. অতনু পাল জানালেন, দীর্ঘদিন ধরে কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন ৪২ বছর বয়সি অনন্ত দাস। ডায়ালিসিস নিতে নিতে শরীর যখন প্রায় ভেঙে পড়েছে, চিকিৎসকরা সাফ জানান—বাঁচতে হলে কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া গতি নেই। কিন্তু আইনি গেরোয় আটকে যায় প্রক্রিয়া। কারণ ভারতের কঠোর অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন অনুযায়ী, নিকটাত্মীয় ছাড়া অন্য কেউ সহজে কিডনি দিতে পারেন না।
এসব ক্ষেত্রে স্ত্রীই এগিয়ে আসেন ডোনার হিসেবে। কিন্তু সে সময়ে স্ত্রীর শারীরিক জটিলতার কারণে তাঁর পক্ষে ডোনার হওয়া সম্ভব ছিল না।
ঠিক এমনই সময়ে ‘বিপদের বন্ধু’ হিসেবে এগিয়ে আসেন ওই ব্যক্তির প্রেমিকা! তাঁর সঙ্গেই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে তথা পরকীয়ায় জড়িয়ে ছিলেন অনন্ত দাস। তবে ওই প্রেমিকার একটি শর্ত ছিল— প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে আইনি বিচ্ছেদ ঘটিয়ে তাঁকে বিয়ে করলে, তবেই তিনি কিডনি দেবেন।
বাঁচার অদম্য ইচ্ছায় সেই শর্তও মেনে নেন রোগী। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর সঙ্গে আইনি বিচ্ছেদ ঘটিয়ে বিয়ে করে নেন দ্বিতীয় সঙ্গীকে। তারপর এক বেসরকারি হাসপাতালে ট্রান্সপ্লান্ট বোর্ড ও এথিক্স কমিটির সমস্ত নিয়ম মেনে, নথিপত্র যাচাইয়ের পর সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। নতুন কিডনি নিয়ে সুস্থও হয়ে ওঠেন তিনি।
অস্ত্রোপচারের পর দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে প্রায় ২ বছর বেশ কাটছিল জীবন। কিন্তু মানুষের মন বোঝা দায়। সুস্থ হয়ে ওঠার কয়েক বছর পরেই ফের প্রথম পক্ষের স্ত্রীর জন্য মন আকুল হতে শুরু করে অনন্তর।
একদিন হাসপাতালে রুটিন চেকআপে এসে ওই ব্যক্তি জানান, তিনি ফের তাঁর প্রথম পক্ষের স্ত্রীর কাছেই ফিরে যেতে চান। যে বিচ্ছেদ ছিল কেবল ‘আইনি’ বা ‘কৌশলগত’, তাকে মিটিয়ে নিয়ে ফের শুরু করেন পুরনো সংসার। দ্বিতীয় স্ত্রীকে ত্যাগ করে ফিরে যান প্রথম স্ত্রীর কাছে, পুরনো ঠিকানায়।
ডাক্তারবাবু বলেন, “আমাদের কাছে মূল লক্ষ্য ছিল রোগীর প্রাণ বাঁচানো। সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া এবং কাউন্সিলিং শেষেই অস্ত্রোপচার হয়েছে এক বেসরকারি হাসপাতালে । তবে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সঙ্গে যে কত গভীর সামাজিক ও মানসিক টানাপড়েন জড়িয়ে থাকে, এই ঘটনা তা আবারও প্রমাণ করল। আইন এবং আবেগ, সব কিছুর সঙ্গে লড়াই করতে হয় রোগীকে। তবে এটাও ঠিক যে, বেঁচে থাকলে জীবনে সব হয়, আবার নিজের স্বার্থে বিচ্ছেদ নেওয়া কতটা অর্থবহ বা মানবিক সিদ্ধান্ত তা নিয়েও প্রশ্ন থেকেই যায়।"
শুধু তাই নয়, ডাক্তারবাবু মনে করিয়ে দিলেন, "আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে এমন কৌশল নেওয়া আগামীদিনে অঙ্গ প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ায় জটিলতা বাড়াতে পারে। তাই সবদিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ভাল। ডোনার পরিবার থেকে না পাওয়া গেলেও আলাদভাবে সমস্ত কিছু শারীরিক পরিস্থিতি, ব্লাডগ্রুপ দেখে বাইরে থেকেও ডোনার পাওয়া যায়। এটা হয়তো অনেকটা খরচসাপেক্ষ, কিন্তু স্বার্থপরের মতো সিদ্ধান্ত নয়। তাই সবদিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।”
অবশেষে নতুন কিডনি আর পুরনো ভালবাসা নিয়ে ফের ঘর বেঁধেছিলেন ওই ব্যক্তি। টানা ৮ বছর দিব্যি কাটছিল জীবন। কিন্তু নিয়তির লিখন খণ্ডাবে কে? সম্প্রতি এক ভয়াবহ সংক্রমণ (Infection) গ্রাস করে তাঁকে। নিয়মিত চেকআপে এলেও শেষ রক্ষা হয়নি। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় মাল্টি-অর্গান ফেলিওর হয়ে সম্প্রতি মৃত্যু হয় তাঁর।
বেঁচে থাকার জন্য যে মানুষটি আইন, সমাজ এবং সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে তাঁকে হার মানতেই হল।