পূর্ব ভারতে প্রথমবার আরজি কর হাসপাতালে মৃত দাতার হাড় নিয়ে ৩১ বছরের যুবকের ডিস্টাল ফিমার পুনর্গঠন করা হল। অ্যালোগ্রাফট পদ্ধতিতে সফল অস্ত্রোপচার।

প্রতিস্থাপন হল ৩১ বছরের যুবক রিজাউদ্দিন মণ্ডলের
শেষ আপডেট: 20 February 2026 10:38
পূর্ব ভারতে প্রথম। এই মণিহার তো কলকাতারই সাজে। কারণ চেন্নাই থেকে মৃত মানুষের হাড় এনে জীবিত মানুষের শরীরে এই প্রথম সফল প্রতিস্থাপন (bone replacement) হল কলকাতায়। উত্তর ২৪ পরগনার বিরার বাসিন্দা ৩১ বছরের শ্রমিক রিজাউদ্দিন মণ্ডলের শরীরে বসানো হল সদ্য মৃত দাতার হাড়। অস্ত্রোপচারটি হয়েছে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে (RG Kar Hospital)।
হাসপাতাল সূত্রের দাবি, পূর্ব ভারতে ডিস্টাল ফিমারের (হাঁটুর কাছের উরুর হাড়) এমন অ্যালোগ্রাফট রিকনস্ট্রাকশন (allograft reconstruction) এই প্রথম।
কী হয়েছিল রোগীর?
২০২৩ সালে লরি দুর্ঘটনায় ওলটপালট হয়ে যায় রিজাউদ্দিনের জীবন। দুর্ঘটনায় তাঁর ডান পায়ের ডিস্টাল ফিমার (distal femur) গুরুতরভাবে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। এই ‘ওপেন ফ্র্যাকচার’-এর সঙ্গে তৈরি হয় বড়সড় হাড়ের ঘাটতি (বোন লস)।
দীর্ঘ প্রায় আড়াই বছরের চিকিৎসায় শারীরিক অন্যান্য জটিলতা কাটিয়ে উঠলেও স্বাভাবিক হাঁটাচলার ক্ষমতা হারান তিনি। অবশেষে সম্প্রতি আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগ অ্যালোগ্রাফট পদ্ধতিতে সফল পুনর্গঠন করে তাঁর হাঁটু আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

একাধিক অস্ত্রোপচার, তবু মেলেনি সাফল্য
২০২৩ সালের মে মাসে প্রথম অস্ত্রোপচার হয়। খোলা ক্ষত ঢাকতে জুনে প্লাস্টিক সার্জারি করা হয়। কিন্তু হাড়ের জটিলতা কাটেনি—অগস্টে আবার অস্ত্রোপচার করতে হয়। ২০২৪ সালে ধরা পড়ে গুরুতর বোন ডিফেক্ট। রোগীর নিজের হাঁটুর প্যাটেলা থেকে গ্রাফট নিয়ে (অটোগ্রাফট) জুলাই ২০২৪-এ আরেকটি অস্ত্রোপচার করা হলেও তাতেও সাফল্য আসেনি। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন রিজাউদ্দিন।
অর্থোপেডিক বিভাগের চিকিৎসক ডা. সঞ্জয় কুমার জানান, তখন সামনে দুটি উপায় ছিল —প্রথমত, দুর্ঘটনাগ্রস্ত পা কেটে বাদ দেওয়া, দ্বিতীয়ত, সদ্য মৃত দাতার থাইয়ের হাড়ের অংশ দিয়ে পুনর্গঠন। প্রথম বিকল্পে রোগীর জীবনমানের তেমন উন্নতি হত না। তাই বেছে নেওয়া হয় দ্বিতীয় পথ—‘ফ্রেশ ক্যাডাভেরিক অ্যালোগ্রাফট’, অর্থাৎ সদ্য সংগৃহীত মৃত দাতার হাড় নিয়ে প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। এই টিমে ছিলেন হাসপাতালের অর্থপেডিক সার্জেন ডা. সুনীত হাজরা এবং ডা. সুমন্ত পাল ও অন্যরা।
কীভাবে হল এই প্রতিস্থাপন? (bone replacement)
এই ধরনের হাড় কলকাতায় সহজলভ্য নয়। তাই দেশের যে সংস্থা এই বিষয়ে কাজ করে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আরজি কর কর্তৃপক্ষ। রোগীর পায়ের যতটা অংশ প্রয়োজন, তার থ্রি-ডি প্রিন্ট মডেল তৈরি করে পাঠানো হয়। সেই মাপ অনুযায়ী আনা হয় দাতার হাড়। হাসপাতাল প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর রোগীর জন্য ২.৪ লক্ষ টাকা মঞ্জুর হয়। সব অনুমোদন পাওয়ার পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সফলভাবে অ্যালোগ্রাফট ফিক্সেশন সম্পন্ন হয়।
এই প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে দাতা মৃত ব্যক্তিই হন, কারণ কোনও জীবিত ব্যক্তি হাঁটুর হাড় দান করতে সক্ষম নন—এতে সেই ব্যক্তিও অক্ষম হয়ে পড়বেন। মৃতদেহ থেকে সংগৃহীত হাঁটুর হাড় বসিয়ে ধীরে ধীরে তা স্বাভাবিক অবস্থায় আনা হয়। প্রতিস্থাপনের পর কয়েক মাস সময় লাগে হাড় পুরোপুরি জোড়া লাগতে ও শরীরের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে। ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপিত হাড় রোগীর শরীরের অংশ হয়ে যায়। সাধারণত দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে হাড় ক্ষতিগ্রস্ত হলে তবেই এই ধরনের প্রতিস্থাপন প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম উপাদান দিয়ে চিকিৎসা সম্ভব হয় না। মানবদেহের হাড়ই তখন একমাত্র কার্যকর বিকল্প—যেমনটা হয়েছে রিজাউদ্দিনের ক্ষেত্রে।
এখন কেমন আছেন রোগী?
অস্ত্রোপচারের পর প্রাথমিকভাবে হাঁটুর পুনর্গঠন সন্তোষজনক হয়েছে বলে জানিয়েছে অর্থোপেডিক্স বিভাগ। রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। চিকিৎসকদের আশা, কয়েক মাসের মধ্যেই রিজাউদ্দিন স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনে ফিরতে পারবেন। এই চিকিৎসা হাসপাতালের ট্রমাকেয়ার চিকিৎসায় একটা নতুন পথ দেখালো।