ছোটদের শিরদাঁড়ার জটিল অসুখ স্কোলিওসিস এখন সরকারি পরিষেবাতেই চিকিৎসাযোগ্য। এনআরএস হাসপাতালে আধুনিক নিউরো মনিটরিং ব্যবস্থায় বিনামূল্যে অস্ত্রোপচার হচ্ছে নিয়মিত।

এনআরএস হাসপাতালে স্কোলিওসিসের চিকিৎসা
শেষ আপডেট: 20 February 2026 11:10
মেয়েটার বয়স মাত্র ১১ বছর। পড়াশোনায় ভাল, খেলাধুলোয় আরও ভাল। স্কুলের প্রায় সব প্রতিযোগিতাতেই অংশ নেয়। ২০০ মিটার দৌড়ে প্রতি বছর প্রথম—এবারও প্রস্তুতি ছিল ভাল। কিন্তু ফাইনাল স্পোর্টসের দু’দিন আগে আচমকাই তীব্র পিঠের ব্যথা। সোজা হয়ে বসতে পারছে না, শোওয়াও কষ্টকর। প্রথমে সাধারণ মাংসপেশির টান ভেবেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন বাড়ির লোক। কিন্তু যন্ত্রণা বাড়তে থাকায় দ্রুত আমার কাছে নিয়ে আসেন তাঁরা।
পরীক্ষা করেই বোঝা যায়, সমস্যা সাধারণ নয়। ধরা পড়ে স্কোলিওসিস—মেরুদণ্ডের অস্বাভাবিক বেঁকে যাওয়া। অনেক ক্ষেত্রেই এই অসুখ ছোট বয়স থেকেই থাকে, কিন্তু বয়ঃসন্ধিকালে হাড়ের দ্রুত বৃদ্ধি শুরু হলে হঠাৎ করেই তা প্রকট হয়ে ওঠে। তখন ব্যথা, শরীরের ভঙ্গিতে পরিবর্তন—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়।
অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও ব্রেস লাগিয়ে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলেও, বক্রতা বেশি হলে অস্ত্রোপচারই একমাত্র উপায়। এই ১১ বছরের কিশোরীর মতো এমন বহু রোগীই রোজই সরকারি হাসপাতালের আউটডোরে আসে। আর তাদের বয়স ১০-১৫ বছরের মধ্যে।
আশা দেখাচ্ছে সরকারি চিকিৎসা
শিরদাঁড়ার অসুখ মানেই আতঙ্ক। তার ওপর যদি রোগী হয় বাড়ির সবচেয়ে ছোট সদস্য, উৎকণ্ঠা আরও বাড়ে। মেরুদণ্ডে অস্ত্রোপচারের কথা শুনলেই অনেক পরিবার মনে করে, সন্তান হয়তো আর স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবে না।
তবে বর্তমানে কলকাতার সরকারি হাসপাতালেই এখন স্কোলিওসিসের মতো জটিল শিরদাঁড়ার অসুখের চিকিৎসা হচ্ছে নিয়মিত। বিশেষ করে নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল (এনআরএস)-এ এই পরিষেবা এখন অনেক পরিবারের ভরসা।
প্রতি সপ্তাহে গড়ে ২–৩ জন শিশু স্কোলিওসিস নিয়ে এনআরএসের আউটডোরে আসেই। সংখ্যাটা থেকেই বোঝা যায়, সমস্যাটি কতটা বিস্তৃত। অথচ খরচের ভয়ে বহু পরিবার চিকিৎসা পিছিয়ে দেন। বেসরকারি হাসপাতালে যেখানে এই অস্ত্রোপচারে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ হয়, সেখানে সরকারি হাসপাতালে তা হচ্ছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।


প্রথমে ধরা পড়ে না
অল্প বয়সে শুরু হলেও স্কোলিওসিস অনেক সময় নজরে আসে না। সাধারণত ২–৩ বছর বয়স থেকেই মেরুদণ্ড বেঁকে যেতে শুরু করতে পারে, কিন্তু তা স্পষ্ট হয় ১০–১২ বছর বয়সে গিয়ে। তখন দেখা যায়, দাঁড়ালে বা বসলে শিরদাঁড়া একদিকে হেলে রয়েছে, এক কাঁধ উঁচু বা কোমর অসমান।
কী হয় স্কোলিওসিসে?
আমাদের মেরুদণ্ডে স্বাভাবিকভাবেই সামনের ও পেছনের দিকে হালকা বাঁক থাকে। কিন্তু স্কোলিওসিসে শিরদাঁড়া ডান বা বাঁ দিকে বেঁকে যায়, উপর থেকে দেখলে তা ইংরেজি ‘C’ বা ‘S’ অক্ষরের মতো লাগে। ফলে শরীরের ওজন সঠিকভাবে ভারসাম্য রাখতে পারে না, শুরু হয় ব্যথা ও অস্বস্তি।
প্রথমদিকে বক্রতা কম থাকায় উপসর্গও কম থাকে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ভঙ্গিতে অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। গুরুতর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার ছাড়া উপায় থাকে না।
যাদের মেরুদণ্ড ৪০ ডিগ্রির বেশি বেঁকে যায়, তাদের অপারেশন প্রয়োজন হয়। ২০–২৫ ডিগ্রি পর্যন্ত হলে ওষুধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
কেন হয়?
সাধারণত ১২–১৩ বছর বয়সিরাই বেশি আসে চিকিৎসার জন্য। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না। তাই একে বলা হয় ‘ইডিওপ্যাথিক স্কোলিওসিস’ বা ‘অ্যাডোলেসেন্ট ইডিওপ্যাথিক স্কোলিওসিস’। কারও ক্ষেত্রে জন্মগত ত্রুটির কারণে জন্মের পরই শিরদাঁড়া বেঁকে থাকে। ২–৩ বছর বয়স থেকেই এটা প্রকটভাবে প্রকাশ পায়। একে বলা হয় ‘কনজেনিটাল স্কোলিওসিস’।
আধুনিক যন্ত্রে কমেছে ঝুঁকি
আমি ব্রিটেনে স্কোলিওসিস নিয়ে বিশেষ ফেলোশিপ করার পর এই রাজ্যে চিকিৎসা শুরু করি। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় সরকারি হাসপাতালেই এই জটিল অস্ত্রোপচার সম্ভব হচ্ছে।
অপারেশনের সময় নিউরো মনিটরিং ব্যবস্থার সাহায্যে বোঝা যায়, শিরদাঁড়ায় স্ক্রু বসানোর সময় স্নায়ুর কোনও ক্ষতি হচ্ছে কি না। সেই অনুযায়ী স্ক্রু ও রড স্থাপন করা হয়। এতে শিরদাঁড়া সোজা হয় এবং রোগী পরবর্তীতে স্বাভাবিক হাঁটাচলা করতে পারে।
ভবিষ্যতে যদি রোবোটিক নেভিগেশন বা রোবোটিক ও-আর্ম মেশিন সরকারি পরিষেবায় যুক্ত হয়, তবে এই অস্ত্রোপচার আরও নিখুঁতভাবে করা সম্ভব হবে। আরও আশার কথা, এই অপারেশনের এক-দুদিন পর থেকেই রোগীরে উঠে দাঁড়াতে, হাঁটতে সাহায্য করা হয়। যাতে দ্রুত সে স্বাভাবিক সচলতা ফিরে পায়।
প্রয়োজন স্কুলভিত্তিক স্ক্রিনিং
এই সমস্যা নিয়ে সচেতনতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আর যেহেতু অসুখটি মূলত স্কুলপড়ুয়াদের মধ্যেই প্রকাশ পায়, তাই স্কুলে স্কোলিওসিস স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম শুরু করা উচিত। সেটা শহর কিংবা গ্রাম—সর্বত্রই করতে হবে। কারণ প্রথম অবস্থাতেই এই সমস্যা চিহ্নিত হলে অনেক ক্ষেত্রে ব্রেস বা ওষুধে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব, অপারেশন নাও লাগতে পারে। তাই স্কুলে পড়াকালীন ১০–১৫ বছর বয়সিদের মধ্যে শিরদাঁড়া সোজা রয়েছে কিনা, এই বিষয়টি বিশেষ নজর দিয়ে দেখা উচিত। বিদেশে এই বিশেষ স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। তাই এরাজ্যের স্কুল কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতেই হবে।