যাঁরা জগতটাকে এখনও শিশুর মতো বিস্ময় নিয়ে দেখেন, তাঁদের মস্তিষ্ক ও চেহারা—দুটোই থাকে নমনীয়। আর যাঁরা ধরে নেন যে তাঁরা সব জেনে গেছেন এবং নিজের মতামতে অনড় থাকেন, তাঁদের মধ্যেই এই 'হার্ডেনিং' বা কঠোর হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। বয়স এদের কাছেই আগে ধরা দেয়।

বয়স বাড়লেও আপনার মুখে-চোখে থাকবে তারুণ্যের ছোঁয়া।
শেষ আপডেট: 12 March 2026 17:47
দ্য ওয়াল আরোগ্য: আমরা অনেক সময় দেখি, ৮০ বছর বয়সের কোনো বৃদ্ধার মুখে বলিরেখা থাকলেও তাঁর চোখের দৃষ্টিতে এমন এক অদ্ভুত মায়া বা সজীবতা থাকে যে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে (Aging Gracefully) । আবার অনেক সময় দেখা যায়, বয়স মাত্র চল্লিশ বা পঞ্চাশ, কিন্তু মুখটা এখনই কেমন যেন বুড়িয়ে গেছে এবং দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। হাসিটাও যেন কৃত্রিম।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই পার্থক্যের মূল কারণ হলো — মনের মধ্যে থাকে কৌতূহল (Curiosity) বনাম নিশ্চয়তা (Certainty)।
যাঁরা জগতটাকে এখনও শিশুর মতো বিস্ময় নিয়ে দেখেন, তাঁদের মস্তিষ্ক ও চেহারা—দুটোই থাকে নমনীয়। আর যাঁরা ধরে নেন যে তাঁরা সব জেনে গেছেন এবং নিজের মতামতে অনড় থাকেন, তাঁদের মধ্যেই এই 'হার্ডেনিং' বা কঠোর হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। বয়স এদের কাছেই আগে ধরা দেয়।
বিজ্ঞানের চোখে কৌতূহল ও মস্তিষ্কের সুসম্পর্ক
এটি কেবল দার্শনিক কথা নয়, এর পেছনে রয়েছে নিরেট স্নায়ুবিজ্ঞান বা নিউরোসায়েন্স। যখন আপনি কোনো কিছু নিয়ে কৌতূহলী হন, তখন মস্তিষ্কে ডোপামিন (Dopamine) নামক এক রাসায়নিক নিঃসৃত হয়। এটি আপনাকে আনন্দ দেয় এবং নতুন কিছু শিখতে উৎসাহিত করে। যার ফলে একটি ইতিবাচক ছাপ চোখে-মুখে প্রকাশ পায়।
ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিস (UC Davis)-এর গবেষক ম্যাথিয়াস গ্রুবার দেখিয়েছেন যে, কৌতূহল আমাদের মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসকে সচল রাখে। ফলে মস্তিষ্ক থাকে সজীব ও নমনীয়। আর মনের এই 'খোলামেলা' ভাব সরাসরি ফুটে ওঠে আমাদের মুখে। কৌতূহলী মানুষের চোখের মণি ও মুখের পেশিগুলোতে এক ধরণের সজীবতা থাকে, যা তাঁদের দেখতে সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে তোলে।
অন্যদিকে, যাঁরা নতুন কিছু জানতে চান না বা মনে করেন "আমিই ঠিক", তাঁদের মস্তিষ্কের প্রসেসিং সংকুচিত হয়ে যায়। এর ফলে চোয়ালের পেশি ও কপালে এক ধরণের বয়সের ছাপ বা টেনশন প্রকাশ পায়, যা দীর্ঘমেয়াদে মুখাবয়বকে কঠোর ও রুক্ষ করে দেয়; দেখতেও বয়স্ক লাগে
'ওপেননেস' বা মনের জানলা খোলা রাখুন
মনোবিজ্ঞানে 'বিগ ফাইভ' পার্সোনালিটি ট্রেইটসের মধ্যে একটি হলো Openness to Experience। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এই গুণটি ধরে রাখা খুব জরুরি। কীভাবে এই গুণ বজায় রাখবেন?
গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরণের মানুষদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য অন্যদের তুলনায় অনেক ভাল থাকে এবং তাঁদের বার্ধক্য হয় অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ।
ভয় থেকেই আসে কঠোরতা
চিকিৎসকদের মতে, বয়সের সঙ্গে মানুষ কঠোর হয় আসলে ভয় থেকে। ভয়— পাছে লোকে তাঁকে গুরুত্ব না দেয়, ভয়— পাছে তাঁর পুরনো বিশ্বাস ভুল প্রমাণিত হয়। এই ভয় থেকেই মানুষ নিজের চারপাশে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেয়। আর সেই চাপেই ধীরে ধীরে তাঁর মুখে ফুটে ওঠে বয়সের ছাপ।
নিজেকে সুন্দর ও সজীব রাখার ৫টি নিয়ম (Daily Practice):
১. নতুন কিছু শিখুন: সেটা হোক নতুন কোনো রান্না বা নতুন কোনো ভাষা। নিজেকে 'বিগিনার' বা শিক্ষানবিশ হিসেবে ভাবুন।
২. প্রশ্ন করুন: "আমি সব জানি"— এই মানসিকতা ত্যাগ করে "কেন এমন হয়?"— এই প্রশ্ন করার অভ্যাস করুন।
৩. নিজের পছন্দের বাইরে পড়ুন: যে বিষয়ে আপনার আগ্রহ নেই, সেই বিষয়ের ওপর কোনো বই বা প্রবন্ধ পড়ুন। এতে চিন্তার পরিধি বাড়বে।
৪. ছোট জিনিসে আনন্দ খুঁজুন: রাস্তার পাশের কোনো গাছ বা খেলনা হাতে কোনো শিশুর আনন্দ— এগুলো খুঁটিয়ে লক্ষ্য করুন।
৫. নিজেকে নমনীয় রাখুন: অন্যের মতামতের সঙ্গে নিজেরটা না মিললে রেগে না গিয়ে বোঝার চেষ্টা করুন।
বয়স কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় বাড়ে। কিন্তু আপনার চেহারা সুন্দর থাকবে কি না, তা নির্ভর করে আপনি পৃথিবীর দিকে কতটা বিস্ময় নিয়ে তাকাচ্ছেন তার ওপর। মনে রাখবেন, সজীব মনই হলো চিরযৌবনের আসল রহস্য।