শেষ আপডেট: 15 September 2025 19:14
সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন এই ছোট ছোট লক্ষণগুলোকে হালকা ভাবে দেখা হয়। বহু রোগী যখন চিকিৎসকের কাছে আসেন, তখন অনেকটাই দেরি হয়ে যায়।
কলকাতা: ছোট ঘা, বড় বিপদ! প্রতিদিন আমাদের চারপাশে অনেকেই মুখের ভিতরে হালকা ঘা (mouth ulcer), সাদাটে বা লালচে দাগকে (oral lesion) ‘সামান্য আলসার’ ভেবে বসে থাকেন। কিন্তু এই ঘাগুলিই (non-healing sore) হতে পারে মুখগহ্বর ক্যান্সার (oral cancer) এর প্রাথমিক সংকেত।
বিশিষ্ট ওরাল অঙ্কলজিস্ট (oral oncologist) ডাঃ রাজর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, মুখে যদি কোনও ঘা ১৫–২১ দিনের মধ্যে না সারতে চায়, এবং রং হয় লালচে বা সাদাটে (red, white patch)—তবে সেটিকে একেবারেই অবহেলা করা উচিত নয়। কাছের ডেন্টাল ক্লিনিক বা জেনারেল প্র্যাকটিশনারের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।
অবহেলা মানেই বিপদ
সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন এই ছোট ছোট লক্ষণগুলোকে হালকা ভাবে দেখা হয়। বহু রোগী যখন চিকিৎসকের কাছে আসেন, তখন রোগটা অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। তখন চিকিৎসাও জটিল, খরচও বেশি, ঝুঁকিও মারাত্মক।
শুধু গুটখা নয়, ক্যান্সারের কারণ অনেক
মুখের ক্যান্সার শুধু গুটখা বা তামাক (chewing tobacco) খাওয়ার ফল নয়। আজকের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভেপিং, পানমশলা, অ্যালকোহল (alcohol consumption) ও ধূমপান (smoking) এর প্রবণতা বেড়ে চলেছে। এই সবই ভবিষ্যতে একটি ভয়ঙ্কর ওরাল ক্যান্সার এপিডেমিক (epidemic) এর দিকে নিয়ে যেতে পারে। ডাঃ বন্দ্যোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, শুধু ধূমপান নয়, চিউয়িং টোব্যাকো সবচেয়ে বিপজ্জনক। এর সঙ্গে যদি অ্যালকোহল জুড়ে যায়, তবে ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
ক্যান্সার কি শুধু পুরুষের রোগ?
না! এই ধারণা একেবারেই ভুল। বর্তমানে গ্রাম থেকে শহর—মহিলারাও সমান হারে তামাকজাত দ্রব্য গ্রহণ করছেন। পশ্চিমবঙ্গের বহু অঞ্চলে গুড়াখু, গুটখা এবং রিভার্স স্মোকিং (উল্টো দিক থেকে ধোঁয়া টানা, reverse smoking) মহিলাদের মধ্যেও প্রচলিত। তাই ঝুঁকিতে রয়েছেন নারী-পুরুষ উভয়েই।
যত দেরি, তত ভয়
মুখগহ্বর ক্যান্সার প্রথম স্টেজে ধরা পড়লে অপারেশন করলেই রোগী সেরে উঠতে পারেন। কিন্তু যদি স্টেজ-৩ বা স্টেজ-৪ এ গিয়ে ধরা পড়ে, তখন চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে। শরীরে মেটাস্টাসিস (metastasis) শুরু হলে সারভাইভাল রেট (survival rate) অনেকটাই কমে যায়। ডাঃ বন্দ্যোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে বাঁচার সম্ভাবনা ৭৫%-এর বেশি। কিন্তু দেরি হলে তা কমে ৩০%-এর নিচে নেমে আসে।
আধুনিক চিকিৎসায় নতুন আশার আলো
বর্তমানে মুখের ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে ফ্রি ফ্ল্যাপ সার্জারি (free flap surgery)—যেখানে শরীরের অন্য অংশের টিস্যু এনে (tissue transfer) মুখের ক্ষতিপূরণ করা হয়। এতে রোগীর খাওয়া, কথা বলা ও সামাজিক মেলামেশা অনেকটাই স্বাভাবিক থাকে। তবে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—যাঁদের একবার মুখের ক্যান্সার হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ভবিষ্যতে ক্যান্সার ফেরার (cancer recurrence) সম্ভাবনাও থাকে। তাই নিয়মিত ফলোআপ করা বাধ্যতামূলক।
মুখ দেখলেই অনেক কিছু বোঝা যায়
যদি প্রতিটি মানুষ ৬ মাস অন্তর একবার ডেন্টাল চেক-আপ (dental check-up) করেন, তাহলে প্রাথমিক পর্যায়ে মুখের ক্যান্সার ধরা (oral cancer detection) সম্ভব। যেমন রুটিন ব্লাড টেস্ট (routine blood test) করেন, তেমনই মুখের ভিতরও রুটিন পরীক্ষার (routine oral examination) প্রয়োজন রয়েছে।
অভ্যাসই সব কিছু
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন শুধু ক্যান্সার নয়, যেকোনও বড় রোগ থেকে দূরে রাখে।
তামাক, গুটখা, পানমশলা ত্যাগ
অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ
জাঙ্ক ফুড কমিয়ে ঘরোয়া খাবার
স্ট্রেস কমানো, পর্যাপ্ত ঘুম
—এই অভ্যাসগুলোই পারে মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে। তবে অনেক সময় জেনেটিক ফ্যাক্টর বা পরিবেশগত কারণেও ক্যান্সার হতে পারে। তাই যাঁরা উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাঁদের জন্য নিয়মিত চেক-আপ আরও বেশি জরুরি।
কেন এখনো এত মৃত্যু?
সবচেয়ে বড় সমস্যা—দীর্ঘ অবহেলা। মানুষ সাধারণ লক্ষণকেই গুরুত্ব দেন না। চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ক্যান্সার বড় হয়ে যায়, ছড়িয়ে পড়ে, আর তখন অনেক কিছুই করার থাকে না।
সচেতনতাই প্রতিরোধ
ডাঃ রাজর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষ কথা, "মুখে কোনও অস্বাভাবিকতা অনুভব করলে অবহেলা করবেন না। নিজে নিজে সেরে যাবে ভেবে বসে থাকবেন না। প্রাথমিক পর্যায়েই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মুখে একটা সামান্য ঘা থেকেও শুরু হতে পারে বিপদের যাত্রা। তামাকজাত দ্রব্য ত্যাগ করুন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করুন, এবং নিয়মিত ওরাল চেক-আপ করুন। কারণ, যত দেরি করবেন, বাঁচার সম্ভাবনা ততই কমে যাবে।"