দ্য ওয়াল ব্যুরো: যৌনতা আজও 'নিষিদ্ধ' বা গোপন বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয় ভারতীয় সমাজে। কিন্তু সেই তৃতীয় শতকে, গুপ্তযুগের সময়ে লেখা প্রাচীন এই যৌনতত্ত্বগ্রন্থ কামসূত্র অত বছর আগেও যথেষ্ট উদার কলমে লিখে রেখেছে নারীদের যৌন স্বাধীনতার তত্ত্ব। অনেকেই একে কেবল ‘একটি অশ্লীল বই’ হিসেবে দেখলেও, সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি পার করা গেলে দেখা যাবে, আধুনিক নারীবাদকেও একটি গভীর বার্তা দিচ্ছে এই কামসূত্র। বলছে নারীশরীরের আনন্দও কম গুরুত্বপূর্ণ নয় যৌনতায়।
বস্তুত, ভারতীয় সমাজে নারীদের যৌন আনন্দ প্রায় অদৃশ্য। এক গম্ভীর সাংস্কৃতিক নীরবতার আবরণে ঢাকা। ছোটবেলা থেকেই তাদের শেখানো হয় নিজেদের আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রাখতে, যেখানে পুরুষের চাহিদাকেই প্রধান মনে করা হয়। ভাবলে অবাক লাগে, এই দেশেই রচিত হয়েছিল কামসূত্রের মতো বই।
তৃতীয় শতকে প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় কামসূত্র লেখেন ভারতীয় দার্শনিক বাৎস্যায়ন। এটি শুধুমাত্র যৌন অবস্থানের কৌশল নিয়ে লেখা নয়। ‘কাম’ শব্দের অর্থ ভালবাসা, যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা ও আনন্দ, আর ‘সূত্র’ মানে হচ্ছে নীতিগর্ভ গ্রন্থ। এই বই সম্পর্ক, নৈতিকতা ও সামাজিক বিধিনিষেধ নিয়েও আলোচনা করে। এটি পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার ওপর গুরুত্ব দেয়।
কামসূত্র ও নারীদের যৌন স্বাধীনতা
ভারতীয় সংস্কৃতি ও সমাজতত্ত্বের গবেষক ওয়েন্ডি ডোনিগার তাঁর বই 'Redeeming the Kamasutra'-তে বলেছেন, বাৎস্যায়ন শুধু নারীদের আনন্দকেই স্বীকৃতি দেননি, তিনি তাদের শিক্ষার অধিকার এবং আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের স্বাধীনতার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কামসূত্র পুরুষতন্ত্রকে মজবুত করার বদলে যৌন সম্পর্কে পারস্পরিক আনন্দ ও সম্মতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এটি যৌন সম্পর্ককে পুরুষের বিজয় হিসেবে না দেখে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখায়।
ভুল অনুবাদ ও ভুল বোঝাবুঝি
তবে কামসূত্রকে একটি পুরুষতান্ত্রিক যৌনগ্রন্থ হিসেবে যে ভুল ধারণা প্রচলিত, তার পেছনে রয়েছে ১৮৮৩ সালে স্যার রিচার্ড বার্টনের করা প্রথম ইংরেজি অনুবাদ। ব্রিটিশ সৈনিক ও অভিযাত্রী বার্টন অনুবাদের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে নারীদের আত্মনির্ভরশীলতা ও স্বাধীনতা সম্পর্কিত অংশ বাদ দেন বা পরিবর্তন করেন। এতে নারীদের ভূমিকা একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর বদলে পুরুষের আনন্দের এক প্যাসিভ মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপিত হয়।
তবে গবেষক গণেশ সাইলি ও অন্যান্যরা দাবি করেন, কামসূত্র আসলে নারীদেরও সমান অংশীদার হিসেবে দেখিয়েছে। ওই বই অনুযায়ী, যৌনতার সময় নারীরা নিজেদের আকাঙ্ক্ষাগুলি ইঙ্গিত, আবেগ ও কথার মাধ্যমে প্রকাশ করতেন এবং তাদের আনন্দও পুরুষদের মতোই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আলোচনাই ছিল ঘনিষ্ঠতার মূল চাবিকাঠি, যেখানে সম্মতি ছিল একেবারে অপরিহার্য।
সমাজে নারীর যৌনতা এখনও নিষিদ্ধ
তবে ভারতীয় সমাজে আজও নারীদের যৌন আনন্দকে উপেক্ষা করা হয়। ভারতীয় যৌনশিক্ষক ও সাংবাদিক লিজা মঙ্গলদাস বলেন, নারীদের যৌনতা এখনও সামাজিক নিয়মের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, যেখানে তাদের নিরব, অনুগত ও বিয়ের আগে যৌনভাবে নিষ্ক্রিয় থাকার শিক্ষা দেওয়া হয়।
সমাজবিজ্ঞানী দীপা নারায়ণের মতে, এই দমন প্রক্রিয়া শুরু হয় পরিবার থেকেই। মেয়েদের শিখিয়ে দেওয়া হয় যে তাদের শরীর, ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং তাদের ভূমিকা পুরুষের চাহিদা পূরণ করা।
এই নিয়ন্ত্রণমূলক মানসিকতা এতটাই গভীর যে নারীর কৌমার্যকে সতীত্বের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়, যেখানে পুরুষের জন্য এমন কোনও শর্ত নেই। যেন যৌনতা নারীদের জন্য কেবল সন্তান জন্মদানের মাধ্যম, কোনও আনন্দের বিষয় নয়।
কামসূত্র নারীদের কী বলে?
কিন্তু কামসূত্র এক ভিন্ন সত্য বলে। এর মূল রচনায় নারীকে কেবল আনন্দদাত্রী নয়, বরং আনন্দের সমান অংশীদার হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। কামসূত্র নারীর সংবেদনশীলতাকে এক কোমল ফুলের সঙ্গে তুলনা করে, যা যত্ন, মনোযোগ ও সম্মানের দাবি রাখে।
এমনকি কামসূত্র নারীবাদের ধারণাকেও বিশ্লেষণ করে। কারণ এই প্রাচীন গ্রন্থ শুধু যৌনতা নিয়ে আলোচনা করে না, এটি যৌন স্বাধীনতারও প্রচার করে। এটি নারীদের ইচ্ছার প্রকাশ ও তাদের আনন্দ উপভোগের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়।
ওয়েন্ডি ডোনিগার বলেন, কামসূত্র একটি নারীবাদী গ্রন্থ কারণ এটি নারীদের নিজেদের সঙ্গী বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা, ইচ্ছা প্রকাশের অধিকার এবং সুখময় যৌন সম্পর্কের গুরুত্বকে তুলে ধরে। এমনকি এটি অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকেও নারীর যৌন স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখে।
পুরুষতন্ত্র বনাম যৌন স্বাধীনতা
একদিকে পুরুষতন্ত্র, যেখানে নারীর যৌনতা নিয়ন্ত্রিত হয়, অন্যদিকে যৌন স্বাধীনতা, যেখানে নারী নিজেই নিজের ইচ্ছার নিয়ন্ত্রক-- এই দুই বিপরীত দর্শনের সংঘর্ষও ফুটে ওঠে কামসূত্রে।
এই গ্রন্থটি এমন এক বার্তা দেয়, যেখানে যৌন উত্তেজনা কোনও পুরুষের আধিপত্য নয়, বরং পারস্পরিক উপভোগের বিষয়। যৌনতা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনার মাধ্যমে নারীদের নিজের চাহিদা পুনরুদ্ধার করতেও সাহায্য করতে পারে কামসূত্র।
দুঃখের বিষয় হল, দীর্ঘদিন ধরে কামসূত্র ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, এর বার্তা লুকিয়ে ফেলা হয়েছে লজ্জা ও সংস্কৃতির আবরণের আড়ালে। কিন্তু এর যৌন শিক্ষা শুধু আনন্দের জন্য নয়, বরং সম্মতি, সমতা ও নারীর স্বাধীনতার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
নারীদের যৌন আনন্দ কোনও বিলাসিতা বা নিষিদ্ধ বিষয় নয়, এটি তাদের অধিকার। কামসূত্র সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।