
শেষ আপডেট: 19 January 2024 18:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যৌনজীবনে সক্রিয় বেশিরভাগের শরীরেই কোনও না কোনও সময় সংক্রমণ ছড়ায় এইচপিভি বা হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস। এই ভাইরাসের প্রায় ২০০ রকম ভ্যারিয়ান্ট আছে যা নানারকম রোগের জন্য দায়ী। বিশেষ করে মহিলাদের জরায়ুমুখের ক্যানসার বা সার্ভিকাল ক্যানসারের অন্যতম কারণ এই ভাইরাস। বস্তুত, এইচপিভি ভাইরাসের কারণেই জরায়ুর ক্যানসার দিন দিন বাড়ছে। ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
ক্যানসার মানেই আতঙ্ক। জরায়ু মুখ বা সার্ভিক্সের ক্যানসার হয়েছে শুনলে আতঙ্ক আর অসহায়তা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দেশের মহিলাদের মধ্যে স্তন ক্যানসারের হার এমনতিও বেশি। তার ওপর জরায়ুর ক্যানসার মানে উদ্বেগের পারদ আরও বেশি চড়ে। জরায়ু মুখের ক্যানসারকে বলে সার্ভিকাল ক্যানসার। এ দেশের মহিলাদের এই ক্যানসারই সবচেয়ে বেশি হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রায় ৯৯% জরায়ুমুখের ক্যানসারের জন্য দায়ী একটি ভাইরাস যার নাম, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস বা এইচপিভি। এই ভাইরাস শরীরে ঢোকার প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর পর দেখা দেয় এই ক্যানসার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) জানাচ্ছে, এই ভাইরাসের শতাধিক ভ্যারিয়ান্ট আছে যাদের মধ্যে ১৪টি রূপ ক্যানসারের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এই ভাইরাসকে আটকানোর টিকা নিলে এবং প্রতিরোধবিধি সম্পর্কে সচেতন থাকলে এই রোগটিকে নির্মূল করা যাবে। চিকিৎসকেরা বলেন, আমাদের দেশে সারভাইক্যাল ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা ভীষণ জরুরি। তার কারণ, বিশ্ব জুড়ে এই অসুখের ফলে যাঁরা মারা যাচ্ছেন, তাঁদের ২৫ শতাংশই এই দেশের মানুষ।
কেন জরায়ুমুখে ক্য়ানসার (Cervical cancer) হয়?
হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) (Human papillomavirus infection)-এর সংক্রমণে মারাত্মক হয়ে দেখা দেয়। এইচপিভি ভাইরাসের দুটি জিন E6 ও E7 শরীরে ঢুকলে জরায়ুর কাছে অনিয়মিত কোষের বিভাজন শুরু হয়। ভাইরাল প্রোটিন ধীরে ধীরে ডালপালা মেলতে শুরু করে। শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে তছনছ করে দেয়। জরায়ুর নীচের অংশ যোনির সঙ্গে যুক্ত, সংক্রমণ হয় এখানেই। তবে সারভাইকাল ক্যানসারের আর একটি প্রধান কারণ অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক। সাধারণত ভারতে ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সিরাই এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। বয়স ৬০ পেরলেও এটি হতে পারে, তবে সংখ্যা তুলনামূলক কম।
এইচপিভি (HPV) ভাইরাস
বহুদিন অবধি টিকে থাকতে পারে এই ভাইরাস। দীর্ঘ সময় ধরে অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্কে বা একাধিক সম্পর্কে থাকলে জরায়ু-মুখের কোষগুলি পরিরর্তিত হতে থাকে। এই পরিবর্তনই ক্যানসারকে ডেকে আনে। অনেকক্ষেত্রেই যোনিতে সংক্রমণ হলে, লজ্জা ও অস্বস্তির কারণে রোগ এড়িয়ে যান মহিলারা। ডাক্তারের কাছে যেতে দেরি হয়। ফলে চিকিৎসাও দেরিতে শুরু হয়। ক্যানসার তার অন্তিম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তাই সচেতনতা সবচেয়ে আগে দরকার।
কী কী লক্ষণ দেখে রোগ চিহ্নিত করা যায়
আগাম বোঝা মুশকিল। সে জন্যই এই ধরনের ক্যানসার দেরিতে ধরা পড়ে। ফলে চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়। মেনোপজের পরে ব্লিডিং হলে সতর্ক হতে হবে। মাসে একবার পিরিয়ডের সময়ে অস্বাভাবিক ব্লিডিং, সহবাসের পরে রক্ত পড়া, অথবা সাদা থকথকে স্রাব, তার থেকে দুর্গন্ধ, পিরিয়ড চলার সময়ে প্রস্রাব করতে গেলে পেটে ব্যথা হলে সাবধান হতে হবে।
অস্বাভাবিক রকমের ভ্যাজাইনাল ব্লিডিং হলে সতর্ক হতে হবে। মাসে এক বার পিরিয়ডের সময়ে ব্লিডিং স্বাভাবিক। কিন্তু দু’টি পিরিয়ডের মাঝে এক বার ব্লিডিং হলে সতর্ক হতে হবে।
মেয়েদের অত্যধিক সাদা স্রাবও একটি অন্যতম লক্ষণ। অস্বাভাবিক সাদা স্রাব, থকথকে সাদা এবং দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব হলে সতর্ক হতে হবে। ডাক্তারবাবুরা বলছেন, সাদা স্রাবের দুর্গন্ধ কিন্তু জরায়ুমুখ ক্যানসারের একটি বড় ইঙ্গিত। মেয়েদের এটা খেয়াল করতেই হবে। এমন উপসর্গ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
জরুয়ুমুখ ক্যানসার যদি বাড়তে থাকে শরীরে, তবে আরও একটি কথা মনে রাখতে হবে। সাদা স্রাবের সময়ে সাধারণত এমন ক্ষেত্রে তলপেটে বেশ ব্যথা হয়।
পিরিয়ডের দিনগুলিতে প্রস্রাবের সময় ব্যথা হলেও সতর্ক হতে হবে।
জরায়ুর ক্যানসারের চারটি পর্যায়ে আছে। শুরুতেই রোগ ধরা পড়লে দ্রুত চিকিৎসা সম্ভব। কিন্তু চার ধাপে বাড়াবাড়ি হলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে সারা শরীরে।
প্রথম পর্যায়ে ক্যানসার কোষ ছোট থাকে। লিম্ফ নোডে শুধু ছড়িয়ে পড়তে পারে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে বিভাজন ঘটিয়ে ক্যানসার কোষ আরও বড় হয়। তখন জরায়ুর বাইরেও ধীরে ধীরে ডালপালা মেলতে পারে।
তৃতীয় ধাপে ক্যানসার কোষ আরও পরিপুষ্ট হয়। যোনির নীচের অংশেও সংক্রমণ দানা বাঁধে। মূত্রাশয় থেকে মূত্রনালীতে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। সেই সময় প্রস্রাব করতে গেলে ব্যথা হয়।
চতুর্থ পর্যায়ে পেলভিসের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে ক্যানসার। ফুসফুস, লিভারে সংক্রমণ বাসা বাঁধতে পারে।
এইচপিভি-১৬ ও এইচপিভি-১৮ ভাইরাল স্ট্রেনের সংক্রমণে জরায়ু মুখে ক্যানসার হতে পারে। তবে জরায়ুতে সংক্রমণ মানেই সার্ভিকাল ক্যানসার হবে তেমন কারণ নেই। অনেক সময়েই শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা সংক্রমণ নির্মুল করতে পারে। তবে বাড়াবাড়ি হলেই নানা রকম লক্ষণ দেখা যায়, যেগুলো আগেই বলা হয়েছে।
অসুরক্ষিত যৌন মিলন, এইচআইভি থাকলে বা দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকলে ভাইরাসের বাড়বাড়ন্ত হয়। সংক্রমণ সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। মেনোপজের পরে অস্বাভিক রক্তপাত হলে সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তার দেখানো দরকার। চেহারা যদি ভারী হয়, ওবেসিটি থাকে এবং পিরিয়ডের সময় অস্বাভাবিক রক্তপাত হয় তাহলে ডাক্তারের কাছে চেকআপ করিয়ে নেওয়া জরুরি।
জরায়ুর ক্যানসার সন্দেহ হলে ডাক্তাররা কিছু পরীক্ষা করে তা ধরতে পারবেন। জরায়ু কোষের বায়োপসি করলে ধরা পড়বে ক্যানসার ছড়াচ্ছে কিনা। ইলেকট্রিক ওয়্যার লুপ ব্যবহার করে স্ক্রিনিং করা হয়। কম ভোল্টেজের বিদ্যুতের তার ব্যবহার করে কোষের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ক্যানসারের চিকিৎসা সাধারণত পাঁচ রকমের। অস্ত্রোপচার, রেডিয়োথেরাপি অর্থাৎ রেডিয়েশন দিয়ে, কেমোথেরাপি অর্থাৎ ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা, হরমোন থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি অর্থাৎ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো। সার্ভিকাল ক্যানসারের ক্ষেত্রে প্রথম তিনটি থেরাপির প্রয়োগ করা যেতে পারে।