ভারতে মুখ ও গলার ক্যানসার (Head and Neck Cancer) বাড়ছে তামাকের (Tobacco) কারণে। বিশেষজ্ঞরা জানালেন সতর্কতার উপায়, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ।

ডক্টর শুভদীপ চক্রবর্তী।
শেষ আপডেট: 17 January 2026 10:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতে প্রতিবছর যত ক্যানসারের ঘটনা ঘটে, তার প্রায় ৪০ শতাংশই হেড অ্যান্ড নেক ক্যানসার বা মুখ ও গলার ক্যানসারের অন্তর্গত—তথ্য বলছে এমনই। আরও উদ্বেগের বিষয়, এই রোগে আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই জীবনের কোনও না কোনও সময়ে তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ, এই ক্যানসারের সঙ্গে তামাকের সম্পর্ক অস্বীকার করার উপায় নেই।
অ্যাপোলো হাসপাতালের সার্জিক্যাল অঙ্কোলজি বিভাগের প্রধান, ডক্টর শুভদীপ চক্রবর্তী বুঝিয়ে বললেন, ঠোঁট, জিভ, গাল, মাড়ি, নাক, গলা ও থাইরয়েড পর্যন্ত— সবই মুখ ও গলার ক্যানসারের আওতায় পড়ে। আমাদের শরীরের কোষ একটি নির্দিষ্ট চক্রে জন্মায় ও নষ্ট হয়। কিন্তু ক্যানসারের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম ভেঙে যায়, কোষ নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বৃদ্ধি পায় এবং শরীরের ক্ষতি করে। তামাকের প্রভাবে এই ক্ষতি আরও ত্বরান্বিত হয়।
শুধু সিগারেট নয়, গুটখা, খৈনি, পানমশলা—সবই সমান ক্ষতিকর। সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকে প্রায় ৭ হাজার রাসায়নিক, যার মধ্যে ৭২টি নিশ্চিতভাবে ক্যানসার সৃষ্টিকারী। ফুসফুসের পরে মুখ ও গলা তামাকের সরাসরি আঘাতের শিকার হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, তামাক বর্জন করলে ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। সুপুরি, গুটখা, বিড়ি, হুঁকো—সবই ওরাল ক্যানসারের প্রধান কারণ। অনেকের ধারণা—পুরনো প্রজন্ম খেয়েও বেঁচে ছিলেন, তাই ক্ষতির সম্ভাবনা কম। কিন্তু ক্যানসার কাকে কবে আঘাত করবে, তা আগাম নির্ধারণ করা যায় না।
মুখ ও গলার ক্যানসার সাধারণত চারটি স্টেজে বিভক্ত—
প্রথম স্টেজ: রোগ শুধুমাত্র আক্রান্ত স্থানে সীমাবদ্ধ
দ্বিতীয় স্টেজ: কাছাকাছি অংশ বা কয়েকটি লিম্ফ নোড আক্রান্ত
তৃতীয় স্টেজ: একাধিক লিম্ফ নোডে বিস্তার
চতুর্থ স্টেজ: শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়া
প্রথম দিকে ধরা পড়লে অস্ত্রোপচার, রেডিয়েশন ও কেমোথেরাপির সমন্বয়ে রোগ সারানো সম্ভব। কিন্তু ভারতে ৭৫% রোগীই স্টেজ থ্রি বা তার পরের ধাপে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছান, ফলে সাফল্যের হার কমে যায়।
বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই অঙ্গ রক্ষা করে অস্ত্রোপচার ও রিকনস্ট্রাকশন সম্ভব। তবে শুরুর পর্যায়ে চিকিৎসাই সেরা ফল দেয়। মাড়ির দীর্ঘস্থায়ী ঘা, দাঁতের দুর্বলতা, মুখে দুর্গন্ধ—এসব অবহেলা করা বিপজ্জনক।
বায়প্সি ও প্যাথলজিক্যাল স্টেজিংয়ের পর চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়। অপারেশনের পর প্রথম দুই বছর নিয়মিত পরীক্ষা অপরিহার্য, কারণ এই সময়ে ক্যানসার ফিরে আসার সম্ভাবনা বেশি। অন্তত পাঁচ বছর পর্যন্ত ফলোআপ চলা উচিত।
চিকিৎসা চলাকালীন রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়, ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। পরিবার ও বন্ধুর মানসিক সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেশা ছাড়ার প্রক্রিয়ায় রোগীকে ব্যস্ত রাখতে পড়াশোনা, বই পড়া বা চুইংগাম খাওয়ার মতো বিকল্পে উৎসাহ দেওয়া দরকার।
নারীদের মধ্যে তুলনামূলক কম হলেও মুখ ও গলার ক্যানসার দেখা যায়। ধূমপান, অ্যালকোহল সেবন ও হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়ায়। কিছু দেশে সার্ভাইক্যাল ক্যানসার প্রতিরোধে ভ্যাকসিন কার্যকর হয়েছে।
তামাকের কোনও নিরাপদ মাত্রা নেই। অল্প সময়ের ব্যবহারও দীর্ঘদিন পরে ক্যানসারের কারণ হতে পারে। ডাক্তারবাবু স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছেন—“সে নো টু টোব্যাকো, সে ইয়েস টু লাইফ।”