অনেকেই কিন্তু জানেন 'কাঁচা নুন' কিন্তু শরীরের জন্য আদৌ ভাল নয়। সেটা ঠিক কী সমস্যা (extra salt in food side effects) ডেকে আনছে, সেই নিয়ে সতর্ক করলেন কার্ডিয়োলজিস্ট।

শেষ আপডেট: 5 December 2025 13:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: খাবার প্লেটে সার্ভ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেরই হাত এগিয়ে যায় নুনের (extra salt in food) কৌটোর দিকে। অনেকেই মনে মনে জানেন এই 'কাঁচা নুন' কিন্তু শরীরের জন্য আদৌ ভাল নয়। এক চিমটে নুনই (pinch of salt) তো, কী আর হবে - এই ভেবেই অবহেলা করতে করতে ঠিক বুঝতেই পারি না দিনের শেষে কতটা বাড়তি সোডিয়াম (extra sodium intake side effects) শরীরে ঢুকছে। সেটা ঠিক কীভাবে নানারকম সমস্যা ডেকে আনছে, সেই নিয়ে সতর্ক করলেন গ্লেনিগলস হাসপাতালের কার্ডিয়োলজিস্ট ও ডিরেক্টর রাহুল গুপ্তা।
কার্ডিওলজিস্টের মতে (Cardiologist tips), অতিরিক্ত সোডিয়াম রক্তচাপ (hypertension) বাড়ায়, যার ফলে হৃদরোগ, কিডনির সমস্যা এমনকি গ্যাস্ট্রিক ক্যানসারের (gastric cancer) ঝুঁকিও বেড়ে যায়। বাড়তি নুন তো তাও বোঝা যায়, কিন্তু ডাঃ রাহুলের কথায়, আমাদের প্রতিদিনের বহু ভারতীয় খাবারেই লুকিয়ে থাকে বিপুল পরিমাণ নুন (Indian food items hidden salt)। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখা কোন কোন 'নিরীহ' খাবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে দেখে নিন তালিকা।
যে ৭টি খাবার এড়িয়ে চলতে হবে - কার্ডিওলজিস্টের স্পষ্ট সতর্কবার্তা
১. আচার (Pickles/Achar)
আম, লেবু থেকে শুরু করে মিক্সড ভেজ - আচার প্রায় সব ঘরেই থাকে। খাবারের সঙ্গে একটুখানি না হলে অনেকেরই খাওয়াটাই যেন সম্পূর্ণ হয় না। কিন্তু এর টক–ঝাল স্বাদের পিছনে যে প্রধান উপাদান, তা হল প্রিজারভেটিভ হিসেবে ব্যবহৃত নুন।
এক টেবিলচামচ আচারে দিনের সোডিয়াম সীমার বড় অংশ পূরণ হয়ে যায়। নিয়মিত খেলে রক্তচাপ বাড়ে, শরীরে ফোলাভাব দেখা যায়। ডাঃ গুপ্ত বলেন, হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে আচার পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়াই উচিত।
২. পাঁপড় (Papad)
ভাজা হোক বা পোড়া, পাঁপড়ে থাকে প্রচুর সোডিয়াম ও অ্যাডিটিভ। প্রতিদিন খাবারের সঙ্গে এক–দু’টো পাঁপড় খেলে অজান্তেই শরীরে নুনের মাত্রা বাড়তে থাকে। দীর্ঘসময় খেলে রক্তচাপ বাড়া ও শরীরে ওয়াটার রিটেইনশনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৩. ইনস্ট্যান্ট নুডলস (Instant noodles)
বাচ্চাদের প্রিয় এই নুডলসের বড় সমস্যা - টেস্টমেকার প্যাকেটে। এতে থাকে অতিরিক্ত নুন ও ফ্লেভার এনহ্যান্সার। এমনকি এক বাটির নুডলসেই কখনও কখনও এক দিনের জন্য প্রয়োজনীয় সোডিয়াম সীমা ছাড়িয়ে যায়।
৪. নোনতা স্ন্যাক্স ও চিপস (salted snacks and chips)
ঝুরিভাজা, ভুজিয়া, চানাচুর, চিপস - এগুলোর স্বাদ আর শেলফ লাইফ বাড়াতে (যাতে বেশিদিন পর্যন্ত ভাল থাকে) প্রচুর নুন মেশানো থাকে। নিয়মিত খেলে ওজন বাড়ে, ব্লোটিং হয়, রক্তচাপও বাড়তে থাকে।
৫. রেডি-টু-ইট গ্রেভি ও স্যুপ (Ready to eat gravy and soup)
সহজ, ঝটপট - নিশ্চয়ই সেটা সুবিধাজনক। কিন্তু এগুলো তৈরি হয় অনেক বেশি পরিমাণ সোডিয়াম দিয়ে। নিয়মিত খেলে শুধু সোডিয়াম ইনটেক নয়, হাইপারটেনশনের ঝুঁকিও দ্বিগুণ হয়। তাই সম্ভব হলে বাড়িতেই ফ্রেশ গ্রেভি ও স্যুপ বানানোর পরামর্শ দেন ডাঃ গুপ্ত।
৬. ব্রেড বা পেস্ট্রি (Bread and pastry)
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। রোজের খাওয়ার তালিকায় থাকা পাউরুটি বা পেস্ট্রি–জাতীয় বেকারি আইটেমেও থাকে প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম। প্রতিদিন এগুলো খেলে সোডিয়াম ইনটেকের মাত্রা সহজেই বেড়ে যায়।
৭. নানা ধরনের সস ও কেচাপ (Sauces and ketch up)
একটুখানি খাবারের ওপরে ছড়িয়ে নেওয়াটা নিছক নিরীহ মনে হলেও, এদের প্রায় প্রতিটিতেই থাকে অত্যন্ত উচ্চমাত্রায় সোডিয়াম। যে কোনও খাবারের সঙ্গে সস বা কেচাপ খাওয়ার প্রবণতা থাকলে সারাদিনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নুন প্রবেশ করে শরীরে।
কীভাবে কমাতে পারেন সোডিয়াম ইনটেক? কী বলছে বিশেষজ্ঞদের টিপস
১. কম নুন দিয়ে রান্না করুন
রান্নার সময় অতিরিক্ত নুন না দিয়ে শেষে অল্প ছিটিয়ে নিন। স্বাদ বাড়াতে ব্যবহার করুন লেবু, তেঁতুল, আদা, রসুন, ভিনিগার, হার্বস ও বিভিন্ন মশলা।
২. টাটকা খাবারে ভরসা রাখুন
প্যাকেটজাত ও ফ্রোজেন খাবার বেশিদিন সংরক্ষণ করতে বাড়তি নুন যোগ করা হয়। সেইসব খাবার এড়িয়ে চলুন। তার বদলে টাটকা সবজি, ফল, ডাল ও বাড়ির রান্না খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত সোডিয়াম ইনটেকের প্রবণতা কমাতে সাহায্য করে।
৩. নোনতা স্ন্যাক্স এড়িয়ে চলুন
চিপস–নোনতা স্ন্যাক্সের বেছে নিন নুনছাড়া বাদাম, ভাজা ছোলা, ফল বা বাড়িতে বানানো স্ন্যাক্স। ইনস্ট্যান্ট স্যুপ নয়, বাড়ির বানানো স্যুপ বেছে নিন।
৪. প্যাকেটের লেবেল পড়ার অভ্যাস করুন
“প্যাকেটজাত খাবারে সোডিয়াম লেভেল ভাল করে দেখে নিন। একটি সার্ভিং-এই দৈনিক সীমার ৩০%-এর বেশি সোডিয়াম থাকলে সেগুলো একবারেই খাবেন না,” - বলছেন ডাঃ গুপ্তা।
৫. আরও কিছু ছোটখাট অভ্যাস
লো–সোডিয়াম দুগ্ধজাত খাবার নিন। রেস্তরাঁয় খাবার অর্ডার করার সময় ‘নো এক্সট্রা সল্ট’ বা ‘নো এমএসজি’ বলে দিন।
অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীরে কী কী ক্ষতি করে?
১. উচ্চ রক্তচাপ
অতিরিক্ত নুনে বাড়ে হাইপারটেনশন। দিনে ছ’মিলিগ্রামের কম নুন খেলে রক্তচাপ কমতে পারে, বলছে গবেষণা।
২. হার্ট হেলথের অবনতি
হার্টে সমস্যা থাকলে বাড়তি নুন শরীরে জল জমায়, ফুসফুস ও হার্টের চারপাশে তরল জমে শ্বাসকষ্ট ও গুরুতর পরিস্থিতি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো ঝুঁকি বাড়ায়।
৩. কিডনির ক্ষতি
বেশি নুন খেলে তা শরীরে জল বেশিমাত্রায় জল ধরে রাখে, ওজন বাড়ে এবং ব্লোটিং দেখা দেয় - যা কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।
৪. ডায়াবেটিসের জটিলতা বাড়ায়
নুন সরাসরি ব্লাড সুগার না বাড়ালেও, ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জটিলতা, বিশেষত কিডনি–সংক্রান্ত সমস্যা বাড়িয়ে দেয়।
৫. ওজন বৃদ্ধি ও শরীর ফুলে যাওয়া
অতিরিক্ত সোডিয়ামে শরীরের জলধারণ বাড়ে। ফলে শরীর ফুলে ওঠে এবং ওজন বাড়ে।
৬. আরও নানা স্বাস্থ্যসমস্যা
অতিরিক্ত সোডিয়ামে দেখা দিতে পারে - হার্টের পেশি বড় হয়ে যাওয়া, মাথাব্যথা, কিডনির রোগ, অস্টিওপোরোসিস, কিডনি স্টোন ইত্যাদি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রাপ্তবয়স্করা সোডিয়াম ইনটেক দৈনিক গড়ে প্রায় ৪৩১০ মি.গ্রা. যা প্রয়োজনের সীমা ২০০০ মি.গ্রা.-র দ্বিগুণেরও বেশি। রোজের অভ্যাসে ছোটখাট কিছু সচেতনতাই শরীরকে আরেকটু বেশি 'ফিট' রাখার দিকে এগিয়ে রাখতে পারে, এমনটাই মত ডাঃ রাহুল গুপ্তার।