ভাইরাল ঝলমলে ট্রিটমেন্টের ভিড়ে কার্বক্সি থেরাপি (CO₂ injection carboxy therapy) একটু অন্যরকম - বেশি বাস্তবসম্মত এবং মোটেও সাজানো-গোছানো কোনও বিজ্ঞাপন নয়।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 24 November 2025 14:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চোখ নয়, দুটি ভ্রমর কাজল কালো... কিন্তু এ তো কাজল নয়, কথা হচ্ছে ডার্ক সার্কল (Dark circles) নিয়ে। চোখের নীচে গভীর কালো দাগ, কমবেশি বোধহয় সবারই পরিচিত এক ঝামেলা। সুন্দর দুটি আঁখিপল্লবে প্রশান্তি নয়, স্ট্রেস, কম ঘুমের ছায়া যেন। পুষ্টির ঘাটতি, ঠিকঠাক রক্ত সঞ্চালন না হওয়া, শরীরের ক্লান্তি সবথেকে আগে ধরা পড়ে চোখেই (dark circle problems and causes)।
বাজারে সমস্যা সমাধানের জন্য রয়েছে অসংখ্য আন্ডার-আই প্যাচ (under eye patch for dark circle)। ঘরোয়া টোটকার (home remedy for dark circles) কথা শোনা গেলেও সেগুলো কতটা কাজ দেয়, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। এই কারণেই চোখের নীচে কালচে দাগ ও ফোলাভাব এখন দ্রুত বাড়তে থাকা সমস্যাগুলির একটি। আর সেই সমস্যারই এক নতুন সমাধান হিসেবে উঠে আসছে কার্বক্সি থেরাপি (carboxy therapy for dark circles)।
কার্বক্সি থেরাপি কী? কীভাবে কাজ করে CO₂ ইনজেকশন? (carboxy therapy and CO₂ injection)
কার্বক্সি থেরাপি মূলত একটি মিনিমালি ইনভেসিভ বিউটি ট্রিটমেন্ট (minimally invasive beauty treatment)। এতে মেডিক্যাল-গ্রেড CO₂ গ্যাস (medical grade CO₂ gas) ত্বকের নীচে ইনজেক্ট করা হয়, যাতে শরীর স্বাভাবিকভাবেই অক্সিজেন ঘাটতি পূরণের প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।
দ্য এসথেটিক ক্লিনিকস-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ডিরেক্টর ডাঃ দেবরাজ সোম জানান, “শরীর যখন অতিরিক্ত CO₂-এর উপস্থিতি বুঝতে পারে, তখন ওই অংশে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় রক্তপ্রবাহ বাড়াতে থাকে, অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ায় এবং টিস্যু রিপেয়ার জলদি হয়। এর ফলে মাইক্রোসার্কুলেশন উন্নত হয়, কোলাজেন বাড়ে এবং কোষ দ্রুত তৈরি হয়। যেন ত্বকের এনার্জি সাপ্লাই রিসেট হয়ে যায়, ফলে চোখের নীচের অংশ উজ্জ্বল ও টানটান দেখায়।”
এছাড়াও এটি সূক্ষ্ম বলিরেখা, ছোট চর্বিযুক্ত পকেট বা প্যাচ, সেলুলাইট, স্ট্রেচ মার্ক সরানোর ক্ষেত্রেও কাজে আসে।
ডার্ক সার্কল ও আন্ডার-আই পাফিনেসের জন্য কেন এত জনপ্রিয় হচ্ছে কার্বক্সি থেরাপি?
ডার্মাটোলজিস্টদের মতে, চোখের নীচের অংশ সাধারণত প্রভাবিত হয় যে কারণে,
টপিক্যাল ক্রিম ব্যবহার বা উপর থেকে ত্বকে কিছু লাগিয়ে এসব গভীর সমস্যার খুব একটা সমাধান হয় না। সেখানে কার্বক্সি থেরাপি সরাসরি এই কারণগুলিই লক্ষ্য করে কাজ করে।
ডাঃ সোমের কথায়, “এটি লিম্ফ্যাটিক ড্রেনেজ বাড়ায়, ফলে ফোলাভাব কমে। এটাই ট্রিটমেন্টটিকে এতটা কার্যকরী করে তোলে।” আর বিশেষত ভারতীয়দের ত্বকের ক্ষেত্রে এটি বেশ ‘ফ্রেন্ডলি’।
ভারতীয় স্কিন টোনের জন্য বাড়তি সুবিধা (CO2 Carboxy Therapy for Indian skin)
আকিয়া অ্যাস্থেটিক্স-এর প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ রূপিকা সিং জানাচ্ছেন, ভারতীয় ত্বকে মেলানিন বেশি, পিগমেন্টেশনের প্রবণতাও তুলনামূলক বেশি। অনেকের আন্ডার-আই স্কিন এতটাই পাতলা যে ছোট ছোট রক্তনালিও স্পষ্ট দেখা যায়।
তাঁর কথায়, “কার্বক্সি থেরাপি মাইক্রোসার্কুলেশন বাড়িয়ে এবং ডার্মিসকে সামান্য পুরু করে সেই নীলচে বা বেগুনি অংশগুলো অনেকটাই কমিয়ে দেয়। ভারতীয় ত্বকে তাই এটি খুব লক্ষ্যভেদী সমাধান।” ভারতীয় বাজারে এই চিকিৎসার চাহিদা বছর বছর বাড়ছে।
কার্বক্সি থেরাপি কাদের জন্য ভাল? কত খরচ পড়তে পারে?
9Muses Wellness Clinic-এর প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ গীতা গ্রেওয়াল জানান, “বছর বছর এই থেরাপির চাহিদা বাড়ছে। ২০-৪০ বছরের ব্যস্ত চাকরিজীবীরা, বিয়ের আগে বর-কনের ট্রিটমেন্ট হিসেবে, আর যাদের আন্ডার-আই স্বাভাবিকভাবেই পাতলা - তাঁরা বেশি করাচ্ছেন। নন-ফিলার, মিনিমালি ইনভেসিভ কিছু চাইলে এটি আদর্শ।”
মহিলাদের সংখ্যা বেশি হলেও (প্রায় ৭০%) পুরুষদের মধ্যেও আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে।
খরচ কত?
প্রতি সেশনে ২০০০–৫০০০ টাকা পড়তে পারে। সাধারণত প্রয়োজন ৪-৮টি সেশন। প্রতিটি সেশনের মাঝে ব্যবধান রাখতে হবে ১–২ সপ্তাহ। অবশ্য তা ত্বকের সহনশীলতা ও সমস্যার মাত্রার ওপর নির্ভর করে।
কোনও ঝুঁকি আছে (CO2 Carboxy Therapy risk)?
ডার্মাটোলজিস্টরা জানাচ্ছেন, ঝুঁকি এইক্ষেত্রে খুবই কম। সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে -
তবে বিশেষজ্ঞরা এও বলছেন যে, সঠিকভাবে এই থেরাপি করা হলে এর জটিলতা বা সমস্যা গুরুতর হওয়া অত্যন্ত বিরল। একটু গ্যাস হওয়ার প্রবণতা আসতে পারে, তবে তা ভয় পাওয়ার মতো নয়।
তবে যাঁদের এটি করা উচিত নয় -
আইনগত কিছু দিক রয়েছে কার্বক্সি থেরাপির
কার্বক্সি থেরাপি ফিলারের মতো কঠোর লাইসেন্সিং দাবি না করলেও এর উপকরণ, গ্যাস, প্রোটোকল মেডিক্যালি রেগুলেটেড, এবং এটি শুধুমাত্র প্রশিক্ষিত ত্বক বিশেষজ্ঞ বা সার্টিফায়েড অ্যাস্থেটিক প্র্যাকটিশনারের কাছেই করানো উচিত। ডাঃ সিংয়ের কোথায়, “চিকিৎসার নিরাপত্তা পুরোপুরি টেকনিকের ওপর নির্ভরশীল। তাই ভালো ক্লিনিক বেছে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
হোম রেমেডি বনাম কার্বক্সি, কোনটি ভাল (home remedy or carboxy therapy)?
বরফ, শশার স্লাইস, কফি মাস্ক, ভিটামিন K ক্রিম, কোল্ড কমপ্রেস - সবই আমরা কমবেশি ব্যবহার করে ফেলেছি। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এসব ঘরোয়া টোটকা বা টপিক্যাল ক্রিম সাময়িক স্বস্তি দিলেও গভীর পরিবর্তন আনতে পারে না।
ডাঃ গ্রেওয়াল বলেন, “কার্বক্সি শরীরের ভেতরের স্তরে গিয়ে কাজ করে। তাই ফলাফল বেশি দৃশ্যমান।” তবে ঘরোয়া উপায় পুরোপুরি বাদ না দিলেও চলে। কিন্তু কিছু গভীর সমস্যার ক্ষেত্রে কার্বক্সি থেরাপি সবচেয়ে কার্যকর। এটি অন্য বিউটি ট্রিটমেন্টের সঙ্গেও মিল রেখে কাজ করতে পারে।
কার্বক্সি থেরাপি - ট্রেন্ড নয়, বাস্তবসম্মত সমাধান
প্রতিদিনই নতুন ট্রেন্ড, হ্যাক, কসমেটিক ফিক্স ভেসে ওঠে। মানুষ তার জন্য খরচও করছে। তবে ভাইরাল ঝলমলে ট্রিটমেন্টের ভিড়ে কার্বক্সি থেরাপি একটু অন্যরকম - বেশি বাস্তবসম্মত এবং মোটেও সাজানো-গোছানো কোনও বিজ্ঞাপন নয়।
তবে কোনও চিকিৎসাই নিয়মিত ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার বিকল্প হতে পারে না। সেটাই চিরন্তন, আবারও মনে করালেন বিশেষজ্ঞরা।