
মনের এই অবস্থা থেকে নিষ্কৃতির কোনও উপায় নেই!
শেষ আপডেট: 16 April 2025 18:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সারারাত ঘুমনোর পরেও কি সকালে উঠতে ক্লান্তি লাগে? ঘুম ভাঙার পর মর্নিং টি বা কফিও কি আপনাকে তুর্কি ঘোড়ার মতো চনমনে করে দিতে পারছে না? মধ্যদিনেও কি টানা হাই ওঠা বন্ধ করতে পারছেন না? আপনার কি মনে হচ্ছে টগবগ করে কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে? বর্তমানের জেটগতির যুগে এই সমস্যা দিনদিন গুরুতর হয়ে উঠছে। কেবলই মনে হচ্ছে, দিনের কাজ শেষপর্যন্ত করে ওঠা অসম্ভব এবং মনের এই অবস্থা থেকে নিষ্কৃতির কোনও উপায় নেই!
এই যে ক্রমাগত ক্লান্তি বা অবসন্ন ভাব হল ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রম বা সিএফএস (CFS)। একে ডাক্তারি পরিভাষায় মায়ালজিক এনসেফ্যালোমাইলিটিস (ME/CFS) বলা হয়। এটা শরীর ও মনের একটি জটিল অবস্থা। বুঝতে না পারা এই অসুস্থতা মহিলাদের উপর চড়াও হয় বেশি। যে রোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধরা পড়ে না বা ভুলভাবে চিকিৎসা করা হয়।
ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোম কী?
সিএফএস চিরস্থায়ী একটি সমস্যা। একটি ব্যাখ্যার অযোগ্য ক্লান্তি বা অবসন্নতা থেকে আসে এবং বিশ্রাম নিলেও কমে না। সাধারণ ক্লান্তি যা ঘুমোলে ও বিশ্রাম নিলে কমে যায়, সে ধরনের রোগ সিএফএস নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিশ্রাম নেওয়ার পরেও একজন ব্যক্তি এর ফলে শক্তি-মনোযোগ হারিয়ে ভিতর থেকে নিঃস্ব হয়ে পড়তে পারেন।
পিএসআরআই হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ভার্গবী রামানুজম জানান, সিএফএস সাধারণ ক্লান্তি বা শক্তিক্ষয়ের ঊর্ধ্বে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে বিশ্রামের পরে এই ধরনের ক্লান্তি আরও বাড়ে বা খারাপের দিকে গড়ায়। এমনকী খুবই সাধারণ বা হালকা কাজের পরেও এই উপসর্গ বাড়তে পারে। যাকে পরিশ্রম-পরবর্তী অসুস্থতার দশা বলা হয়।
এই অসুখের অন্যান্য উপসর্গ হল- হতাশা বোধ বা নিজেকে বঞ্চিত মনে করা। মনের মধ্যে অশান্তি অথবা দোলাচল অনুভব করা। পেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা বোধ, ঠোঁট শুকিয়ে আসা, মাথাধরা এবং মনোযোগ কমে যাওয়া। কিন্তু, এ সব ক্ষেত্রেই উপসর্গ দেখে চিকিৎসা করা হয় হতাশা, উদ্বেগ, থাইরয়েড এবং অন্যান্য রোগের। বেশিরভাগ সময়েই আসলে বুঝতে পারেন না অনেকে মূল অসুখটা কোথায়?
ডঃ রামানুজম আরও জানান, এই উপসর্গের কোনও ল্যাব টেস্টের ব্যবস্থা নেই। এটি ধরা পড়ে অন্যান্য রোগ নেই, এমন তালিকা তৈরি করে। ফলে এই প্রক্রিয়াটি করতে মাসের পর মাস লেগে যেতে পারে। যে সময়ের মধ্যে অসুস্থ ব্যক্তি নিজেকে আরও অসহায় ও অকেজো মনে করতে থাকেন এবং তাঁর
জীবনযাত্রা আরও সঙ্কটময় হয়ে ওঠে।
সারা বিশ্বে ক্রনিক ফ্যাটিগে পুরুষদের থেকে মেয়েরা বেশি ভোগেন। এদেশে এখনও পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-পরিসংখ্যান বা বিস্তারিত সমীক্ষা হয়নি। তাতেও বলা যায়, অসুস্থতার উপসর্গ নিয়ে মহিলারাই বেশি ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন, যা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটি ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশ, ১৮-৫০ বছর বয়সি ৩০০০ মহিলার সমীক্ষা করে দেখা গিয়েছে ১২ শতাংশের বেশি ক্রনিক ফ্যাটিগে ভুগছেন। এর মূল কারণগুলি হচ্ছে, বয়োসন্ধি, রজোনিবৃত্তির সমস্যা, আর্থ-সামাজিক কঠিন পরিস্থিতি, লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার এবং মানসিক স্বাস্থ্য।
উল্লেখযোগ্য হল ২০ শতাংশ মহিলা এই সমীক্ষায় অংশ নিতেই অস্বীকার করেন এই বলে যে, বাড়ির পুরুষরা অনুমতি দেবে না। এতেই বোঝা যায়, আজকের দিনেও কীভাবে পুরুষশাসিত হয়ে রয়েছে মহিলাদের চলাফেরার, বাক ও মতপ্রকাশে স্বাধীনতা। ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে এই উপসর্গ হানা দেওয়ার মূল কারণ হল, অপুষ্টি অথবা রক্তাল্পতা। যে কারণে ডাক্তার রক্তপরীক্ষা করেই ভোগা মহিলাকে আয়রন বা ভিটামিন ট্যাবলেট খেতে দেন। কিন্তু, মূল সমস্যা থেকে অনেক দূরে এই চিকিৎসা। কিছু ক্ষেত্রে সামান্য উন্নতি হলেও মূল রোগের জড় থেকেই যায়।
তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, আমেরিকা ও ব্রিটেনে ক্রনিক ফ্যাটিগকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এবং বৃহত্তর দিক থেকে গবেষণা চলছে। কিন্তু ভারতে এখনও গবেষণা তো দূর, সচেতনতাই গড়ে ওঠেনি চিকিৎসা মহলে। আমেরিকায় সিএফএস থাকা রোগী প্রতিবন্ধীর সুবিধা পান এবং আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়। ভারতে এসবের ধারেকাছে নেই। এখনও পর্যন্ত সিএফএসের কারণ জানা না থাকলেও গবেষকদের মতে, ভাইরাল সংক্রমণ, রোগ প্রতিরোধের অক্ষমতা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং চরম শারীরিক ও মানসিক চাপে এই রোগ হয়।