ঘণ্টার পর ঘণ্টা কানে হেডফোন বা ইয়ারপড লাগিয়ে রাখলে হতে পারে বিপদ। সম্প্রতি দিল্লির এক মহিলার ঘটনা শুনে অনেকেই শিউরে উঠেছেন।

ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি
শেষ আপডেট: 17 July 2025 19:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অফিসে ঢুকেই হাজিরা দিয়ে ল্যাপটপ, চার্জার, ওয়াটার বোতল, ডায়েরির সঙ্গে বেরিয়ে আসে এক জোড়া ইয়ারফোন। মিলেনিয়াল ও জেন জি-র কর্মজীবনে ইয়ারফোন, ইয়ারপ্লাগ, হেডফোন বা ইয়ারপড হয়ে উঠেছে দেহের এক অঙ্গের মতোই। অফিসের হট্টগোল হোক কিংবা হস্টেলের গোলমাল, কানে কিছু না গুঁজে কাজে মন দেওয়া দায়। গান বা সাউন্ড লাগিয়ে কাজের মধ্যে ডুবে যাওয়া এখন অভ্যাস।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কানে হেডফোন বা ইয়ারপড লাগিয়ে রাখলে হতে পারে বিপদ। সম্প্রতি দিল্লির এক মহিলার ঘটনা শুনে অনেকেই শিউরে উঠেছেন। টানা আট ঘণ্টা ইয়ারপড কানের গুঁজে রাখার পর সামান্য শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে তাঁর।
তাহলে কি দীর্ঘ সময় ইয়ারফোন ব্যবহারে বিপদ সত্যিই আছে? বা গান শুনে কি সত্যিই কাজের গতি বাড়ে?
বিজ্ঞানের বক্তব্য, হ্যাঁ, তবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে। আপনি কী ধরনের কাজ করছেন, গানটি কী ধরনের (ইনস্ট্রুমেন্টাল না কি কথা রয়েছে) এবং আপনার মস্তিষ্ক কীভাবে শব্দ প্রক্রিয়াকরণ করে, এসবই একান্ত জরুরি। হায়দরাবাদের কেয়ার হসপিটালের স্নায়ুবিশেষজ্ঞ ডঃ উমেশ টি বলছেন, 'গান বা শব্দ অনেক সময় মনোযোগ বজায় রাখতে সাহায্য করে, বিশেষত চারপাশ যখন ব্যস্ত বা বিশৃঙ্খল থাকে। কিন্তু তা হওয়া উচিত এমন সাউন্ড যা মন কেড়ে না নেয়।'
তিনি যোগ করেন, যাঁরা পড়াশোনা বা লেখার মতো কাজে ব্যস্ত, তাঁদের ক্ষেত্রে গানের কথা থাকলে মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইনস্ট্রুমেন্টাল মিউজিক বা অ্যাম্বিয়েন্ট সাউন্ড বেশি উপযোগী।
আর এক ধরনের শব্দ ‘ব্রাউন নয়েজ’, আজকাল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এটি এক ধরনের নিম্ন তীব্রতার, লাগাতার শব্দ, যেটি মস্তিষ্কে কোনও নির্দিষ্ট আবেগ বা সুর তৈরি করে না। এতে মন স্থির থাকে, কাজের গতি বজায় থাকে। ADHD বা মনোযোগ ঘাটতিতে ভোগা ব্যক্তিদের জন্যও এটি উপকারী বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা।
তবে এখানে সাবধানতা জরুরি, যদি মস্তিষ্ক অভ্যস্ত হয়ে যায়, শুধুমাত্র কোনও সাউন্ড থাকলেই মন বসে, তবে নীরবতা একসময় বিরক্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। মাঝে মাঝে একেবারে কোনও শব্দ ছাড়াই কাজ করার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার।
ইয়ারফোন ব্যবহারের বিপদ কী কী?
কানেই তো দিচ্ছি, তা-ও আবার দামি কোম্পানির। কী-ই বা ক্ষতি হতে পারে? ভাবনাটা এমন হলে ভুল করবেন।
গান শোনা বা পডকাস্ট প্লে করে কাজ করার অভ্যাস থাকলেও, টানা অনেকক্ষণ ইয়ারফোন ব্যবহার করা শরীরের পক্ষে মোটেই নিরাপদ নয়। কানের গঠনের সঙ্গে মিল না থাকলে, ইয়ারফোনের খাপ না খেলে অস্বস্তি, অ্যালার্জি এমনকি কানে সূক্ষ্ম চোটও হতে পারে।
আর মোমের কথা ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের কান স্বাভাবিক নিয়মে মোম বার করে দেয়। কিন্তু বারবার ইয়ারফোন ব্যবহার করলে সেই মোম ভিতরের দিকে ঠেলে যায়, পাশাপাশি কানের বাইরের প্রাকৃতিক আর্দ্রতাও হারায়। এতে কান শুষ্ক হয়ে সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়ে। সামান্য শ্রবণশক্তি কমার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে, বলছেন বেঙ্গালুরুর গ্লেনিগলস BGS হাসপাতালের ইএনটি বিশেষজ্ঞ ডঃ মঞ্জুনাথ এম কে।
তিনি আরও বলেন, 'যাঁরা নিয়মিত পরিবেশের স্বাভাবিক শব্দ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেন ইয়ারপ্লাগ বা ইয়ারবাড ব্যবহার করেন, তাঁদের মস্তিষ্ক একসময় স্বাভাবিক শব্দ শোনার অভ্যাস হারায়। ফলে পরবর্তী সময়ে ছোটোখাটো শব্দও অসহ্য মনে হতে পারে, তৈরি হয় অডিটরি হাইপারসেনসিটিভিটি।'
তবে কতক্ষণ হেডফোন কানে রাখা নিরাপদ?
এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পরামর্শ হল ‘৬০/৬০ নিয়ম’, ৬০ শতাংশ ভলিউমে, একটানা সর্বোচ্চ ৬০ মিনিট।
এছাড়া রয়েছে কিছু ‘ইয়ারফোন এটিকেট’-
এত নিয়ম-কানুন শুনে অনেকেই বলবেন, সবই তো জানা কথা! হ্যাঁ, জানি ঠিকই, কিন্তু মানি কি? এটাই আসল প্রশ্ন।
ঘন ঘন এবং দীর্ঘ সময় ইয়ারফোন ব্যবহার আমাদের শুধু কানের ক্ষতি করছে না, ধীরে ধীরে মনোযোগ ধরে রাখার স্বাভাবিক ক্ষমতাও হয়তো কেড়ে নিচ্ছে। এখনই সতর্ক না হলে, ভবিষ্যতে হয়তো মস্তিষ্কই আর জানবে না, নীরবতা কী জিনিস।