
শেষ আপডেট: 20 March 2024 13:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এই বুঝি সেই দারুচিনি দ্বীপ!
না, তা জানা নেই। তবে মশলার দ্বীপ বললে ভুল হবে না। ইন্দোনেশিয়ার মালাক্কা দ্বীপের সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। মালাক্কাকে এক কালে লবঙ্গের দ্বীপ বলা হত। আর তানজানিয়ার জাঞ্জিবারকে বণিকরা এককালে বলতেন ‘স্পাইস আইল্যান্ড’। সমুদ্রে বাণিজ্যতরী ভাসিয়ে তাঁরা ভেসে যেতেন মশলার দ্বীপের উদ্দেশে।
জাঞ্জিবার এক মিশ্র সংস্কৃতির দ্বীপ। মিশ্র জাতি, মিশ্র ভাষা। তারই মাঝে ইতিহাসের আঁকিবুকি। স্থাপত্যও আছে, আবার প্রবাল দ্বীপের সৌন্দর্যও আছে। প্রকৃতি এখানে নীল-সবুজের ক্যানভাসে সমুদ্র ও দিগন্তরেখায় মিলেছে। ভারত মহাসাগরের বুকে তানজানিয়ার সায়ত্ত্বশাসিত অঞ্চল জাঞ্জিবার আর্কিপেলাগো বা জাঞ্জিবার দ্বীপপুঞ্জ ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র। আশ্চর্যের ব্যাপার হল এখন বাঙালি পর্যটকদেরও টানছে জাঞ্জিবার। বাঙালি অনেকদিন আগেই দেশের গণ্ডি পার করে ভিন দেশে ভ্রমণের স্বাদ পেয়ে গেছে। এখন ছুটিছাটা থাকলে আর দিঘা-পুরীর দিকে না গিয়ে বরং তাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার টিকিট কাটেন ছাপোষা বাঙালিরাও। বিদেশে নতুন নতুন অ্যাডভেঞ্চারেও আগ্রহ জন্মেছে বাঙালিদের। তাঁরা ম্যাপ দেখে বেছে নিচ্ছেন একটু অফবিট হলিডে ডেস্টিনেশন। তানজানিয়ার জাঞ্জিবার তার মধ্যেই একটি।
ভারত মহাসাগরের উপকূল বরাবর ছোট ছোট দ্বীপের সমষ্টি জাঞ্জিবার। তানজানিয়া থেকে দূরত্ব ৩৬ কিলোমিটারের মতো। মূল দ্বীপ চারটি। উনগুজা বা স্থানীয় ভাষায় তাদের নাম আনগুজা, পেম্বা, লাথাম ও মাফিয়া দ্বীপ। উনগুজার চারদিকে আরও কিছু ছোট দ্বীপ জড়াজড়ি করে রয়েছে। বাওয়ে আইল্যান্ড, চাঙ্গু, চাপওয়ানি, দালোনি, মিউই পোপো ইত্যাদি।
এই উনগুজা দ্বীপ পর্যটকদের ভাল লাগার জায়গা। নীল সমুদ্রের বুক চিরে ছোট দ্বীপ। প্রকৃতি তার সৌন্দর্য পরতে পরতে সাজিয়ে রেখেছে। এ দ্বীপের অর্থনীতির ভিত গড়ে উঠেছে পর্যটন ও বাণিজ্যের উপর ভিত্তি করে। লবঙ্গ, জায়ফল, রসুন, তেজপাতা নানারকম মশলার সম্ভার এই দ্বীপে।
উনগুজায় সমুদ্র আর পাহাড় একেবারে মিলেমিশে আছে। পর্যটকরা বলেন পাহাড়ি দ্বীপ। জাঞ্জিবারের দক্ষিণ ভাগ জুড়েই রয়েছে উনগুজা। তার একপাশে পেম্বা দ্বীপ, অন্যপাশে তানজানিয়ার মূল ভূখণ্ড। মাঝে একফালি জাঞ্জিবার চ্যানেল যেন বিভেদ তৈরি করে দিয়েছে। জাঞ্জিবার দ্বীপপুঞ্জে গেলে উনগুজা ঘুরেই নজর টানে পেম্বার দিকে। এই পেম্বা দ্বীপের বৈশিষ্ট্য অনেক। পেম্বা হল নিসর্গ প্রকৃতি আর ইতিহাসের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। পর্যটকদের কাছে ‘গ্রিন আইল্যান্ড’ । উনগুজা থেকে ৫০ কিলোমিটার উত্তরে গেলেই পেম্বা। তানজানিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে ৫০ কিলোমিটার পূর্বে পেম্বা চ্যানেল বরাবর এই দ্বীপ। উনগুজা নুড়ি-পাথুড়ে হলেও পেম্বা অনেক বেশি সবুজ। এখানে লবঙ্গের চাষ বেশি হয়। ফসলের ফলনও ভাল। সি-ফুডের জন্যও নাম আছে পেম্বার। এখানকার সেফদের বিখ্যাত সি-ফুডের নানা ডিশ চাখতে পর্যটকদের ভিড় ভালই হয়।
জাঞ্জিবার আর্কিপেলাগোর যে জায়গাটা বিশেষভাবে পর্যটন মানচিত্রে উঠে এসেছে সেটা হল ‘স্টোন টাউন’ । উনগুজার পশ্চিম উপকূল বরাবর এই শহরে স্থাপত্য ও ইতিহাসের মেলবন্ধন। ২০০০ সালে ইউনেস্কো এই শহরকে ‘ওয়ার্লড হেরিটেজ সাইট’-এর তকমা দিয়েছে। পূর্ব আফ্রিকায় এই স্টোন সিটির বিশেষ গুরুত্ব আছে। আফ্রিকার সোয়াহিলি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে এখানে। একই সঙ্গে আরব, পার্সি, ভারতীয় ও ইউরোপীয় সভ্যতা ও ঐতিহ্যের মিলমিশ ঘটেছে সেই প্রাচীন কাল থেকেই। নানা ভাষা ও নানা সংস্কৃতির মানুষ রয়েছেন এখানে।
প্রায় দুই শতাব্দী ধরে পর্তুগিজদের অধীনস্থ ছিল জাঞ্জিবার। ১৬৯৮-এ ওমানদের অধীনে আসে জাঞ্জিবার। ১৯৬৪ সালে আরবীয় শাসক গোষ্ঠীর পরিবর্তন ঘটে। জাঞ্জিবার শব্দটা এসেছে দুই আরবীয় শব্দের মিশেলে। ‘জাঞ্জ’ মানে কালো এবং ‘বার’ মানে উপকূল। জাঞ্জিবারকে “কৃষ্ণাঙ্গদের ভূখন্ড” বা “দ্য ল্যান্ড অফ দ্য ব্ল্যাক” নামেও অভিহিত করা হয়। জাঞ্জিবারের আরও একটা দ্বীপে পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। সেটা হল মাফিয়া আইল্যান্ড। এই দ্বীপটি স্কুবাডাইভারদের জন্য বিশেষ আকর্ষণের জায়গা। মাফিয়া আর্কিপেলাগো জাঞ্জিবারের একটি বড় দ্বীপ। অনেকগুলো ছোট দ্বীপের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। মূল শহর কিলিনদোনি। পর্যটকদের থাকার লজ সেখানেই।
এই দ্বীপের ঐতিহাসিক গুরুত্বও আছে। ইতিহাস বলে মাফিয়া আইল্যান্ড হয়েই পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার মধ্যে বাণিজ্যিক আদানপ্রদান চলত। ১৯৯৫ সালে ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড এই দ্বীপেই মেরিন পার্ক তৈরির জন্য আর্থিক অনুদান দেয়। তানজানিয়ার প্রথম মেরিন পার্ক এখানেই তৈরি হয়।
জাঞ্জিবারের আরও অনেক দ্বীপ রয়েছে। হাতে সময় নিয়ে এলে সবকটি ছোট দ্বীপই ঘুরে দেখা যায়। বিশেষত প্রবাল দ্বীপের সৌন্দর্য অসাধারণ। বালুকাময় সৈকত, উপকূলীয় প্রবাল-প্রাচীর এবং একই সঙ্গে ইতিহাসের স্বাদ চাখতে হলে জাঞ্জিবার দ্বীপপুঞ্জে বারে বারেই আসতে হবে।
কীভাবে যাওয়া যাবে জাঞ্জিবার
ভারতের মুম্বই বা আহমেদাবাদ থেকে ফ্লাইটে সংযুক্ত আরম আমিরশাহী, সেখান থেকে বিমান বদলে জাঞ্জিবার যাওয়া যাবে।
কী কী হোটেল আছে
পকেট বুঝে হোটেল বুক করাই ভাল। গোল্ডেন টিউলিপ জাঞ্জিবার রিসর্ট, গোল্ডেন টিউলিপ, স্টোন টাউন বুটিক, টেম্বো হাউস হোটেল, টেম্পো বিঅ্যান্ডবি অ্যাপার্টমেন্ট—এই হোটেলগুলোতে এক রাতের ভাড়া ৪ হাজার থেকে ৭ হাজারের মধ্যে।
লাক্সারি অ্যাার্টমেন্ট চাইলে পার্ক হায়াত জাঞ্জিবার, চুইনি জাঞ্জিবার লজ, হোটেল ভার্দে জাঞ্জিবারের ভাড়া ১২ থেকে ২৯ হাজার টাকা।