
শেষ আপডেট: 7 February 2024 13:39
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুহূর্তে রোদ্দুর ঢেকে ঝেঁপে বৃষ্টি আসাটা শিলংয়ের বৈশিষ্ট্য। এমনই এক মেঘলা দিনে ‘শেষের কবিতা’-র নিবারণ চক্রবর্তী আবৃত্তি করেছিলেন “পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি / আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী।” আমরা দু’জন— অমিত রায় আর লাবণ্য। শিলং পাহাড়ে ওদের প্রথম দেখা, প্রেম, মান-অভিমান। শিলং-এর পটভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন ‘শেষের কবিতা’।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধিকবার গিয়েছেন শিলং। উত্তর-পূর্ব ভারতের এই শৈলশহরের সঙ্গে তাই বাঙালিরও আত্মিক যোগ। শিলং শহরে বাঙালি পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। শিলং মেঘালয়ের রাজধানী। তবে মেঘালয়ের যে শৈলশহরটি এখনও অনেক বাঙালিরই জানাশোনার বাইরে তার নাম নংজ্রং। ছোট্ট একটা পাহাড়ি গ্রাম। এই গ্রামে গিয়ে যদি কখনও মেঘে ঢাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, “মেঘ তোমার ঘর কোথায়?”, মেঘের উত্তর একটাই, ‘নংজ্রং’। ঢেউ খেলানো পাহাড়ের গায়ে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘ, সবুজ উপত্যকা, পাইন বনের সারি, উচ্ছ্বল নদী, মনোমুগ্ধকর ঝর্না আর অর্কিডের সমারোহ—এই নিয়েই বেশ আছে ছবির মতো সুন্দর নংজ্রং।
পূর্ব খাসি পাহাড়ের একটি ছোট্ট গ্রাম নংজ্রং। পাহাড়িয়ারা বলেন, মেঘে ঢাকা গ্রাম। পাহাড়ের খাঁজে সাদা মেঘের কোলে হারিয়ে গেছে গ্রামটি। মেঘ সরিয়ে চিলতে রোদ যখন হেসে ওঠে, তখন পাহাড়ি গ্রামটি ঝলমল করে ওঠে। পরিচ্ছন্ন, দূষণহীন এক স্বর্গীয় পরিবেশ। “ঝরনা তোমার স্ফটিক জলের/ স্বচ্ছ ধারা/ তাহারি মাঝারে দেখে আপনারে/ সূর্য তারা”.. স্বচ্ছ ঝর্ণার জলে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে চারপাশ আরও ঝকমকে করে তোলে।
এখানকার বেশিরভাগ মানুষই খাসি সম্প্রদায়ভুক্ত, খ্রিস্ট-ধর্মাবলম্বী। গ্রামে স্কুল, চার্চ সবই আছে। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি পরিপাটি করে সাজানো। বাড়ির সামনে রয়েছে ফুলের বাগান। চারদিকে সবুজ উপত্যকা ফুলে ভরা। মাঝে মাঝেই মেঘ এসে সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ধূসর চাদরে ঢেকে দেয় আস্ত গ্রামকে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “আকাশে সোনার মেঘ কত ছবি আঁকে, আপনার নাম তবু লিখে নাহি রাখে”। নংজ্রং পাহাড়িয়াদের কাছে মেঘ কিন্তু বড় আপন। মেঘের রাজ্যেই মানুষের বসতি। জনসংখ্যা মাত্র ১৪৪০। যে গুটিকয়েক পর্যটকদের পা পড়েছে নংজ্রংয়ের তারা প্রত্যেকেই মেঘে ঢাকা এই গ্রামের অপরূপ সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করেছেন। পর্যটকদের জন্য এখানে অবারিত দ্বার। গ্রামের মানুষজন বড় আপন করে জায়গা দেয় তাঁদের।
শিলং ভোলেনি রবীন্দ্রনাথকে। শিলং থেকে ৪৯ কিলোমিটার দূরত্বে নংজ্রং। অনুচ্চ পাহাড়ের বুক চিরে মসৃণ রাস্তা। চলার পথের সঙ্গী ছোট ছোট গ্রাম, সবুজ উপত্যকা, খণ্ড খণ্ড কৃষিজমি, পাইন গাছের ছায়া, নাসপাতি ও কমলালেবুর বাগান। উত্তর-পূর্বের এই পাহাড়ি গ্রামও কবিগুরুকে ভোলেনি। পর্যটকরা বলেন, সেখানেও কবিগুরুর নাম উঠলে শ্রদ্ধার সঙ্গেই স্মরণ করা হয়।
হর্ষ গোয়েঙ্কা এই নংজ্রং গ্রামের একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন।
A beautiful village Nongjrong in Meghalaya in a picturesque setting above the clouds #IncredibleIndia pic.twitter.com/gvnqNDJ1Nb
— Harsh Goenka (@hvgoenka) February 6, 2024
কীভাবে যাবেন নংজ্রং: প্লেনে করে গুয়াহাটি এয়ারপোর্টে নেমে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করা যাবে। অথবা ট্রেনে গেলে গুয়াহাটি স্টেশন থেকেও গাড়ি বুক করা যাবে। গুয়াহাটি থেকে নংজ্রং গ্রামের দূরত্ব ১৪৪ কিলোমিটার। গাড়িতে সময় লাগবে ৫ ঘণ্টা।
গুয়াহাটি থেকে অনেক সরকারি ও বেসরকারি বাস পরিষেবাও আছে। বাসে গেলে সময় লাগবে ৪ ঘণ্টার মতো।
শিলং থেকে আরও কাছে হবে। গুয়াহাটি থেকে শিলং গিয়ে সেখান থেকে গাড়ি বুক করে যাওয়া যেতে পারে নংজ্রং। সময় লাগবে ঘণ্টা দুয়েক।
থাকবেন কোথায়?
আমারা হোমস্টে-- জোয়াইতে সার্কিট হাউস রোডের হোমস্টে। পরিবার নিয়ে থাকার জন্য আদর্শ জায়গা।
তিরচি ইন-- এই হোমস্টেও ভাল। জোয়াইতে আরও একটি হোমস্টে আছে যার নাম হেইজো'স হোমস্টে।
নংজ্রং বা তার কাছাকাছি এলাকায় থাকতে হলে সস্তায় অনেক হোমস্টে পাওয়া যাবে।
নংজ্রং যাওয়ার আদর্শ সময় অক্টোবর তেকে মে মাস। এই সময় আবহাওয়া খুব মনোরম থাকে।
বিশেষ আকর্ষণ
ফেব্রুয়ারি ১৬-১৭ তারিখে বিশেষ উৎসবের আয়োজন করে মেঘালয়ের পরিবহণ দফতর। ‘এসকেপ টু নংজ্রং’ দেখতে অনেক পর্যটকই পাড়ি দেন এই পাহাড়ি গ্রামে। পাহাড়ি সূর্যাস্ত, ভেসে বেড়ানো মেঘ দেখার পাশাপাশি পেটপুজোর ভাল আয়োজনও থাকে। কমলালেবু, কলা, কাঁঠাল নানারকমের ফলের মেলা বসে যায়। সুস্বাদু সব কেকের পসরা সাজিয়ে বসেন পর্যটকরা। ভাত, নানারকম মাংস, পর্ক, চিকেনের নানা ডিশ থাকে। নংজ্রংয়ের পর্যটন আরও উন্নত করার জন্য এই গ্রামকে ঢেলে সাজানোর ব্যবস্থা করছে মেঘালয় সরকার।