
পয়লা বৈশাখ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শেষ আপডেট: 10 April 2024 12:42
বন্ধু হও, শত্রু হও, যেখানে যে কেহ রও,
ক্ষমা করো আজিকার মতো
পুরাতন বরষের সাথে
পুরাতন অপরাধ যত।
অষ্টাদশ শতকে ইয়ং বেঙ্গলের বাবু কালচারের যুগে পয়লা বৈশাখের দিন কলকাতার উঠতি জমিদারের দল মেতে উঠত মোচ্ছবে! ইংরেজদের খুশি করতে বসত বাইজি নাচের আসর, দেদার খানাপিনা, ছুটত মদের ফোয়ারা! অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি বাঙালি হিন্দু সমাজে নববর্ষ পালিত হত প্রবল ধর্মীয় ভাবাবেগের মধ্যে। আসলে সেই প্রাচীন সময় থেকেই বাংলা নববর্ষ উদযাপনের যে ছবি ধরা পড়ে, দেখা যায়, একে ঘিরে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বাঙালির উদ্দীপনা মাঙ্গলিক ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে।
একবিংশ শতাব্দীতেও পয়লা বৈশাখের দিন ব্যবসায়ী, পুরোহিত ও আমজনতার মধ্যে ধর্মাচরণের সেই ছবি অটুট থাকলেও, প্রকৃতপক্ষে বিশ শতকের শেষেই নববর্ষেরঅনুষ্ঠান আয়োজনে এল মননশীলতার ছোঁয়া। যা ছিল বাণিজ্যিক, তা-ই আমাদের চিন্তা-চেতনার মধ্যে শৈল্পিক রূপে ধরা দিল। স্বতন্ত্র সেই ধারার প্রবর্তক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেকে বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত। ক্রমশ এই পয়লা বৈশাখ সারা ভারত তথা বাঙলারও একটা ঐতিহ্যমণ্ডিত বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে পরিণত হল।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরপরিবারে মহাসমারোহে উদযাপিত হত পুণ্যাহ বা নববর্ষের অনুষ্ঠান। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, সেদিন যাকে বলে জমিদারি সেরেস্তার ‘পুণ্যাহ’, খাজনা আদায়ের প্রথম দিন। কাজটা নিতান্তই বিষয়-কাজ। কিন্তু জমিদারি মহলে সেটা হয়ে উঠেছে পার্বণ। সবাই খুশি। যে খাজনা দেয় সেও, আর যে খাজনা বাক্সেতে ভর্তি করে সেও। এর মধ্যে হিসেব মিলিয়ে দেখবার গন্ধ ছিল না। যে যা দিতে পারে, তাই দেয়। ১৮৯২ সালে সাজাদপুর থেকে একটি চিঠিতে রবি ঠাকুর লিখলেন, আজ আমাদের এখানে পুণ্যাহ– কাল রাত্তির থেকে বাজনা বাজছে।
২৫ বৈশাখ জন্ম রবীন্দ্রনাথের। কিন্তু শান্তিনিকেতনে সেই সময়ে জলে নিদারুণ কষ্ট থাকত। ফলে পয়লা দিনেই জন্মোৎসবের অনুষ্ঠান পালন করা হত। একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বন্ধু ও সাহিত্য সমালোচক শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে লিখেছিলেন, ‘আজ আমার জন্মদিন-পঁচিশে বৈশাখ-পঁচিশ বছর পূর্বে এই পঁচিশে বৈশাখে আমি ধরণীকে বাধিত করতে ধরণীতে অবতীর্ণ হয়েছিলুম, জীবনে এমন আরও অনেকগুলো পঁচিশে বৈশাখ আসে এই আশীর্বাদ করুন।’
উনিশ শতকের বাংলার সর্বাপেক্ষা আলোচিত পরিবার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। কাজেই সেই পরিবারের পয়লা বৈশাখ পালন ও রান্নাবান্না যে অন্য পরিবারের থেকে স্বতন্ত্র হবে তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। পয়লা বৈশাখের খাওয়াদাওয়া হত বাড়ির দোতলার টানা বারান্দায়। তেতলায় থাকতেন রবীন্দ্রনাথ। টানা বারান্দায় মেঝেতে কার্পেটের আসন লম্বা করে বিছিয়ে তার সামনে কলাপাতা ঘিরে মাটির খুরিতে পরিবেশিত হত কাঁচা ইলিশের ঝোল, চিতল মাছ আর চালতা দিয়ে মুগের ডাল, নারকেল চিংড়ি, মাছের পোলাও, আম দিয়ে শোল মাছ সহ নানা সুস্বাদু খাবার।
নিত্যনতুন রান্না খেতে ভালোবাসতেন রবীন্দ্রনাথ—দইয়ের মালপো, পাকা আম দিয়ে তৈরি মিষ্টি, চিঁড়ের পুলি। মৃণালিনীর তৈরি নববর্ষের জনপ্রিয় মিষ্টি ‘এলোঝেলো’ কবির খেতে লাগত বেশ, কিন্তু নামটা তেমন পছন্দ না হওয়ায় বদলে তার নতুন নাম দিলেন ‘পরিবন্ধ’। একবার বৈশাখের উৎসবে মৃণালিনীকে দিয়ে মানকচুর জিলিপিও তৈরি করিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ নববর্ষ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দে৷ ‘সভ্যতার সংকট’ সে দিন পাঠ করা হয়েছিল৷ গাওয়া হয়েছিল, ‘ঐ মহামানব আসে’৷ রানী চন্দের ‘আলাপচারি রবীন্দ্রনাথ’ বই থেকে জানা যায়, ১৯৩৯ সালের পয়লা বৈশাখে বিশেষ পাঠ শিখিয়েছিলেন গুরুদেব। তিনি বলেছিলেন, ‘নববর্ষ-ধরতে গেলে রোজই তো লোকের নববর্ষ৷ কেননা, এই হচ্ছে মানুষের পর্বের একটা সীমারেখা৷ রোজই তো লোকের পর্ব নতুন করে শুরু হয়৷’ কবির শেষ জন্মদিন, অর্থাৎ ৮০-তম জন্মদিনও পালিত হয়েছিল পয়াল বৈশাখের দিন। সে বার কবিগুরু হুইল চেয়ারে বসেছিলেন উদয়ন গৃহে। তাঁর সামনেই ‘সভ্যতার সংকট’ পাঠ করেছিলেন ক্ষিতিমোহন সেন। পরবর্তীতে পয়লা বৈশাখেই কবির জন্মদিন পালন করা হত।
বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখ
নববর্ষ উদযাপন উনবিংশ শতাব্দীর গোড়াতে হলেও (১৯১৭) তা জনপ্রিয় হতে অনেক চড়াই-উৎরাই পার হতে হয়েছে। স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশে পাকিস্তানি শাসকরা বারবার বাঙালি সংস্কৃতিকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। তার অংশ হিসেবে সে সময় রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা প্রকাশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় এবং তারই প্রতিবাদে ১৯৬৫ সালে ঢাকার রমনা পার্কের বটমূল বা অশ্বত্থমূলে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের আয়োজন করে আসছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’। আর বৈশাখ বরণে বাড়তি রঙ লাগিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ২০ ফাল্গুনে রচিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো…’ গানের মধ্য দিয়ে স্বাগত জানানো হয়েছিল বৈশাখকে, যে ধারা আজও অব্যাহত। কাহারবা তালের এই গানটি রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিভাবনার নিপুণ এক নির্মাণ। গানটিতে সুর ও বাণীর অপূর্ব মেলবন্ধন থাকায় তা বাঙালিচিত্তকে একসুতোয় গেঁথে রেখেছে। উল্লেখ্য যে, ১৯৭২ সাল থেকে বৈশাখী উৎসব মূলত জাতীয় উৎসব হিসেবে স্বীকৃতি পায়। উৎসবটিকে আরও মহিমান্বিত করতে ১৯৮০ সাল থেকে শুরু হয় বৈশাখী শোভাযাত্রার। আজ এই গান ও শোভাযাত্রা যেন বাংলার প্রতিটি মানুষের মনের গান, প্রাণের পার্বণ। বৈশাখ এলেই আমরা অনুভব করি অসাম্প্রদায়িক এই সাংস্কৃতিক উৎসব কতোটা শক্তিশালী।
হারিয়ে ফিরে পাওয়া
স্মৃতির অতলে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে বর্ষবরণ ঘিরে পুরোনো অনেক কিছুই। নববর্ষের প্রাক্কালে চৈত্র সংক্রান্তির দিবাগত রাতে নতুন ঘটে জল ঢেলে তাতে আতপ চাল ভিজিয়ে রেখে কচিপাতাযুক্ত আমগাছের চিকন ডাল ভিজিয়ে রাখা হত। পর দিন সকালে বাড়ির সবাইকে সেই ভেজানো চাল খেতে দিয়ে, আমের ডাল জলে ভিজিয়ে সবার শরীরে ও ঘরের চারদিকে ছড়ানো হত সার্বিক মঙ্গলকামনায়। ছোট বড় সকলের কপালে দইয়ের ফোঁটা দিয়ে পুজোর জলখাবারে দেওয়া হত নুন আর আদাকুচি দিয়ে মাখা মুগডাল ভিজে, নুনলেবু দিয়ে মাখা শশা নারকোল, কাঁঠালি কলা, দই মিষ্টি ইত্যাদি।
মল কালচারের এ যুগে এই একটি দিন মেকি হলেও সাজপোশাক এবং খাওয়াদাওয়াতে চুনোট দেওয়া ঐতিহ্যের কুঁচি তুলে কাকের ময়ূরপুচ্ছ ধারণের মতো মেলে ধরতে চায় বাঙালি। নতুন জিনসের সঙ্গে আঁতেল মার্কা বাঙলা ভাষায় লেখা হাফ হাতা ফতুয়া গোছের পাঞ্জাবি গায়ে বান্ধবীকে নিয়ে বাঙালি থালি সাঁটানোর ভিতরেই হাতকড়া পরে রয়ে গিয়েছে সভ্যতার সংকট।