
মধুমিতা উপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 23 December 2024 15:10
মায়া সভ্যতার অন্যতম জনপ্রিয় পানীয় ছিল 'শোকোলাতিল'। এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে গরিব-বড়লোক নির্বিশেষে সমস্ত অনুষ্ঠানেই এই পদ থাকতই থাকত। কালের নিয়মে এই পানীয় বদলাতে বদলাতে হয়ে উঠেছে চকোলেট। যার নাম শুনলেই মনটা খুশি খুশি হয়ে ওঠে আট থেকে আশির। সামনেই ক্রিসমাস। আর ক্রিসমাস মানেই—
‘খ্রীষ্টের জন্ম বড়দিন নাম
বহুসুখে পরিপূর্ণ কলিকাতা ধাম।’
তাই সারাবছরের বহু ঘনঘটা পার করে, ক্লেদ-গ্লানি ঝেড়ে, ক্লান্তি সরিয়ে, প্রতি বছরের মতোই কেক-চকোলেটের পসরায় সেজে উঠেছে কলকাতা। মনের দরজা খুলে আর ডায়াবেটিস ভুলে, নতুন নতুন স্বাদে জিভ মজানোর এই তো সময়! কিছু হলে না হয় যিশুঠাকুর দেখে নেবেন!
তবে দোকানচলতি সাধারণ কেক অনেকেই পছন্দ করেন না এখন। মন চায়, মনের মতো কিছু, অন্যরকম কিছু, দরকারে পার্সোনালাইজড কিছু! এই পরিস্থিতিতে নতুন নতুন হোমবেকারিই তাদের ঠিকানা।
এমনই এক হোমবেকারির নাম হল, 'ম্যাড চকোলেট'। চকোলেট পাগল মানুষের নতুন ডেস্টিনেশন। সেখানে এবারের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে আদ্যোপান্ত চকোলেটে তৈরি ক্রিসমাস ট্রি বা স্যান্টা ক্লজ। যিনি কারিগর, তাঁর নামও চকোলেটের মতোই মিষ্টি, মধুমিতা উপাধ্যায়। ডাকনাম ম্যাডি।
তবে মধুমিতার গল্পের টুইস্টটা অন্যখানে। কারণ প্রথাগত শিক্ষা দূরের কথা, ভাবনাও ছিল না তাঁর প্রাথমিক ভাবে। তিনি কখনও ভাবেনইনি যে বাড়িতেও চকোলেট তৈরি করা যায়। সেখান থেকেই আজ কলকাতা শহরের একজন জনপ্রিয় ও প্রিয় বেকারের নাম হয়ে উঠেছেন মধুমিতা।
কমিউনিকেশন স্পেশ্যালিস্ট মধুমিতা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। ২০১৪-তে রাতারাতি পিঙ্ক স্লিপ ধরায় সংস্থা। এভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার পরে আর পাঁচজন যেভাবে হন্যে হয়ে কাজের সন্ধান করেন, তিনিও ব্যাতিক্রম ছিলেন না।
সেই সময়টার পাতা উল্টোতে উল্টোতে মধুমিতা বললেন, 'কাজের সন্ধান করছি, এমন সময় আমার এক বন্ধু বললেন তাঁর একটা বেকিং ক্লাসে জয়েন করতে। খানিকটা ঝোঁক আমার ছিলই। আর ওই ক্লাসেই এক ঘণ্টার একটা চকোলেটেরও ক্লাস করেছিলেম। তার পর থেকেই যেমন হয় আরকি, বাড়িতে এসে এটা-সেটা বানাচ্ছি। মজাও পাচ্ছি। ফেসবুকে দিতেই অনেকে খাওয়ানোর কথা বললেন। এভাবেই শুরু।'
কিন্তু শখকে পেশা করে ফেলতে পারার চ্যালেঞ্জ অনেকেই নিতে পারেন না। বাধা হয়ে দাঁড়ায় অর্থ। সে ক্ষেত্রে পরিবারকে পাশে পেলে যে কেউ স্বপ্ন বুনতে পারেন। মধুমিতাও সেই তালিকায় রয়েছেন। একের পর এক প্রদর্শনীতে নিজের তৈরি চকোলেটের কালেকশনে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। আজ তাঁর শহরের নামী মলে রয়েছে নিজের স্টোর। চার চারটি কাউন্টার।
মধুমিতার তৈরি চকোলেট কেন খেতে যাবেন মানুষ? আর পাঁচজনের থেকে তিনি কতটা আলাদা? খোলসা করলেন নিজেই।
বললেন, 'প্রথমত, একদম প্রথম দিন ঠিক যে ডেডিকেশন নিয়ে কাজ করতাম, আজও তাই। কোয়ালিটি নিয়ে কোনও কম্প্রোমাইজ করি না। কোকো মার্কেটের যা অবস্থা, খরচ একটা বিশাল প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু আমি মনে করি, খরচের থেকেও মানুষের কাছে কোয়ালিটি প্রোডাক্ট পৌঁছে দেওয়াটাই আসল। আর দ্বিতীয়ত, যে ডিজাইনে আমার চকোলেট তৈরি হয় তা অন্তত কলকাতার আর কেউ করেন বলে আমার জানা নেই। যেমন, বিয়ের ডালা থেকে শুরু করে, শাড়ি, ধুতি, যাবতীয় জিনিস আমি চকোলেট দিয়ে তৈরি করি।'
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতনভুক কর্মচারী হিসেবে কাজ করে হঠাৎ করে মধুমিতার চকোলেট কারিগর হয়ে ওঠার এই চ্যালেঞ্জ বাইরে থেকে যতই হাততালি কুড়োক না কেন, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পর্দা কখনওই সরে না মস্তিষ্ক থেকে। কারণ মানুষ যতই চকোলেট নিয়ে রূপকথার গল্প ফাঁদুক, প্রেমের জোয়ারে ভেসে যাক, এ ব্যবসা একপ্রকার মরশুমি ব্যবসা ছাড়া কিছু নয়।
তিনি বলেন '২০১৭-র এপ্রিলে ব্যবসা শুরু করার পর থেকে ওঠা-পড়া দেখেছি। জিএসটি এল, নোটবন্দি এল, কোভিড এল, একটা সদ্য তৈরি হওয়া ব্যবসাকে দাঁড় করাতে পারছি কি পারছি না, একটার পর একটা ঘটনা।'
তবু নিজেকে দমতে দেননি এই চকোলেট কারিগর। চোয়াল শক্ত করে একটাই কথা বলেছেন, 'দেখি আর কত খারাপ হতে পারে। সামলে নেব।' তবে মনে মনে বলা এ কথা কেউ শুনতে পাচ্ছে না, দেখতে পাচ্ছে না কাঠিন্যও। ওপর থেকে মধুমিতার সদাহাস্যময় মুখ আর নতুন নতুন আইডিয়ার চকলেট—এই নিয়েই নতুন বছরকে স্বাগত জানাচ্ছে 'ম্যাড চকোলেট'।