
শেষ আপডেট: 10 January 2024 18:18
দুধ অনেকক্ষণ ধরে জাল দেওয়ার পর যে হাল্কা লালচে রঙটা হয়, একেবারে সে রকম রঙের একটা রসগোল্লা। তবে পুরো গোল নয়। উপর আর নীচের দিকটা চ্যাপ্টা। লুডোর ছক্কার মতো। তার মাথার উপর যেন দুধ সাদা ক্রিমের চাদর চড়ানো হয়েছে। সেই ক্রিমের চাদরের উপরে আবার হাল্কা করে ছড়ানো পেস্তার গুঁড়ো।
তাকে দেখতে মোটামুটি এরকম। মিষ্টি খেতে যাই হোক না কেন, দর্শনধারী হলে আগ্রহ বেড়ে যায়। এও তাই। দেখে ভাল লাগবে। মনে হবে চেখে দেখি। তার পর টুপ করে মুখে পুড়ে দিলে যেটা হবে তার সবটা লিখে বোঝানো কঠিন। দুধ-ছানা-ক্রিমের ম্যাজিকে স্বাদগ্রন্থিতে যেন উৎসবের আবহ তৈরি হয়ে যাচ্ছে।
এই ক্রিম চপ যাঁরা এরই মধ্যে চেখে ফেলেছেন তাঁদের অনেকেই হয়তো এই অনুভূতির ব্যাপারে সহমত হবেন। সম্ভবত সে কারণেই এই মিষ্টি দোকানে এনে রাখলেই ঘণ্টা খানেকের মধ্যে দুটো ট্রে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। এলাকার লোকজন আগাম ফোন করে জানিয়ে রাখছেন, ‘বাপ্পা ক্রিম চপ এলে আমার জন্য দশটা রেখে দিস আলাদা করে’। তা ছাড়া ক্রিম চপের একটা সমস্যা রয়েছে। দোকান থেকে নিয়ে এসে ফেলে রাখা যাবে না। ১০-১২ ঘণ্টার মধ্যে খেয়ে ফেলাই ভাল।
চন্দননগরের মিষ্টি বলতেই সূর্য মোদকের জলভরা সন্দেশের নামটা ভেসে ওঠে। গতানুগতিক সেই ট্রাডিশনাল সন্দেশের এখনও মার নেই। কিন্তু নতুন প্রজন্মের ক্রিম চপের আঁতুরঘর হল চন্দননগরের ইদানীং জনপ্রিয় মিষ্টির দোকান ‘মৃত্যুঞ্জয়’। ক্রিম চপের শুরুর গল্পটা শোনাচ্ছিলেন সত্যজিৎ সরকার। সত্যজিতের বাবা আর কাকাদের দোকান। এখন দায়িত্ব নিতে হচ্ছে পরে প্রজন্মকেও।
সত্যজিৎ বললেন, “২০০৩ বা তার পরের বছরের ঘটনা। সল্টলেকের বাসিন্দা তাঁদের খুব পরিচিত একজন মেয়ের বিয়ের সময় নতুন ধরণের কোনও মিষ্টি তৈরি করে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। শুরু হয়েছিল খোঁজ। কারিগরদের নিয়ে দফায় দফায় আলোচনা আর পরীক্ষা নিরীক্ষার পর নতুন এই মিষ্টির রেসিপি ফাইনাল হয়। তৈরি হয় ছানা-দুধ আর ক্রিমের মিশেলে এই সুস্বাদু মিষ্টি।”
বিয়ের অনুষ্ঠানে সেই মিষ্টি বাজিমাত করেছিল। রাশি রাশি প্রশংসায় উজ্জীবিত হয়ে এই মিষ্টি এরপর নিয়মিত তৈরি করতে থাকেন তাঁরা। ভাল লাগে চন্দননগরের মানুষেরও। তারপর পেরিয়ে গেছে প্রায় ২০ বছর। ধীরে ধীরেই চন্দননগরের বাইরের মানুষেরও মন জয় করে নিচ্ছে মৃত্যুঞ্জয়ের ক্রিম চপ। সত্যজিতের কথায়, “এটা ছানারই মিষ্টি। চমচমের মতো, তবে এর আকৃতি প্রায় গোলাকার। মিষ্টি তৈরি করে ফেলা হয় রসে। পরে ছেঁচে তুলে ফেলা হয় দুধে। মিষ্টিতে ভাল করে দুধ ঢুকে গেলে প্লেটে সাজিয়ে উপর থেকে ঢেলে দেওয়া হয় ক্রিমের টপিংস। তারপর ছড়িয়ে দেওয়া হয় পেস্তার গুড়ো। সেই স্বাদেই মানুষ আপন করে নিচ্ছেন মৃত্যুঞ্জয়ের ক্রিম চপকে।”
সত্যজিৎ জানিয়েছেন, এই মিষ্টির প্রচারে তাঁরা তেমন গুরুত্ব দেননি। তবে হ্যাঁ, সৌরভ গাঙ্গুলিও খেয়েছেন তাঁদের ক্রিম চপ। খুশিও হয়েছিলেন নাকি খুব। ২০ বছর আগে শুরুর দিনগুলিতে প্রতি পিস ক্রিম চপ ১০ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি করত মৃত্যুঞ্জয়। এখন দাম বেড়ে ২০ টাকা। অর্থাৎ পকেট ফ্রেন্ডলি নয়, এটা বলা যাবে না। সত্যজিৎ বলেন,“মফস্বলের মানুষ এখনও কম দামে সেরা স্বাদটা পেতেই অভ্যস্থ। তাই যতই জনপ্রিয় হোক, দাম নিয়ে নতুন কিছু ভাবছি না”।
এই হল, হুগলির মিষ্টিতে নতুন সেনসেশনের গল্প। এখন চন্দননগরে নিজে যাবেন, নাকি লোক পাঠাবেন ভেবে ফেলুন।